Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অবশেষে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ফিরছে গাজ়ায়, রবিবার খুলছে রাফা ক্রসিং

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজ়রায়েল হামাস সংঘাত শুরুর পর নিরাপত্তাজনিত কারণে রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেয় মিশর। পরবর্তী পর্যায়ে ইজ়রায়েলি সেনার নিষেধাজ্ঞায় রাফা ক্রসিং দিয়ে যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

অবশেষে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ফিরছে গাজ়ায়, রবিবার খুলছে রাফা ক্রসিং
International News

দীর্ঘ টানাপোড়েন, কূটনৈতিক চাপ এবং ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের আবহে শেষ পর্যন্ত বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলতে চলেছে প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড গাজ়া-র জন্য। আন্তর্জাতিক মহলের একাধিক অনুরোধ, রাষ্ট্রসংঘ ও পশ্চিমি শক্তিগুলির মধ্যস্থতা এবং লাগাতার মানবাধিকার সংস্থার চাপের প্রেক্ষিতে গাজ়ার সঙ্গে পড়শি মিশর-এর একমাত্র স্থলপথ রাফা ক্রসিং আংশিক ভাবে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ইজ়রায়েল সরকার। রবিবার থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে, যা দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা গাজ়াবাসীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমিত স্বস্তির বার্তা বহন করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এবং ইজ়রায়েলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই রাফা সীমান্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল গভীর অনিশ্চয়তা। শুরুতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এই সীমান্ত বন্ধ করে দেয় মিশর। কায়রোর আশঙ্কা ছিল, সীমান্ত খুলে দিলে গাজ়ায় ইজ়রায়েলি সামরিক অভিযানের মুখে পড়া হামাসের সশস্ত্র সদস্যরা মিশরের ভূখণ্ডে ঢুকে আশ্রয় নিতে পারেন। সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই প্রথম পর্যায়ে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। গাজ়ায় মানবিক সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। খাদ্য, পানীয় জল, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিশর নিয়ন্ত্রিত ভাবে রাফা সীমান্ত খুলে ত্রাণ পাঠানোর অনুমতি দেয়। যদিও খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী প্রবেশ করতে শুরু করে, সাধারণ গাজ়াবাসীর যাতায়াত তখনও কঠোরভাবে সীমাবদ্ধই ছিল।

পরবর্তী ধাপে অসামরিক মানুষের সীমিত যাতায়াতের অনুমতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল মিশর প্রশাসন। অসুস্থ রোগী, ত্রাণকর্মী এবং বিশেষ মানবিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবহারের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ কার্যত থমকে যায় ইজ়রায়েল সরকারের সিদ্ধান্তে। দক্ষিণ গাজ়ার রাফা ক্রসিং দিয়ে সব ধরনের যাতায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তেল আভিভ। ইজ়রায়েলের যুক্তি ছিল, সীমান্ত খুলে দিলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে এবং হামাস পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের পাশাপাশি পণবন্দি ইস্যুও বড় ভূমিকা নেয়। গত মাসে আমেরিকার মধ্যস্থতায় সংঘর্ষবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা চলাকালীন ইজ়রায়েল স্পষ্ট করে জানায়, হামাসের হাতে আটক শেষ ইজ়রায়েলি পণবন্দির দেহ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত রাফা ক্রসিং খোলা হবে না। ওই পণবন্দি ছিলেন ২৪ বছর বয়সী ইজ়রায়েলি পুলিশ বাহিনীর সার্জেন্ট রান গভিলি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর রাতে হামাসের হামলার সময় তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ গাজ়ায় ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে রানের দেহ উদ্ধার করে ইজ়রায়েলি সেনা। এই ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। হামাসের তরফে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইজ়রায়েলি সেনার হামলাতেই ওই পণবন্দির মৃত্যু হয়েছে এবং দেহ ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। হামাসের দাবি অনুযায়ী, দেহ উদ্ধারের জন্য তারা ইজ়রায়েলকে তথ্য দিয়েও সহায়তা করেছে।

ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-র সরকার এই দাবির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া না দিলেও ঘটনাচক্রে দেহ উদ্ধারের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রাফা ক্রসিং আংশিক ভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা আসে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সময়সীমা নিছক কাকতালীয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং একাধিক মানবাধিকার সংগঠন গাজ়ায় মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সীমান্ত খোলার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।

রাফা ক্রসিং আংশিক ভাবে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে গাজ়াবাসীর কাছে সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের এই দরজা খুলে যাওয়া মানসিক ও বাস্তব—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও মোটেই স্বাভাবিক বলা যায় না। সীমান্ত খুললেও তা সম্পূর্ণ মুক্ত নয়; বরং কড়া নিরাপত্তা, নজরদারি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই চলবে যাতায়াত ও পণ্য প্রবেশ।

