বিশ্বকাপ ফাইনালের পর দানি অলমোকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষমা চান আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা। তবে সেই ক্ষমাপ্রার্থনার পাল্টা জবাব দিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেন স্পেনের তারকা ফুটবলার অলমো।
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ আগে। মাঠের লড়াই থেমে গিয়েছে, নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফুটবলারেরা অনেকেই দেশে ফিরে গিয়েছেন, কেউ আবার ক্লাব ফুটবলের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কিন্তু স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বিশ্বকাপ ফাইনালকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি থামেনি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, ফাইনালের পর ঘটে যাওয়া ধাক্কাধাক্কি এবং দুই দলের সদস্যদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর স্পেন এবং আর্জেন্টিনা শিবিরের কয়েকজন ফুটবলার ও কোচিং স্টাফের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালার সঙ্গে স্পেনের ফুটবলার দানি অলমোরও সংঘর্ষ হয় বলে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়। পরবর্তীতে ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন আয়ালা। কিন্তু তাঁর সেই ক্ষমাপ্রার্থনা মন থেকে করা হয়নি বলে দাবি করেছেন অলমো।
স্পেনের তারকা ফুটবলারের বক্তব্য, আয়ালা একদিকে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে ঘটনার দায় তাঁর উপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। অলমোর দাবি, তিনি আর্জেন্টিনার সহকারী কোচকে এমন কোনও কথা বলেননি, যার জেরে আয়ালা তাঁর দিকে তেড়ে যেতে পারেন বা ঘুষি মারার চেষ্টা করতে পারেন। ফলে আয়ালার বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য নয় বলেই অভিযোগ করেছেন তিনি।
আয়ালার ক্ষমাপ্রার্থনার প্রতিক্রিয়ায় অলমো বলেন, “ও দাবি করছে যে, মন থেকে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু যে মন থেকে ক্ষমা চাইবে, সে কখনওই বলবে না, একটা কথার জবাবে ও আমাকে ঘুষি মারতে গিয়েছিল। ও মিথ্যা কথা বলছে। আমি ওকে কিছুই বলিনি। অন্তত সত্যি বলার সাহস তো দেখাও।”
অলমোর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফুটবলমহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে খেলা শেষে দুই দলের সদস্যদের এমন আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আয়ালার ক্ষমা চাওয়ার পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ কোনও ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়ার সময় যদি একই সঙ্গে অপর পক্ষকে দায়ী করা হয়, তাহলে সেই ক্ষমাপ্রার্থনার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরু থেকেই স্পেন এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছিল। দুই দলই শারীরিক শক্তি, গতি এবং আগ্রাসনের সঙ্গে খেলেছিল। ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে ফুটবলারদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ফাউল এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে খেলার শেষ বাঁশি বাজার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দুই দলের কয়েকজন ফুটবলার এবং কোচিং স্টাফ একে অপরের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। প্রথমে স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির সঙ্গে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডির তর্ক শুরু হয়। দু’জনকেই উত্তেজিত অবস্থায় দেখা যায়। তাঁদের ঘিরে দুই দলের আরও কয়েকজন ফুটবলার জমায়েত করেন।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে ধীরে ধীরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। অভিযোগ, আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের তরুণ ফুটবলার গাভিকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেন। গাভি পড়ে যাওয়ার পর স্পেনের অন্য ফুটবলারেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা পারেদেসের দিকে এগিয়ে গেলে উভয় দলের আরও কয়েকজন ফুটবলার ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন।
এই সময় আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাকেও ঘটনাস্থলে দেখা যায়। বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গিয়েছে, তিনি স্পেনের দানি অলমোর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করছেন। একটি ভিডিওতে আয়ালাকে অলমোর দিকে উত্তেজিত অবস্থায় এগিয়ে যেতে দেখা যায়। যদিও ঠিক কী কথোপকথন হয়েছিল, তা ভিডিও থেকে স্পষ্ট নয়।
পরবর্তীতে আয়ালা দাবি করেন, অলমোর বলা একটি কথার প্রতিক্রিয়ায় তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তবে নিজের আচরণের জন্য তিনি অনুতপ্ত এবং অলমোর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও জানান আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ। আয়ালার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার উত্তেজনায় তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
কিন্তু আয়ালার এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ অলমো। তাঁর দাবি, তিনি এমন কোনও মন্তব্য করেননি, যা আয়ালাকে আক্রমণাত্মক আচরণ করার কারণ দিতে পারে। অলমোর মতে, আয়ালা এখন নিজের আচরণকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন।
ক্ষমাপ্রার্থনা সাধারণত ভুল স্বীকার, অনুশোচনা এবং ভবিষ্যতে একই আচরণ না করার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আয়ালা ক্ষমা চাইলেও একই সঙ্গে দাবি করেছেন, অলমোর বক্তব্যের কারণেই তিনি উত্তেজিত হয়েছিলেন। এখানেই আপত্তি জানিয়েছেন স্পেনের ফুটবলার।
অলমোর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সত্যিই অনুতপ্ত হলে তিনি নিজের কাজের সম্পূর্ণ দায় নেবেন। অন্য কারও কথা বা আচরণকে কারণ হিসেবে তুলে ধরবেন না। আয়ালা ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি অলমোর বিরুদ্ধে মন্তব্য করার অভিযোগ তোলায় সেই ক্ষমাপ্রার্থনাকে শর্তসাপেক্ষ বলে মনে করছেন তিনি।
অলমো মনে করেন, আয়ালা সরাসরি স্বীকার করতে পারতেন যে, ম্যাচ-পরবর্তী উত্তেজনায় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন এবং তাঁর আচরণ ভুল ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ ঘটনার আংশিক দায় অলমোর উপর চাপাতে চাইছেন। সেই কারণেই আয়ালাকে সত্যি বলার সাহস দেখানোর বার্তা দিয়েছেন স্পেনের তারকা ফুটবলার।
অলমোর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি শুধু আয়ালার আচরণে ক্ষুব্ধ নন; বরং ঘটনার পর দেওয়া ব্যাখ্যাতেও অসন্তুষ্ট। তাঁর অভিযোগ, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সত্যতা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটি। এই ম্যাচকে ঘিরে ফুটবলার, কোচ, সমর্থক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে প্রবল আবেগ কাজ করে। বছরের পর বছর পরিশ্রমের পর একটি দল বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছায়। সেখানে জয় বা পরাজয়ের প্রভাব শুধু মাঠের ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ম্যাচে ফুটবলারদের মানসিক চাপ সাধারণ ম্যাচের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি ফাউল কিংবা প্রতিপক্ষের একটি মন্তব্যও বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। মাঠে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও সাধারণত রেফারি এবং ম্যাচ কর্মকর্তারা তা নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু শেষ বাঁশির পর ফুটবলারদের আবেগ অনেক সময় আরও তীব্রভাবে প্রকাশ পায়।
স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফাইনালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। খেলা চলাকালীন একাধিক ফাউল, সিদ্ধান্ত এবং ফুটবলারদের মধ্যে কথার লড়াই হয়েছিল। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সেই জমে থাকা উত্তেজনা প্রকাশ্যে আসে। ফলেই রদ্রি-ওটামেন্ডির তর্ক, পারেদেস-গাভির ধাক্কাধাক্কি এবং আয়ালা-অলমোর সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটে।
তবে মানসিক চাপ বা ম্যাচের উত্তেজনা কোনও অবস্থাতেই শারীরিক আক্রমণকে সমর্থন করতে পারে না। বিশেষ করে কোচিং স্টাফের সদস্যদের কাছ থেকে সংযত আচরণ প্রত্যাশিত। তাঁদের দায়িত্ব শুধু কৌশল নির্ধারণ করা নয়; কঠিন মুহূর্তে ফুটবলারদের শান্ত করাও তাঁদের কর্তব্য।
এই কারণেই আয়ালার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ হিসেবে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করতে পারতেন। পরিবর্তে তিনি নিজেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ। তাঁর মতো অভিজ্ঞ একজন প্রাক্তন ফুটবলার এবং কোচের কাছ থেকে এমন আচরণ অনেকেই প্রত্যাশা করেননি।
রবার্তো আয়ালা আর্জেন্টিনার ফুটবলের অত্যন্ত পরিচিত নাম। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি দেশের হয়ে দীর্ঘদিন প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শক্তিশালী ডিফেন্ডার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর তিনি কোচিং এবং দল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দলের ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং ড্রেসিংরুমে তাঁর প্রভাব নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে ম্যাচ শেষে আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। কারণ তরুণ ফুটবলারদের সামনে কোচিং স্টাফের সদস্যদের আচরণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। তাঁরা যদি উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে মাঠের পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
আয়ালা ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে নিজের আচরণ ভুল ছিল বলে পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর ব্যাখ্যার মধ্যে অলমোর মন্তব্যের প্রসঙ্গ থাকায় বিতর্ক থামেনি। বরং অলমোর পাল্টা বক্তব্যের পর বিষয়টি আরও বড় হয়েছে।
দানি অলমো সাধারণত মাঠের বাইরে খুব বেশি বিতর্কিত মন্তব্য করেন না। স্পেনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স এবং ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিকতার জন্য তিনি পরিচিত। তাই আয়ালাকে উদ্দেশ করে তাঁর এমন কড়া মন্তব্য ফুটবলমহলের নজর কেড়েছে।
অলমো সরাসরি আয়ালাকে মিথ্যা বলার অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে কোনও রাখঢাক ছিল না। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আয়ালাকে এমন কোনও মন্তব্য তিনি করেননি, যা তাঁকে আক্রমণাত্মক আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
স্পেনের তারকা আরও বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলেই তিনি বিষয়টি মেনে নেবেন না। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করা এবং নিজের কাজের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়াই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আয়ালার বক্তব্যে সেই দায় স্বীকারের অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।