ভারতের টি-টোয়েন্টি দল থেকে বাদ পড়লেও হাল ছাড়েননি সূর্যকুমার যাদব। জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে পুরোদমে অনুশীলন শুরু করেছেন ভারতের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক।
হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নন সূর্যকুমার যাদব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বারবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও নিজের ব্যাটিং প্রতিভা, পরিশ্রম এবং মানসিক দৃঢ়তার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ভারতীয় টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব হারানো এবং পরবর্তী সময়ে দল থেকে বাদ পড়ার ধাক্কা তাঁর ক্রিকেটজীবনে নতুন এক কঠিন অধ্যায় তৈরি করেছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে আবারও মাঠে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন সূর্যকুমার।
মুম্বইয়ের বাসু পরাঞ্জপে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে পুরোদমে অনুশীলন করছেন ভারতীয় ব্যাটার। দৌড়, ফিটনেস ট্রেনিং এবং দীর্ঘ সময় ধরে নেটে ব্যাটিং—প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনও ক্ষেত্রেই খামতি রাখতে চাইছেন না তিনি। সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক অনুশীলনের ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
ভিডিয়োর সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে সূর্যকুমার জানিয়েছেন, একটি অনুশীলন সেশনেই তিনি তিন ঘণ্টায় প্রায় হাজার বল খেলেছেন। এই ছোট্ট বার্তার মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। প্রশ্ন উঠছে, এই অনুশীলনের ভিডিয়ো কি শুধুই সমর্থকদের জন্য দেওয়া একটি সাধারণ আপডেট, নাকি ভারতীয় দলের প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর এবং প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের উদ্দেশে সূর্যকুমারের বিশেষ বার্তা?
ভারতীয় দল থেকে বাদ পড়া যে কোনও ক্রিকেটারের কাছেই বড় ধাক্কা। বিশেষ করে যে ক্রিকেটার কিছু দিন আগেও দলের অধিনায়ক ছিলেন, তাঁর ক্ষেত্রে এই ধাক্কা আরও বেশি। নেতৃত্ব হারানোর পাশাপাশি প্রথম একাদশ এবং দল থেকেও জায়গা হারানো মানসিকভাবে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
তবে সূর্যকুমারের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি এই পরিস্থিতিকে নিজের ক্রিকেটজীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন না। বরং নতুন একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর সামনে এখন একটাই লক্ষ্য—নিজেকে আবারও প্রমাণ করা এবং জাতীয় দলে জায়গা ফিরে পাওয়া।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিভার পাশাপাশি ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ক্রিকেটার যত বড় নামই হোন না কেন, দীর্ঘ সময় ধরে রান না এলে নির্বাচকদের পক্ষে তাঁকে দলে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সূর্যকুমারের ক্ষেত্রেও সেই সমস্যাই সামনে এসেছে। তাঁর প্রতিভা কিংবা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও সাম্প্রতিক ব্যাটিং ফর্ম নির্বাচকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল।
সেই কারণেই এখন ব্যাটিং অনুশীলনের উপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে সময় কাটিয়ে নিজের পুরনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তিন ঘণ্টায় হাজার বল খেলার বিষয়টি শুধু তাঁর শারীরিক পরিশ্রমের প্রমাণ নয়, মানসিক সংকল্পেরও পরিচয়।
সূর্যকুমার বর্তমানে মুম্বইয়ের বাসু পরাঞ্জপে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন করছেন। প্রকাশিত ভিডিয়োয় তাঁকে প্রথমে ট্র্যাকে দৌড়াতে দেখা যায়। এরপর নেটে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটিং করেন তিনি। অর্থাৎ শুধু ব্যাটিং নয়, নিজের সামগ্রিক ফিটনেস এবং সহনশক্তির উন্নতিতেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আধুনিক ক্রিকেটে একজন ব্যাটারের জন্য শুধু দক্ষ শট খেলা যথেষ্ট নয়। ফিটনেস, দ্রুত রান নেওয়া, দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার ক্ষমতা, ফিল্ডিং এবং মানসিক সতেজতা—সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকতে হয়। সূর্যকুমার সম্ভবত সেই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই নিজের প্রস্তুতির পরিকল্পনা করেছেন।
ভিডিয়োর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “রবিবার খুব মজা হল। দৌড়ালাম। তিন ঘণ্টায় হাজার বল খেললাম। খুব ভাল লাগছে।”
কথাগুলি সাধারণ শোনালেও এর মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। তিন ঘণ্টায় হাজার বল খেলা কোনও সাধারণ অনুশীলন নয়। এর জন্য শারীরিক সক্ষমতা, মনঃসংযোগ এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে একই তীব্রতায় ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। এই অনুশীলন দেখিয়ে দেয়, নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার জন্য সূর্যকুমার কতটা পরিশ্রম করতে প্রস্তুত।
