ভারতের সড়ক পরিবহনের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক দিন আজ থেকে দিল্লি মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়েতে আর পেট্রোল বা ডিজেল পাম্প খোঁজার দরকার নেই এমনকি চার্জিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকারও প্রয়োজন নেই কারণ এই রাস্তাটি এখন ভারতের প্রথম ইলেকট্রিক হাইওয়ে বা ই হাইওয়েতে রূপান্তরিত হয়েছে এই রাস্তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালালে গাড়ির ব্যাটারি আপনা আপনি চার্জ হতে থাকবে ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তির জাদুতে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার যাত্রাপথ এখন হবে বিরতিহীন এবং সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত
ভারতের পরিবহন মানচিত্রে আজ এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো এতদিন আমরা জানতাম যে ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি চালাতে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চার্জিং এর চিন্তা বা রেঞ্জ অ্যাংজাইটি মাঝপথে চার্জ ফুরিয়ে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চার্জিং স্টেশনে বসে থাকতে হতো কিন্তু আজ সেই চিন্তার চিরস্থায়ী সমাধান হলো কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রক এবং আইআইটি দিল্লির যৌথ উদ্যোগে দিল্লি মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম ওয়্যারলেস ইলেকট্রিক হাইওয়ে বা ই হাইওয়ে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল আজ সকালে হরিয়ানার সোহনা পয়েন্টে প্রধানমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গড়করি একটি রিমোটের বোতাম টিপে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উদ্বোধন করলেন
আজকের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একটি লাইভ ডেমো বা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল যেখানে দেখা যায় একটি ইলেকট্রিক এসইউভি এবং একটি বিশাল ইলেকট্রিক ট্রাক ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে এবং তাদের ড্যাশবোর্ডে দেখা যাচ্ছে ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে অথচ কোনো তার বা প্লাগ লাগানো নেই এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা এবং অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান মন্ত্রী বলেন আজ আমরা প্রমাণ করলাম যে ভারত প্রযুক্তিতে কারোর চেয়ে পিছিয়ে নেই বরং আমরাই বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছি আমেরিকা এবং ইউরোপে এই প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে কিন্তু ভারত এত বড় স্কেলে বা পরিসরে এটি প্রথম বাস্তবায়ন করল
কীভাবে কাজ করে এই ই হাইওয়ে
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে চলন্ত গাড়িতে কীভাবে চার্জ দেওয়া সম্ভব এর উত্তরে আইআইটি দিল্লির প্রজেক্ট হেড ডক্টর অরবিন্দ শর্মা বলেন আমরা এখানে ডায়নামিক ওয়্যারলেস পাওয়ার ট্রান্সফার বা ডিডব্লিউপিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি এই প্রযুক্তিতে রাস্তার পিচের নিচে কয়েক ইঞ্চি গভীরে তামার কয়েল বা তারের কুন্ডলী বসানো হয়েছে এই কয়েলগুলো গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে একটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে
অন্যদিকে গাড়ির নিচে একটি রিসিভার প্যাড বা গ্রাহক যন্ত্র লাগানো থাকে যখন গাড়িটি ওই কয়েলের ওপর দিয়ে যায় তখন চৌম্বকীয় আবেশ বা ম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন প্রক্রিয়ায় গাড়ির রিসিভারে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং তা সরাসরি ব্যাটারিতে চলে যায় এটি অনেকটা আমাদের মোবাইল ফোন ওয়্যারলেস চার্জারে চার্জ দেওয়ার মতো কিন্তু এখানে চার্জার এবং ফোন দুটোই স্থির থাকে না বরং গাড়িটি গতিতে থাকে হাইওয়ের প্রতিটি লেনে এই চার্জিং ব্যবস্থা নেই শুধুমাত্র ডানদিকের লেন বা ডেডিকেটেড চার্জিং লেনে গাড়ি চালালে এই সুবিধা পাওয়া যাবে
খরচ এবং পেমেন্ট সিস্টেম
