Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চিনা রোবো কুকুর নিজেদের আবিষ্কার বলে চালাতে গিয়ে বিপাকে নয়ডার বিশ্ববিদ্যালয় এআই সম্মেলন থেকে বাদ

সোমবার থেকে দিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুরু হয়েছে দেশের প্রথম এআই ইমপ্যাক্ট সামিট যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ উদ্ভাবন ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করছেন।

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ক্ষেত্রকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যে দিল্লির অত্যাধুনিক কনভেনশন সেন্টার Bharat Mandapam-এ আয়োজিত হল প্রথম AI ইমপ্যাক্ট সামিট। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও কর্পোরেট প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই আয়োজনের মধ্যেই জন্ম নেয় এক অস্বস্তিকর বিতর্ক—যার কেন্দ্রে নয়ডার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Galgotias University এবং একটি তথাকথিত ‘নজরদারি রোবো কুকুর’।

ঘটনার সূত্রপাত ‘ওরিয়ন’ নামের একটি রোবো কুকুরকে ঘিরে। সম্মেলনের প্রদর্শনী অংশে গালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স গবেষণায় অগ্রগতি করেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক—নেহা সিং—দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে AI গবেষণায়, যার ফলশ্রুতিই এই ‘ওরিয়ন’ নামের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি রোবট। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রকুকুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজে নিজেই টহল দিতে সক্ষম এবং উন্নত সেন্সর ও AI অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নজরদারি চালাতে পারে।

কিন্তু দ্রুতই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ দাবি করেন, যে রোবো কুকুরটিকে ‘ওরিয়ন’ নামে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি আসলে চিনা সংস্থা Unitree Robotics-এর বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিত একটি মডেল—Unitree Go2। আন্তর্জাতিক বাজারে সহজলভ্য এই চারপেয়ে রোবটের দাম প্রায় ২৮০০ মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, এটি কোনও গবেষণাগার-নির্মিত প্রোটোটাইপ নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক পণ্য।

এই তথ্য সামনে আসতেই সম্মেলন চত্বরে হাসির রোল ওঠে এবং সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। অনেকে প্রশ্ন তোলেন—যদি এটি বাণিজ্যিক পণ্য হয়, তবে সেটিকে নিজেদের গবেষণার ফল বলে দাবি করার নৈতিকতা কোথায়? প্রযুক্তি মহলের মতে, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এমন দাবি দেশের ভাবমূর্তিকে আঘাত করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি বনাম অভিযোগ

বিতর্ক বাড়তেই গালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিনিধি জানান, তাঁরা কখনও বলেননি যে রোবো কুকুরটি তাঁদের তৈরি। তাঁদের বক্তব্য—ওই রোবটটি কেবল AI গবেষণায় তাঁদের বিনিয়োগ ও প্রয়োগক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আনা হয়েছিল। অর্থাৎ, তাঁরা সরাসরি নির্মাণের কৃতিত্ব দাবি করেননি, বরং AI ইন্টিগ্রেশন বা প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন।

তবে ভাইরাল ভিডিওতে অধ্যাপকের বক্তব্য অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। কারণ সেখানে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা থেকে সাধারণ দর্শক ধরে নিতে পারেন যে যন্ত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্ভাবন। এই যোগাযোগগত অস্পষ্টতাই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।

কেন এত বিতর্ক?

AI ও রোবোটিক্স আজকের বিশ্বে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র। বিশেষ করে ভারত যখন নিজেকে ‘ডিজিটাল পাওয়ারহাউস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তখন এমন কোনও দাবি যদি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়, তা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশ্ন তুলতে পারে। উপরন্তু, চিনা পণ্যকে নিজেদের উদ্ভাবন হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ কূটনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও স্পর্শকাতর।

ভারত ও চিনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। 5G, সেমিকন্ডাক্টর, AI—সবক্ষেত্রেই দুই দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি চিনা কোম্পানির পণ্যকে ‘দেশীয় উদ্ভাবন’ হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়।

সম্মেলনের বেহাল দশা

বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক AI সম্মেলনে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর বেহাল দশাও সামনে আসে। উপস্থিত অতিথি ও প্রতিনিধিদের অভিযোগ—ওয়াই-ফাই পরিষেবা কার্যত অচল, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বারবার বিকল, ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। বহু বিদেশি প্রতিনিধি সামাজিক মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ ও AI-নির্ভর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো এক সম্মেলনে যদি ন্যূনতম ডিজিটাল পরিকাঠামোই ভেঙে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—প্রযুক্তির বিশ্বনেতা হওয়ার লক্ষ্যে এগোতে চাইলে, আগে কি মৌলিক পরিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি নয়?

কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া

পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে দ্বিতীয় দিনে অতিথিদের কাছে ক্ষমা চান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী Ashwini Vaishnaw। তিনি স্বীকার করেন, কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য—এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন, বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণকারী ও প্রযুক্তিগত ডেমোর কারণে অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি হয়েছিল।

news image
আরও খবর

তবে সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলনে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ ও নেটওয়ার্ক সক্ষমতা থাকা উচিত ছিল।

AI সম্মেলনের গুরুত্ব

সমস্ত বিতর্ক সত্ত্বেও, AI ইমপ্যাক্ট সামিট ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। AI-ভিত্তিক স্টার্টআপ, সরকারি নীতি, গবেষণা ও শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ—সব মিলিয়ে ভারত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা—বহু ক্ষেত্রে AI-র ব্যবহার বাড়ছে।

কিন্তু এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিল, কেবল ঘোষণায় নয়—স্বচ্ছতা, সততা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রমাণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আস্থা অর্জন করতে হলে দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

বৃহত্তর শিক্ষা

১. স্বচ্ছ যোগাযোগ জরুরি – কোনও পণ্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত সেটি নিজস্ব উদ্ভাবন নাকি বাণিজ্যিক মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি সমাধান।
২. পরিকাঠামোর প্রস্তুতি – AI বা ডিজিটাল সম্মেলনে নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সর্বোচ্চ মানের হওয়া প্রয়োজন।
৩. ফ্যাক্ট-চেকিং অপরিহার্য – আজকের সোশ্যাল মিডিয়া যুগে কোনও দাবি মুহূর্তে যাচাই হয়ে যায়। ভুল তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে।

উপসংহার

দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত AI ইমপ্যাক্ট সামিট ভারতের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু গালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবো কুকুর বিতর্ক এবং সম্মেলনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় সেই স্বপ্নের ওপর সাময়িক ছায়া ফেলেছে। ভবিষ্যতে এমন আয়োজনকে আরও পেশাদার, স্বচ্ছ ও নির্ভুল করার প্রয়োজনীয়তা এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দিল।

ভারত AI ক্ষেত্রে এগোতে চায়—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের জন্য প্রতিটি দাবি, প্রতিটি প্রদর্শন এবং প্রতিটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা হতে হবে নির্ভুল ও স্বচ্ছ। তাহলেই সত্যিকারের ‘ডিজিটাল ভারত’-এর স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে।

দিল্লির অত্যাধুনিক কনভেনশন সেন্টার Bharat Mandapam-এ আয়োজিত AI ইমপ্যাক্ট সামিট নিঃসন্দেহে ভারতের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্স—এই চারটি স্তম্ভকে সামনে রেখে দেশ নিজেকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি-নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু Galgotias University-কে ঘিরে রোবো কুকুর বিতর্ক এবং সম্মেলনের প্রযুক্তিগত বিশৃঙ্খলা দেখিয়ে দিল, কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়—তার বাস্তব প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে গেলে প্রথম শর্ত হল বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি আন্তর্জাতিক AI সম্মেলনে যদি কোনও পণ্যের উৎস বা নির্মাণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক প্রযুক্তি-পরিচিতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। আজকের যুগে তথ্য যাচাই করতে সময় লাগে না—বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তি ফোরামের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে পারেন। ফলে কোনও অস্পষ্ট দাবি বা অতিরঞ্জন দ্রুতই উল্টো ফল দিতে পারে।

একইভাবে, ডিজিটাল অবকাঠামোর ঘাটতি আরও বড় বার্তা দেয়। AI, ক্লাউড কম্পিউটিং, 5G, স্মার্ট গভর্ন্যান্স—এসবের কথা বলার পাশাপাশি যদি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্থিতিশীল ইন্টারনেট বা নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিষেবা নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে। প্রযুক্তি মানে শুধু উদ্ভাবন নয়; প্রযুক্তি মানে নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা।

তবে এই ঘটনাকে শুধুই নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি একটি শেখার সুযোগ। ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ছে, সরকারি নীতিতেও AI-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন আরও কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া, স্পষ্ট যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট।

ভারত যদি সত্যিই AI ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখে, তবে প্রতিটি প্রদর্শনী, প্রতিটি দাবি ও প্রতিটি আয়োজন হতে হবে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক। প্রযুক্তিগত সাফল্য তখনই টেকসই হবে, যখন তা আস্থার ভিতের ওপর দাঁড়াবে। বিতর্ক ও সমালোচনা সাময়িক হলেও, সঠিক পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতের পথ আরও সুদৃঢ় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত, ডিজিটাল ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি—সততা, দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা।

Preview image