সূর্যকুমারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর ব্যাটিং ফর্ম। গত কয়েকটি মরসুমে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিক রান করতে পারেননি তিনি। একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তাঁর কাছ থেকে যে ধরনের পারফরম্যান্স আশা করা হয়েছিল, তা নিয়মিত দেখা যায়নি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সূর্যকুমারের ব্যাটিং শৈলী তাঁকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ব্যাটারে পরিণত করেছিল। মাঠের প্রায় সব দিকে শট খেলার ক্ষমতা, বোলারদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দেওয়া এবং দ্রুত রান তোলার দক্ষতার কারণে তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ দলও দ্রুত একজন ব্যাটারের শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে ফেলে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বোলারেরা সূর্যকুমারের বিরুদ্ধে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। শর্ট বল, শরীর লক্ষ্য করে বোলিং, অফ স্টাম্পের বাইরের নির্দিষ্ট লাইন কিংবা গতির পরিবর্তনের মাধ্যমে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সূর্যকুমার প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি।
এছাড়া তাঁর ব্যাটিংয়ের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক চরিত্রও কখনও কখনও সমস্যার কারণ হয়েছে। দ্রুত রান করার চেষ্টা করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট হারিয়েছেন। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ইনিংস গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। জাতীয় দলের জায়গা ধরে রাখতে হলে শুধু অতীতের পারফরম্যান্স নয়, বর্তমান ফর্মও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সূর্যকুমারকে বাইরে রেখে অন্য ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়ার পথে হাঁটেন নির্বাচকেরা।
দল থেকে বাদ পড়ার আগে সূর্যকুমারকে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপ জয়ের পরে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেট মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
একজন অধিনায়কের দায়িত্ব শুধু মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। দলের পরিবেশ তৈরি করা, ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস জোগানো, চাপের মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়া এবং নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। সূর্যকুমার সেই দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করে নির্বাচকেরা নতুন নেতৃত্বের দিকে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন।
প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর জানিয়েছিলেন, সূর্যকুমারকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া যে কতটা কঠিন, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।
আগরকরের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর নির্বাচকদের ভবিষ্যতের দিকেও তাকাতে হয়। আগামী দিনে কে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন, কার নেতৃত্বে পরবর্তী বড় প্রতিযোগিতাগুলির পরিকল্পনা করা হবে এবং কীভাবে নতুন ক্রিকেটারদের তৈরি করা হবে—এই সব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
অর্থাৎ সূর্যকুমারকে সরানোর সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। দলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এই সিদ্ধান্তের পরে সূর্যকুমারের সামনে নিজের ব্যাটিং ফর্ম ফিরে পাওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সমাজমাধ্যমে অনুশীলনের ভিডিয়ো প্রকাশের পর থেকেই একটি প্রশ্ন ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ঘুরছে—সূর্যকুমার কি এই ভিডিয়োর মাধ্যমে নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকর এবং প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরকে কোনও বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন?
ভিডিয়োয় সূর্যকুমার সরাসরি নির্বাচক বা কোচের নাম উল্লেখ করেননি। জাতীয় দলে ফেরার কথাও স্পষ্টভাবে লেখেননি। ফলে এটিকে নিশ্চিতভাবে নির্বাচকদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা বলা যাবে না। তবে তাঁর কঠোর অনুশীলন এবং তিন ঘণ্টায় হাজার বল খেলার তথ্যকে প্রত্যাবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
একজন জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারের পক্ষে নিজের প্রস্তুতির ভিডিয়ো প্রকাশ করা অস্বাভাবিক নয়। এটি সমর্থকদের কাছে তাঁর বর্তমান অবস্থার খবর পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে নির্বাচক এবং কোচিং দলের কাছেও একটি ইতিবাচক সংকেত যায়—ক্রিকেটার এখনও লড়াই ছাড়েননি এবং নিজের খেলার উন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন।
গৌতম গম্ভীর বরাবরই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা এবং দলের প্রয়োজন অনুযায়ী পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দেন বলে পরিচিত। অজিত আগরকরের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটিও বর্তমান ফর্ম, ফিটনেস এবং দলের ভারসাম্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছে। ফলে শুধু অনুশীলনের ভিডিয়ো নয়, সূর্যকুমারকে ঘরোয়া ক্রিকেট এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতায় রান করেই নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নেটে হাজার বল খেলা নিঃসন্দেহে বড় পরিশ্রমের পরিচয়। কিন্তু জাতীয় দলে ফিরতে হলে সূর্যকুমারকে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে রান করতে হবে। অনুশীলনে একজন ব্যাটার নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করতে পারেন, নতুন শট পরীক্ষা করতে পারেন এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারেন।