ট্রাম্প যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার কথা বললেও থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মতভেদ স্পষ্ট কম্বোডিয়া আলোচনা চাইছে কিন্তু থাইল্যান্ড তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী এবং নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে
তাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সীমান্ত এলাকায় যে উত্তেজনা বহুদিন ধরেই ধীরে ধীরে জমে উঠছিল তা এবার আবার নতুন করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি পাওয়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বৃদ্ধি এবং অতীতের সংঘর্ষের স্মৃতি আবার সামনে এসে দাঁড়ানো সব মিলিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলটি আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। কারণ দুই দেশের সংঘাত দ্বিতীয় দিনে পা দেওয়ার পর থেকেই জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আবারও মুখ খুলবেন এবং মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেবেন কিনা।
তৃতীয় দিনে উপস্থিত হয়ে ট্রাম্প সরাসরি নিজের মত প্রকাশ করেন। পেনসিলভেনিয়ার এক জনসভায় তিনি বলেন যে বিশ্বব্যাপী বহু সংঘাতে তিনি আগে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং যুদ্ধ থামাতে ভূমিকা রেখেছেন। ভারত পাকিস্তান সংঘাতের উদাহরণ তুলে ধরেন ইরান ইজরায়েলের পরিস্থিতির কথাও বলেন। এ সবের পর তিনি জানান যে তাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার তীব্র উত্তেজনা নিয়েও তিনি খুব শিগগিরই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন। তাঁর বক্তব্য ছিল এ রকম যে যদি তিনি কথা বলেন তবে হয়তো যুদ্ধ থেমেও যেতে পারে। স্বভাবতই তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
এখন প্রশ্ন হল দুই দেশ কি ট্রাম্পের মতো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে। ইতিহাস বলে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে বেশির ভাগ সময় বাইরের কারও ওপর নির্ভর করতে চায় না। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাকেও তাঁরা অস্বীকার করেন না। তাইল্যান্ডের বর্তমান বিদেশমন্ত্রী শিহাসাক ফুয়াংকেটকি এই প্রসঙ্গে তাঁর মত প্রকাশ করেন এবং তাঁর বক্তব্য ছিল যথেষ্ট কঠোর। তিনি বলেন যে নতুন করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেখানে কূটনীতির জায়গা নেই এবং সংঘর্ষবিরতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাঁর মতে আলোচনা চাপ দিয়ে করানো সম্ভব নয় এবং তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান বেরোনোও বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে কম্বোডিয়ার অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দেশটির পার্লামেন্ট সেনেটের প্রধান হুন সেন বলেন যে তাঁরা আলোচনায় বসার জন্য প্রস্তুত। যদিও তিনি একই সঙ্গে নিজেদের দেশের প্রতিরক্ষা শক্তির ওপর ভরসা রেখে বলেন যে যদি তাইল্যান্ড আগ্রাসন চালায় তবে তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াই চালাবেন। দুই দেশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই সংঘাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তাইল্যান্ডের জন্য এই মুহূর্তে সীমান্ত নিরাপত্তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দুই সৈন্য গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা দেশের ভেতরে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। এই ঘটনার পরে তাইল্যান্ড ঘোষণা করে যে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি চুক্তি তারা আপাতত স্থগিত রাখছে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু দুই দেশের সেনাবাহিনীতে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার। ইতিমধ্যেই দুই দেশের সীমান্তবর্তী গ্রামে হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। অগ্নিসংযোগ গোলাগুলি বিস্ফোরণের শব্দে রাত কাটানো মানুষের জীবন দ্রুত ভয়াবহ চেহারা নিয়ে নিয়েছে। বহু পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে দিন কাটাচ্ছে এবং তাদের খাদ্য বস্ত্র ও চিকিৎসার অবস্থাও খারাপ হয়ে উঠছে। এই মানবিক সংকটও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বড় প্রশ্ন। বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। তিনি নানা সময়ে দ্বিপাক্ষিক সংঘাত থামানোর চেষ্টা করেছেন তবে সব ক্ষেত্রেই সাফল্য আসেনি। তাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মতো দুই দেশের বিবাদে তিনি সরাসরি ফোন করে আলোচনা শুরু করানোর কথা বললেও তা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। কারণ দুই দেশের ইতিহাসই বলে যে জাতীয় গৌরব সার্বভৌম ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে তাঁরা কারও চাপ মেনে চলতে চান না। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব বিশাল তবে পরিস্থিতি জটিল।