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এই বিদ্যুতের দাম কে দেবে বা কীভাবে দেবে সরকার জানিয়েছে এর জন্য কোনো টোল বুথে দাঁড়াতে হবে না বা ক্যাশ টাকা দিতে হবে না পুরো প্রক্রিয়াটি জিপিএস এবং ফাস্ট্যাগ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে যখনই আপনার গাড়ি চার্জিং লেনে প্রবেশ করবে তখন রাস্তার সেন্সর গাড়িটিকে শনাক্ত করবে এবং কতটা বিদ্যুৎ খরচ হলো তা হিসাব করবে হাইওয়ে থেকে বেরোনোর সময় আপনার ফাস্ট্যাগ অ্যাকাউন্ট বা লিঙ্ক করা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সেই টাকা কেটে নেওয়া হবে সরকার জানিয়েছে এই বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম বাড়ির বিদ্যুতের চেয়ে একটু বেশি হবে কিন্তু পেট্রোল বা ডিজেল খরচের তুলনায় তা অন্তত ৫০ শতাংশ কম হবে
লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহনে বিপ্লব
এই ই হাইওয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে লজিস্টিকস সেক্টর বা পণ্য পরিবহন শিল্প বর্তমানে ডিজেল চালিত ট্রাকগুলো প্রচুর দূষণ ছড়ায় এবং জ্বালানি খরচ অনেক বেশি ইলেকট্রিক ট্রাক বাজারে এলেও চার্জিং এর সমস্যার জন্য তা দূরপাল্লায় চলতে পারত না কিন্তু এই ই হাইওয়ে চালু হওয়ার ফলে ট্রাকগুলো এখন দিল্লি থেকে মুম্বাই বা মুম্বাই থেকে দিল্লি কোনো বিরতি ছাড়াই যাতায়াত করতে পারবে কারণ তাদের ব্যাটারি কখনোই শেষ হবে না এর ফলে পরিবহন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাবে যার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে সবজি ফল এবং অন্যান্য সামগ্রী এখন আরও সস্তায় এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাবে
পরিবেশ এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট
দিল্লি এবং মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলো বায়ুদূষণে জর্জরিত এই এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ ডিজেল গাড়ি এবং ট্রাক রাস্তা থেকে সরে যাবে বা ইলেকট্রিক গাড়িতে রূপান্তরিত হবে পরিবেশবিদরা বলছেন এর ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড কমবে যা ভারতের নেট জিরো বা কার্বন মুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করবে রাস্তার পাশে বসানো সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এই হাইওয়ের বিদ্যুতের জোগান দেওয়া হচ্ছে তাই এটি একটি সম্পূর্ণ গ্রিন করিডর বা সবুজ করিডর
নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি
অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে রাস্তার নিচে শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র থাকলে তা কি যাত্রীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে বা পেসমেকার বসানো রোগীদের কোনো সমস্যা হবে কি না এই বিষয়ে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা এইমস এর ডাক্তাররা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষা চালিয়েছেন তারা নিশ্চিত করেছেন যে গাড়ির বডি বা ধাতব শরীর এই চৌম্বকীয় তরঙ্গকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয় তাই যাত্রীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ তাছাড়া এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড বা সেফটি স্ট্যান্ডার্ড মেনেই তৈরি করা হয়েছে রাস্তার নিচে থাকা কয়েলগুলো সম্পূর্ণ ইনসুলেটেড বা বিদ্যুৎনিরোধক তাই বর্ষাকালে জল জমলেও শর্ট সার্কিট বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কোনো ভয় নেই
অটোমোবাইল শিল্পের নতুন দিগন্ত
এই হাইওয়ে চালু হওয়ার সাথে সাথে ভারতের গাড়ি শিল্পে এক নতুন জোয়ার এসেছে টাটা মাহিন্দ্রা এবং টেসলার মতো কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তাদের আগামী মডেলগুলোতে এই ওয়্যারলেস চার্জিং রিসিভার বিল্ট ইন বা আগে থেকেই লাগানো থাকবে পুরনো ইভি মালিকরাও অথরাইজড সার্ভিস সেন্টার থেকে তাদের গাড়িতে এই রিসিভার লাগিয়ে নিতে পারবেন যার খরচ খুব বেশি হবে না বলে আশা করা হচ্ছে ব্যাটারি সোয়াপিং বা ব্যাটারি বদলানোর ঝামেলার চেয়ে এটি অনেক বেশি সুবিধাজনক
ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল
সরকার জানিয়েছে দিল্লি মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ে হলো পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প এর সাফল্যের পর আগামী ৫ বছরের মধ্যে ভারতের গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল বা সোনালী চতুর্ভুজ অর্থাৎ দিল্লি কলকাতা চেন্নাই এবং মুম্বাই সংযোগকারী হাইওয়েগুলোকে ই হাইওয়েতে পরিণত করা হবে এছাড়াও বেঙ্গালুরু হায়দ্রাবাদ এবং পুনে রিং রোডগুলোতেও এই প্রযুক্তি বসানো হবে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের ৫০ শতাংশ হাইওয়ে ওয়্যারলেস চার্জিং যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা
জার্মানি এবং সুইডেনে ছোট পরিসরে বা কয়েক কিলোমিটার রাস্তায় প্যান্টোগ্রাফ বা ওভারহেড তারের মাধ্যমে ট্রাক চালানোর পরীক্ষা হয়েছে কিন্তু ভারতের মতো ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়্যারলেস চার্জিং হাইওয়ে বিশ্বের কোথাও নেই বিশ্ব ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ভারতের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে ইলন মাস্ক টুইট করে বলেছেন ভারত আজ ইভি প্রযুক্তির গেম চেঞ্জার হয়ে উঠল আমি শীঘ্রই ভারতে এসে এই হাইওয়েতে গাড়ি চালাতে চাই
সাধারণ মানুষের এবং চালকদের প্রতিক্রিয়া
ট্রাক চালক রাম সিং বলেন আমি গত ২০ বছর ধরে এই রুটে ট্রাক চালাই আগে ডিজেলের গন্ধে এবং ধোঁয়ায় খুব কষ্ট হতো আর পাম্পে লাইন দিতে দিতে সময় নষ্ট হতো এখন ইলেকট্রিক ট্রাক চালিয়ে খুব আরাম পাচ্ছি কোনো শব্দ নেই কোনো ধোঁয়া নেই আর চার্জ নিয়েও চিন্তা নেই গাড়ি চললেই চার্জ হয় এটা তো জাদুর মতো মনে হচ্ছে এক প্রাইভেট কার মালিক বলেন আমরা উইকেন্ডে বা ছুটির দিনে লং ড্রাইভে যেতে ভয় পেতাম যদি চার্জ শেষ হয়ে যায় এখন আর সেই ভয় নেই দিল্লি থেকে জয়পুর লাঞ্চ করতে যাওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেল
রক্ষণাবেক্ষণ এবং চ্যালেঞ্জ
অবশ্যই এত বড় প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ রাস্তার পিচ খারাপ হয়ে গেলে নিচের কয়েল নষ্ট হয়ে যেতে পারে তাই ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি বা এনএইচএআই বিশেষ ধরনের কংক্রিট ব্যবহার করেছে যা সহজে নষ্ট হয় না এছাড়াও রাস্তার প্রতিটি কিলোমিটার জুড়ে সেন্সর বসানো আছে যা কন্ট্রোল রুমে খবর পাঠায় যদি কোনো কয়েলে সমস্যা হয় তবে ড্রোন বা রোবট পাঠিয়ে তা মেরামত করা হবে হাইওয়ের সুরক্ষার জন্য সিসিটিভি এবং স্পিড গান বসানো হয়েছে যাতে কেউ চার্জিং লেনে অনর্থক ভিড় না করে
অর্থনৈতিক লাভ এবং জিডিপি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন এই ই হাইওয়ে ভারতের জিডিপিতে বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে অন্তত ১ শতাংশ অবদান রাখবে তেলের আমদানি কমলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে যা অন্য উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো যাবে এছাড়াও হাইওয়ের পাশে নতুন নতুন স্মার্ট সিটি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব বা শিল্পতালুক গড়ে উঠবে যেখানে ইভি ব্যাটারি এবং চার্জিং সরঞ্জাম তৈরি হবে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ তৈরি হবে
পর্যটনের বিকাশ
দিল্লি মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ে রাজস্থান মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটের মধ্য দিয়ে গেছে এই রাজ্যগুলোর পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন আরও বেশি পর্যটক পাবে কারণ ইভি নিয়ে যাতায়াত করা সস্তা এবং আরামদায়ক রণথম্বোর ন্যাশনাল পার্ক বা উদয়পুর এখন দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পর্যটকরা পরিবেশবান্ধব উপায়ে ভ্রমণ করতে পারবেন যা ইকো টুরিজম বা পরিবেশ পর্যটনকে উৎসাহিত করবে
উপসংহার
২০২৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের জন্য এক গর্বের দিন আমরা প্রমাণ করলাম যে উন্নয়নশীল দেশ হলেও আমরা ভাবনায় এবং প্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারি দিল্লি মুম্বাই ই হাইওয়ে কেবল একটি রাস্তা নয় এটি ভারতের আত্মনির্ভরতার প্রতীক এটি আমাদের শেখায় যে সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন বিজ্ঞান এবং সদিচ্ছা থাকলে তার সমাধান সম্ভব পেট্রোল পাম্পের সেই লম্বা লাইন আর কালো ধোঁয়ার দিন শেষ এবার আমরা এক নিঃশব্দ এবং নীল আকাশের নিচে ছুটে চলব প্রগতির পথে ভারতের চাকা এখন বিদ্যুতের গতিতে ঘুরছে এবং সেই গতি কেউ থামাতে পারবে না জয় হিন্দ