বাংলাদেশে বারবার শান্তিকামী সাধারণ মানুষের উপর আঘাতের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়, ভাবাচ্ছে ভারতকেও। টলিউডের প্রশ্নপড়শি দেশ ভাল না থাকলে আমরা কি সত্যিই ভাল থাকতে পারি
পড়শি দেশ অশান্ত হলে তার প্রভাব যে সীমান্তের গণ্ডি মানে না, ইতিহাস বার বার তা প্রমাণ করেছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। সে দেশে শান্তিকামী সাধারণ মানুষের উপর একের পর এক আঘাত, শিল্প-সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হিংসাত্মক হামলা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে এ পারে পশ্চিমবঙ্গেও। উত্তাল বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উঠতেই আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে যন্ত্রণা ও আক্ষেপ উগরে দিলেন টলিউডের একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাট্যব্যক্তিত্ব ও শিল্পীরা। তাঁদের কণ্ঠে ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন—
“পড়শি যদি ভাল না থাকে, আমরা কী করে ভাল থাকি?”
রঙ্গমঞ্চ থেকে রুপোলি পর্দা— সর্বত্রই যেন মনখারাপের ছায়া। যাঁরা শিল্পকে জীবনের ভাষা, মানবিকতার অন্যতম স্তম্ভ বলে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে এই পরিস্থিতি নিছক রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং সভ্যতার ভিত নাড়িয়ে দেওয়া এক ভয়াবহ সংকেত। শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির উপর আঘাত মানে মানুষের চিন্তা ও মননের উপর আঘাত— এমনটাই মনে করছেন শিল্পীমহল।
বাংলাদেশের মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান ও শিল্পীদের লক্ষ্য করে হিংসা চালানো তাঁদের আরও বিচলিত করছে। কারণ দুই বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির সম্পর্ক কেবল পেশাগত নয়, তা আবেগ, ইতিহাস ও সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বাঁধা। সেই বন্ধন বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুই দেশের মানুষের মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ে।
টলিউডের শিল্পীদের একটাই আবেদন— ধ্বংস নয়, সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি। কারণ গান, নাটক, সিনেমা বা সাহিত্যই পারে হিংসার বিরুদ্ধে মানবতার বার্তা পৌঁছে দিতে। শান্তি ফেরাতে পারে সংলাপ ও সংস্কৃতি, অস্ত্র বা আগ্রাসন নয়— এই বিশ্বাস থেকেই আজ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন দুই বাংলার শিল্পীসমাজ।
বাংলাদেশে ফের নতুন করে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির মৃত্যুর পর। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়। একাধিক জায়গায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে সংবাদপত্রের দফতরে, আক্রান্ত হয়েছেন সাংবাদিক ও কর্মীরা। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
এই অশান্তির আঁচ গিয়ে পড়েছে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনেও। বিক্ষোভকারীদের আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। স্বাধীন চিন্তা, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস বহনকারী এই প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও স্তব্ধতা নেমে এসেছে দুই বাংলার শিল্পীসমাজে। বহু বছর ধরে রবীন্দ্রসঙ্গীত, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছায়ানটের উপর আঘাত মানে শুধুই একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের উপর সরাসরি আঘাত।
শিল্পীমহলের একাংশের মতে, যে কোনও অশান্তির সময়েই প্রথম আঘাত আসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। সংবাদমাধ্যম, শিল্প-সংস্কৃতি এবং চিন্তার জায়গাগুলিই সবচেয়ে আগে লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, হিংসা ও উন্মত্ততা কখনও সভ্যতার রক্ষাকবচ হতে পারে না।
এই অঘটন যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে— হিংসার প্রথম শিকার হয় শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক চর্চা। যেখানে গান মানুষের ব্যথা কমায়, নাটক প্রশ্ন তুলতে শেখায়, সাহিত্য মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করে, সেখানে সেইসব চর্চাকেই ধ্বংস করার চেষ্টা সমাজকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এই পরিস্থিতিতে শিল্পীসমাজের একটাই আশা ও আবেদন— অশান্তি থামুক, শিল্প-সংস্কৃতি বাঁচুক, মানবিকতাই শেষ কথা হোক।
এ পার বাংলার খ্যাতনামী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের কণ্ঠে ছিল অসহায় ক্ষোভ। ছায়ানটের উপর হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা এক কথায় দানবিক, উন্মত্ত গুন্ডাগিরি। এর প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।”
গায়িকার আফসোস আরও তীব্র—
“যে গান মানুষের ব্যাধি কমাতে ব্যবহৃত হয়, যে সঙ্গীত মানুষকে মানবিক হতে শেখায়, সেই সঙ্গীতচর্চার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এর চেয়ে ঘৃণ্য ঘটনা আর কী হতে পারে! প্রতি মুহূর্তে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি, ধিক্কার জানাচ্ছি।”
শিল্পীর মতে, এই আক্রমণ শুধুই একটি প্রতিষ্ঠানের উপর নয়— এটি মানুষের মনন ও সংস্কৃতির উপর আঘাত।
একই আক্ষেপ শোনা গেল বর্ষীয়ান অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর কথায়। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় তৈরি জনপ্রিয় ছবি ‘বেদের মেয়ে জোস্না’-র নায়ক তিনি। যদিও ও পার বাংলায় শুটিং করার অভিজ্ঞতা তাঁর খুব বেশি নেই, তবু বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ রয়েছে।
তিনি বলেন,
“বাংলাদেশ শিল্প-সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেই সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যা কিছু ভাল— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গন— সব পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। জানি না এর শেষ কোথায়!”