ইজ়রায়েল ও মিশর—দু’দেশের নিরাপত্তা সংস্থার অনুমতির উপর নির্ভর করবে কে বা কারা সীমান্ত পেরোতে পারবেন। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অসামরিক মানুষ, গুরুতর অসুস্থ রোগী, ত্রাণকর্মী কিংবা অনুমোদিত পণ্যই সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ পাবে বলে ধারণা। খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী ঢুকলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের বিপুল প্রয়োজন মেটানো যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিকে মানবিক প্রয়োজনের স্বীকৃতি, অন্যদিকে জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের ফল। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ—এই তিনটির মাঝামাঝি পথ বেছে নিয়েছে ইজ়রায়েল সরকার। রাষ্ট্রসংঘ ও বিভিন্ন পশ্চিমি শক্তি দীর্ঘদিন ধরেই গাজ়ার পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করে সীমান্ত খোলার দাবি জানিয়ে আসছিল। সেই চাপ উপেক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল তেল আভিভের পক্ষে।

news image
আরও খবর

মিশরও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গাজ়ার সঙ্গে তাদের একমাত্র স্থলসীমান্ত হওয়ায় কায়রোকে একদিকে মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হচ্ছে। সীমান্ত খুলে দিলে যাতে জঙ্গি অনুপ্রবেশ বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি না বাড়ে, সে বিষয়ে মিশর বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

গাজ়ায় বর্তমানে খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসা পরিষেবা ও আশ্রয়ের সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি প্রকাশ্যেই মানবিক বিপর্যয় বলে চিহ্নিত করছে। দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান ও অবরোধের জেরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কার্যত ভেঙে পড়েছে। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে অপুষ্টি বাড়ছে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ঘাটতিতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকটে জল সরবরাহ ও নিকাশি ব্যবস্থাও ঠিকমতো কাজ করছে না।

সবচেয়ে করুণ চিত্র হাসপাতালগুলির। চিকিৎসা পরিকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে বলা যায়। বহু হাসপাতাল আংশিক বা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। আহত ও অসুস্থ রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকেরা চরম চাপ ও ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের নিজেদের সুরক্ষারও ব্যবস্থা নেই। শিশু, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী মহিলাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ।

এই পরিস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। বহু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে অস্থায়ী শিবির, স্কুল ভবন কিংবা খোলা আকাশের নিচে। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের শিক্ষা কার্যত বন্ধ, মানসিক আঘাতের পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতাও বাড়ছে দ্রুত। বৃদ্ধদের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ ও পরিচর্যার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি রাফা ক্রসিং পুরোপুরি বন্ধ থাকত, তা হলে গাজ়া-র মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর ও ভয়াবহ আকার নিত। গাজ়ার সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগের জন্য এই সীমান্তই কার্যত একমাত্র স্থলপথ। আকাশ ও সমুদ্রপথ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল থাকায় খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি এবং জরুরি ত্রাণ পৌঁছনোর ক্ষেত্রে রাফা ক্রসিংয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এই পথ বন্ধ থাকলে ত্রাণ সরবরাহ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠত।

গাজ়ায় বর্তমানে যে মানবিক সংকট চলছে, তা শুধুমাত্র যুদ্ধের ফল নয়; দীর্ঘদিনের অবরোধ, সীমিত সরবরাহ ও পরিকাঠামোর ধ্বংস মিলিয়ে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ন্যূনতম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। হাসপাতালগুলিতে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির ঘাটতি এতটাই তীব্র যে বহু ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসাও দেওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় রাফা ক্রসিং দিয়ে অন্তত সীমিত পরিসরে ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মানবিক সহায়তার একটি ন্যূনতম পথ খোলা রইল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে তাঁরা এটাও স্পষ্ট করে বলছেন, আংশিক ভাবে সীমান্ত খোলা মানেই সমস্যার সমাধান নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ সহায়তার প্রয়োজন, তার তুলনায় এই ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত সীমিত। কত মানুষ যাতায়াত করতে পারবেন, কোন পণ্য ঢুকবে, কী পরিমাণে ঢুকবে—সব কিছুই কঠোর নজরদারি ও অনুমতির উপর নির্ভর করছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তার গতি ও পরিমাণ—দুটোই কম থাকছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাফা ক্রসিং আংশিক ভাবে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গাজ়া সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলেও এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। এই পদক্ষেপে যুদ্ধ থেমে যাচ্ছে না, অবরোধ উঠে যাচ্ছে না, কিংবা গাজ়াবাসীর সমস্ত সমস্যা এক ঝটকায় মিটে যাচ্ছে—এমন দাবি কেউই করছেন না। তবু বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটি দরজা খুলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে এই সীমিত উদ্যোগ অন্তত আশা জাগাচ্ছে যে, মানবিক সহায়তা পুরোপুরি থেমে যাবে না।

এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে এই দিকেই—এই সীমিত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কি আরও বিস্তৃত মানবিক করিডরের পথে এগোতে পারে। রাফা ক্রসিং কি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ত্রাণ ও অসামরিক যাতায়াতের পথ হয়ে উঠবে? আরও বেশি খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কি গাজ়ায় পৌঁছতে পারবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই মানবিক উদ্যোগ কি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সংঘর্ষবিরতির পথে কোনও বাস্তব অগ্রগতির ইঙ্গিত দিতে সক্ষম হবে? গাজ়া সংকটের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলির উত্তরের উপর।

Preview image