তাইল্যান্ডের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্যে খুব স্পষ্ট যে তারা এখন কথাবার্তার চেয়ে শক্তি প্রদর্শনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে কম্বোডিয়া আগ্রাসন করছে এবং সেই আগ্রাসনের যথাযথ জবাব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে কম্বোডিয়া বলছে যে তারা আলোচনা চাইছে তবে প্রয়োজন হলে লড়াই করতেও পিছপা হবে না। দুই দেশের বক্তব্য একে অপরের বিপরীত। এই অবস্থায় ট্রাম্পের ফোন কল আদৌ কাজে লাগবে কি না তা সময়ই বলে দেবে।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন যে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ দুই দেশের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক মহলের শক্তিশালী দেশগুলো যদি এই উত্তেজনা নিয়ে বিশেষ নজর দিতে শুরু করে তবে দুই দেশকে আলোচনায় ফিরতেই হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখা কোনও দেশের পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্তব্ধ হয়ে যায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে উন্নয়ন থেমে যায় এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
সংঘাতের গভীরে গেলে দেখা যায় যে বহু বছর ধরে সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলে আসছে। ঐতিহাসিক নথি মানচিত্র সেনা ছাউনির অবস্থান এবং স্থানীয় জনমানুষের বক্তব্য মিলিয়ে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। কোনও একটি ঘটনার পরে হঠাৎ যুদ্ধ নেতিবাচক চেহারা নেয় না বরং বহু বছরের জমে থাকা অভিমান অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রবণতা একসাথে আগুনে ঘি ঢালে। এইবারও তাই হয়েছে।
সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দুই সৈন্য আহত হওয়ার ঘটনা তাইল্যান্ডের অভ্যন্তরে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এই ক্ষোভকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও বাড়ে এবং সরকারও কড়া অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কম্বোডিয়া তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দাবি করে যে তারা নিজেদের ভূমি রক্ষাই করছে। দুই দেশের বক্তব্য যতক্ষণ না এক প্ল্যাটফর্মে আনা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও আলোচনার সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়।
এই অবস্থায় ট্রাম্পের মন্তব্য বিশ্বের সামনে নতুন আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যদিও তাঁর বক্তব্য অনেক সময় অতিরঞ্জিত বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হয় তবুও এই মুহূর্তে তাঁর ফোন কৌশলগতভাবে কিছু প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ দুই দেশই জানে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের সামনে কোনও সংঘাত দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকতে পারে না। যদি আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায় তবে আলোচনার পথ খুলে যেতে পারে।
অন্যদিকে এই পরিস্থিতি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোকেও চিন্তায় ফেলেছে। কারণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। অনেক দেশই চায় না যে এই অঞ্চলটি আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত হয়ে উঠুক। তাঁদের মতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে এসে এই সংঘাত থামানোর চেষ্টা করা উচিত।
অবশ্য ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ একমাত্র সমাধান নয়। দুই দেশের প্রশাসনিক স্তরে আঞ্চলিক সংগঠনের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করা যেতে পারে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অতীতে বহু সংঘাত মেটানোর চেষ্টা করেছে এবং কিছুটা সফলও হয়েছে। সেই পথও খোলা আছে।
সব মিলিয়ে তাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সীমান্ত উত্তেজনা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রভাব এবং মানবিক মূল্যবোধের এক জটিল সম্মিলন। এখন দেখার বিষয় ট্রাম্পের ফোন সত্যিই কোনও পরিবর্তন আনতে পারে কি না বা দুই দেশ নিজেদের অবস্থান কিছুটা নরম করে আলোচনায় ফিরতে রাজি হয় কি না। কারণ যুদ্ধ কখনই কোনও সমাধান নয় এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিই একমাত্র পথ।