Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেসি-নির্ভর নয় আর্জেন্টিনা, টুখেলের ভুল পরিকল্পনায় নিয়ন্ত্রণ রেখেও ডুবল ইংল্যান্ড

লিয়োনেল মেসি ইংল্যান্ডের বক্সে খুব বেশি বিপজ্জনক হতে না পারলেও থামেনি আর্জেন্টিনার জয়রথ। দলগত শক্তি ও সতীর্থদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা দেখিয়ে দিল—তারা শুধু মেসিনির্ভর দল নয়।

মেসি গোল না করেও জয়, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা

রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই সেন্টার সার্কেলের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন লিয়োনেল মেসি। দু’হাত বুকের কাছে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। তাঁর চোখেমুখে তখন স্বস্তি, আবেগ এবং আনন্দের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সতীর্থেরা ছুটে এলেন তাঁর দিকে। কেউ জড়িয়ে ধরলেন, কেউ মাথায় হাত রাখলেন, আবার কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে এই অবিশ্বাস্য জয়ের আনন্দ উদ্‌যাপন করলেন।

ম্যাচের শেষ বাঁশির পর আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের উল্লাসই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, জয়টা তাদের কাছে কতটা মূল্যবান। কারণ এটি শুধু আর একটি জয় নয়। ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার জয়। তার চেয়েও বড় বিষয়, ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকার পরেও হার না মানা মানসিকতার জয়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার সাহসের জয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, মেসি গোল না করলেও আর্জেন্টিনা যে বড় ম্যাচ জিততে পারে—সেই বিশ্বাসের জয়।

এই ম্যাচে মেসি একটিও গোল করেননি। প্রতিপক্ষের বক্সে খুব বেশি প্রবেশও করতে পারেননি। ইংল্যান্ডের রক্ষণ তাঁকে ঘিরে রেখেছিল প্রায় গোটা ম্যাচ। তবু আর্জেন্টিনার জয় আটকানো যায়নি। কারণ বর্তমান আর্জেন্টিনা আর শুধু লিয়োনেল মেসির ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর নির্ভরশীল একটি দল নয়। এই আর্জেন্টিনা অনেক বেশি সংগঠিত, অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং দল হিসেবে অনেক বেশি শক্তিশালী।

৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও হার মানেনি আর্জেন্টিনা

একটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা যে কোনও দলের কাছেই কঠিন পরিস্থিতি। সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল। ইংল্যান্ড তখন ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। তাদের রক্ষণভাগ আরও নিচে নেমে এসে আর্জেন্টিনার আক্রমণ আটকানোর চেষ্টা করছিল। মাঝমাঠেও জায়গা কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মেসির দিকে বল গেলেই তাঁকে ঘিরে ফেলছিলেন একাধিক ইংরেজ ফুটবলার।

কিন্তু আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় হতাশা দেখা যায়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাদের আক্রমণের তীব্রতা তত বেড়েছে। বল দখলে রাখার পাশাপাশি দ্রুত গতিতে আক্রমণ গড়ে তুলতে শুরু করে তারা। দুই প্রান্ত ব্যবহার করে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। মাঝমাঠ থেকে একের পর এক বল পৌঁছতে থাকে আক্রমণভাগে।

ম্যাচের শেষ অংশে আর্জেন্টিনা যে ফুটবল খেলেছে, তা ছিল অবিশ্বাস্য। প্রতিটি ফুটবলার জানতেন, একটি ভুল মানেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায়। তবু চাপের মুখে ভয় না পেয়ে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে থাকে দলটি। তাড়াহুড়ো করে উদ্দেশ্যহীন লম্বা বল না বাড়িয়ে ছোট ছোট পাসে আক্রমণের জায়গা তৈরি করা হয়। প্রয়োজনের সময় গতিও বাড়ানো হয়।

আর্জেন্টিনার এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে শুধু ফুটবলীয় দক্ষতা নয়, মানসিক শক্তিও বড় ভূমিকা নিয়েছে। পিছিয়ে থেকেও ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, ম্যাচ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। শেষ বাঁশি বাজার আগে পর্যন্ত সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত তাদের বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেল।

মেসিকে আটকানোর পরিকল্পনা করেছিল ইংল্যান্ড

লিয়োনেল মেসিকে আটকানোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করা কোনও নতুন ঘটনা নয়। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দলই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে নামার আগে মেসিকে কীভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা যায়, সেই ছক তৈরি করে। ইংল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

মেসির কাছে বল পৌঁছলেই তাঁকে জায়গা না দেওয়ার চেষ্টা করছিল ইংল্যান্ড। একজন ফুটবলার সামনে থেকে চাপ তৈরি করছিলেন, অন্য একজন পাশের পাসের পথ বন্ধ করছিলেন। মেসি মাঝমাঠের দিকে নেমে বল ধরলে সেখানেও তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। ফলে নিজের পছন্দের জায়গা থেকে আক্রমণ তৈরি করার সুযোগ খুব কম পেয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।

গোটা ম্যাচে ইংল্যান্ডের বক্সে দু’বারের বেশি ঢুকতে পারেননি মেসি। তাঁর বাঁ পায়ের পরিচিত শট, ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া কিংবা গোলরক্ষকের সামনে বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি—এসব খুব বেশি দেখা যায়নি। ইংল্যান্ডের পরিকল্পনার প্রাথমিক অংশ সফলই বলা যায়। তারা মেসিকে গোল করা থেকে বিরত রাখতে পেরেছিল।

কিন্তু ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, তারা হয়তো ধরে নিয়েছিল মেসিকে আটকে রাখতে পারলেই আর্জেন্টিনাকেও আটকানো যাবে। বর্তমান আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে সেই ধারণা আর সঠিক নয়। মেসিকে ঘিরে রাখতে গিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণে অন্য জায়গায় ফাঁকা তৈরি হয়েছে। সেই জায়গাগুলো কাজে লাগিয়েছেন তাঁর সতীর্থেরা।