চিরঞ্জিতের মতে, বিনোদনদুনিয়ার উপর বার বার আঘাত নেমে আসা কোনও ভাবেই কাম্য নয়। তাঁর আশঙ্কা,
“নিজের দেশকে ধ্বংস করার পাশাপাশি ভারত-বিরোধী বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এতে দুই দেশের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ভয়ানক ভাবে ব্যাহত হবে।”
গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ক্ষত এখনও টাটকা বাংলাদেশে। দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও পেশাগত আদানপ্রদান কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভিসা না পাওয়ায় বহু অভিনেতা, পরিচালক ও শিল্পী শুটিংয়ে যোগ দিতে পারেননি।
ক্রমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছিল। চলছিল সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব। মনে হচ্ছিল, ভয় কাটিয়ে ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে বাংলাদেশ। ঠিক সেই সময়েই ফের আঘাত।
এই নতুন করে তৈরি হওয়া অস্থিরতা দুই বাংলার শিল্পীসমাজকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল।
বছরের শেষে এমন বাংলাদেশ মেনে নিতে পারছেন না অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক। তাঁর মতে,
“সব ধরনের হিংসার ঊর্ধ্বে বিনোদনদুনিয়া। সেখানে যদি মৌলবাদ ছায়া ফেলে, তার থেকে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না।”
বড়দিনে মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর নতুন ছবি ‘মিতিন মাসি’ ফ্র্যাঞ্চাইজ়ির পরবর্তী কিস্তি। মহিলা গোয়েন্দার ভূমিকায় থাকা মিতিন যদি এই পরিস্থিতিতে তদন্তের দায়িত্ব পেতেন, কী করতেন? হাসি-গম্ভীর মিশেলে কোয়েলের উত্তর,
“সবার আগে প্রকৃত খুনিকে ধরত। নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচাত। শান্তিই প্রতিষ্ঠা করত।”
কোয়েলের মতে, ধ্বংস নয়— মানুষের বাঁচাই হওয়া উচিত সকলের প্রথম লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বর্তমান ধ্বংসাত্মক রূপ নাট্যকার অবন্তী চক্রবর্তীকে বার বার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সুখস্মৃতির দিনগুলোতে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন,
“কত নাটক ও পার বাংলায় গিয়ে মঞ্চস্থ করেছি! আমার বাংলাদেশের অভিনেতা বন্ধুরা দল বেঁধে নাটক দেখতে এসেছেন। আবার কখনও এ পারে এসে নিজেরা নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। সে দিনগুলো কি আর ফিরে আসবে?”
নিজেকেই প্রশ্ন করেন তিনি। অবন্তীর বিশ্বাস,
“সবার উপরে মানুষ, তার উপরে মানবিকতা। হিংসা কখনও কোনও সমস্যার সমাধান হতে পারে না।”
তাঁর আবেদন— অশান্তি ভুলে ফের শান্ত হোক বাংলাদেশ।
প্রায় একই সুর শোনা গেল ঊষসী চক্রবর্তী, বিক্রম চট্টোপাধ্যায় ও রূপাঞ্জনা মিত্রের কথাতেও।
ঊষসীর মতে,
“বাংলাদেশের সবুজ-শ্যামল রূপটাই দেখতে ভালবাসি। দুই বাংলার সৌভ্রাতৃত্বের কথা মনে পড়ে। এই হানাহানি কোনও শান্তি ফেরাতে পারে না।”
তিনি সকলকে শান্ত থাকার আর্জি জানিয়েছেন।
বিক্রম চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য আরও কঠোর,
“বাংলাদেশে যা ঘটছে তা লজ্জাজনক এবং হৃদয়বিদারক। যে পরিমাণ ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, তা বিশ্বাস করা যায় না। এই পৃথিবীতে সবার আগে মানবতা। ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো, মানুষ হত্যা করা— এরা মানুষ নয়।”
রূপাঞ্জনা মিত্রও স্তব্ধ,
“ধর্মের নামে যে ভাঙচুর, ঘৃণা ও সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তা অমানবিক। মানবতা সব সময়ই ধর্মের ঊর্ধ্বে হওয়া উচিত।”
এই মুহূর্তে দুই বাংলার শিল্পীসমাজের একটাই আবেদন—
ধ্বংস নয়, সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি।
কারণ শিল্পই পারে মানুষের মধ্যে মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে। গান, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য— এগুলিই তো সভ্যতার আয়না। সেই আয়নাই যদি ভেঙে ফেলা হয়, তবে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
পড়শি যদি ভাল না থাকে, আমরা কী করে ভাল থাকি— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজ উদ্বিগ্ন টলিউড