মেসি নিজে গোল করতে না পারলেও তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের রক্ষণে সব সময় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তাঁকে আটকানোর জন্য একাধিক ফুটবলার ব্যস্ত থাকায় আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়েরা তুলনামূলক বেশি জায়গা পেয়েছেন। এখানেই একজন মহান ফুটবলারের প্রভাব। তিনি সরাসরি গোল না করেও দলের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

মেসি গোল না করলেও জিততে পারে আর্জেন্টিনা

বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে একটি অভিযোগ শোনা যেত—দলটি অতিরিক্ত মেসি-নির্ভর। মেসি ভাল খেললে আর্জেন্টিনা জেতে, আর তাঁকে আটকে দেওয়া গেলে গোটা দল বিপদে পড়ে। অতীতে বিভিন্ন বড় ম্যাচে এই দুর্বলতা চোখে পড়েছে। প্রতিপক্ষ মেসিকে ঘিরে ফেললে আর্জেন্টিনার আক্রমণ অনেক সময় দিশাহীন হয়ে যেত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। বর্তমান আর্জেন্টিনা এমন একটি দল, যেখানে প্রত্যেক ফুটবলার নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। মেসি দলের সবচেয়ে বড় তারকা এবং মূল সৃষ্টিশীল শক্তি হলেও তাঁকে একা সব দায়িত্ব বহন করতে হয় না। মাঝমাঠ, রক্ষণ এবং আক্রমণ—প্রতিটি বিভাগেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা রয়েছে।

news image
আরও খবর

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মেসি গোল করেননি, তবু দল জিতেছে। মেসি প্রতিপক্ষের বক্সে খুব বেশি ঢুকতে পারেননি, তবু আর্জেন্টিনা গোলের সুযোগ তৈরি করেছে। মেসিকে কড়া নজরে রাখা হয়েছিল, তবু অন্য ফুটবলাররা সেই চাপ নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

এই পরিবর্তন আর্জেন্টিনার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। একটি বড় প্রতিযোগিতা জিততে হলে কোনও দল শুধু একজন ফুটবলারের উপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ম্যাচে আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে। কখনও তারকা ফুটবলার গোল করেন, কখনও রক্ষণভাগ দলকে বাঁচায়, কখনও মাঝমাঠ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়, আবার কখনও পরিবর্ত হিসেবে নামা কোনও ফুটবলার ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই দলগত চরিত্রই দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। মেসিকে আটকে রাখার পরেও ইংল্যান্ড ম্যাচটি জিততে পারেনি। কারণ মেসির চারপাশে থাকা ফুটবলাররা এখন শুধু তাঁকে সাহায্য করার জন্য মাঠে নামেন না; প্রয়োজন হলে নিজেরাই ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রাখেন।

শেষ ১৫ মিনিটে বদলে গেল ম্যাচের ছবি

ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার খেলায় যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। তার আগে পর্যন্ত ইংল্যান্ড তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল। তারা আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠে আটকে রাখছিল এবং মেসিকে বিপজ্জনক জায়গায় বল পেতে দিচ্ছিল না।

কিন্তু শেষ দিকে আর্জেন্টিনা আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয়। বল হারানোর পর দ্রুত তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা বল নিয়ে বেরোতে গেলেই সামনে থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এর ফলে ইংল্যান্ড নিজেদের অর্ধেই আটকে যেতে থাকে।

আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে ছোট পাসে এগোতে শুরু করেন। দুই প্রান্তে খেলোয়াড়দের সক্রিয়তা বাড়ে। বক্সের সামনে দ্বিতীয় বল জেতার ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। ইংল্যান্ডের রক্ষণ একবার বল বিপদমুক্ত করলেও তা আবার আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের কাছেই ফিরে আসছিল।

এই টানা চাপ ইংল্যান্ডের উপর মানসিক প্রভাব ফেলে। যে দলটি কিছুক্ষণ আগেও ফাইনালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের গোল রক্ষা করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আক্রমণে ওঠার সাহস কমে যায়। মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় ইংল্যান্ড বল ধরে রাখতে পারছিল না।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা প্রতিটি আক্রমণের সঙ্গে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, ইংল্যান্ডের রক্ষণে চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি গোল এলেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায় দলটি।

শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ করে আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচ ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে মনে হচ্ছিল, সেই ম্যাচের শেষ গল্প লিখল মেসির দল।

দলগত ফুটবলের সেরা উদাহরণ

আর্জেন্টিনার এই জয়কে শুধু একটি রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখলে সম্পূর্ণ ছবিটা ধরা পড়বে না। এই ম্যাচ ছিল দলগত ফুটবলের একটি বড় উদাহরণ।

ফুটবলে একজন খেলোয়াড় যত বড় তারকাই হোন না কেন, একা কোনও বড় প্রতিযোগিতা জেতা সম্ভব নয়। তাঁর পাশে এমন সতীর্থ প্রয়োজন, যারা কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিতে পারেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ঠিক সেটাই করেছেন।

মেসি যখন জায়গা পাচ্ছিলেন না, তখন অন্যরা আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করেছেন। বল হারানোর পর সবাই মিলে রক্ষণে নেমেছেন। ইংল্যান্ডের পাল্টা আক্রমণ আটকাতে মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগের ফুটবলারদের মধ্যে দুর্দান্ত বোঝাপড়া দেখা গিয়েছে। আবার গোলের প্রয়োজনের সময় রক্ষণভাগ থেকেও ফুটবলাররা সামনে উঠে দলের আক্রমণে সাহায্য করেছেন।

 

 

 

Preview image