বিয়ের অনুষ্ঠানে সাদা শেরোয়ানি ও লাল পাগড়ি পরিহিত বরকে মাইক ধরে অতিথিদের অনুরোধ করতে শোনা যায়—নিজেদের সন্তানদের কাছে বসিয়ে রাখার জন্য
বিয়ের আসর মানেই উচ্ছ্বাস, আনন্দ, সানাইয়ের সুর, আলোর ঝলকানি, আত্মীয়পরিজনের ভিড়, আর তার মাঝখানে বর–কনের জীবন বদলে দেওয়া এক গুরত্বপূর্ণ পর্ব। এমন দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পুরোদমে আয়োজন করা হয় বিশেষ ফোটোশুটের। আধুনিক যুগের বিয়েতে পেশাদার আলোকচিত্রী, স্টেজের সাজসজ্জা, আলাদা থিম, বিশেষ আলো—সব মিলিয়ে ফোটোশুট এখন বিয়ের অনুষ্ঠানের অন্যতম অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, এই ফোটোশুটকে নিখুঁত রাখার জন্য বাড়তি মনোযোগ, বাড়তি ব্যয় এবং বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এত আয়োজনের মাঝেই কখনও কখনও ঘটে যায় এমন কিছু যার জন্য মুহূর্তে বদলে যায় আসরের আবহ। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিয়ো তেমনই এক ঘটনার সাক্ষী রাখল সামাজিক মাধ্যমে।
ঘটনাটি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের। সাজানো—গোছানো ফোটোশুটের ফ্রেম। বর ও কনেকে একটি মনোমুগ্ধকর সোফায় বসানো হয়েছে। চারিদিকে রঙিন আলো, ফুলের বৈচিত্র্যময় নকশা, সাজানো ব্যাকড্রপ, ক্যামেরার সামনে উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ, আর দেখলেই বোঝা যায় পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ দুটোই বেশ বড়সড়। সোফায় রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছেন বর ও কনে। বর পরেছেন সাদা শেরোয়ানি ও লাল পাগড়ি, যা তাঁর পরিপাটি সাজকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কনের সাজেও আছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সূক্ষ্ম মেলবন্ধন। তাঁদের সামনে চলছে রীতিমতো ব্যয়বহুল ফোটোশুট। কোথাও যেন প্রকাশ পাচ্ছে জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম মুহূর্তগুলোকে সুন্দরভাবে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু এমন শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে আচমকাই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ঠিক যখন ক্যামেরার লেন্স ফ্রেমটি ধরতে উদ্যত, ঠিক সেই মুহূর্তে এক বালক ছুটে আসে মঞ্চের সামনে। ছোট্ট ওই বালকের উদ্দেশ্য হয়তো ছিল কৌতূহলবশত সামনে গিয়ে দেখা, অথবা হয়তো শুধু আনন্দে দৌড়ে বেড়ানো—শিশুর স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু তার ওই ছুটে এসে ফ্রেমে ঢুকে পড়া মুহূর্তেই বাধা তৈরি করে নির্দিষ্ট ফোটোশুটে। দেখা যায় লেন্সে ধরা পড়ছে বালকের ছায়া, বর–কনের সযত্নে তৈরি বসার ভঙ্গি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, এবং এই বিঘ্নেই যেন বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে যান বর।
এরই মাঝে ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োর প্রথম অংশে দেখা যায় বিয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বর হাতে মাইক নিয়ে অতিথিদের উদ্দেশে কিছু বলছেন। তাঁর কণ্ঠে খানিক তীক্ষ্ণতা, খানিক অসহিষ্ণুতা। তিনি অনুরোধ করছেন—অথবা বলা যায় নির্দেশ দিচ্ছেন—যেন অতিথিরা তাঁদের সন্তানদের নিজেদের কাছে বসিয়ে রাখেন। তাঁর বক্তব্য, “দয়া করে আপনারা বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ছবি তোলার অনুষ্ঠান নষ্ট করবেন না। এর জন্য অনেক টাকা খরচ করা হয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে ফোটোশুটকে নিখুঁত রাখার ইচ্ছে কতটা প্রবল ছিল তাঁর মধ্যে। সাজানো ফ্রেমে কোনও বিঘ্ন ঘটুক, তা তিনি একেবারেই পছন্দ করেননি।
মাইক হাতে বর যে বক্তব্য রাখলেন—তা আবার বিয়ের সাধারণ আনন্দময় আবহের সঙ্গে তেমন মিল খায়নি। অতিথিদের মধ্যে অনেকেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। অনেকের চোখেই ধরা পড়ে বিরক্তি। বিয়ের মতো বিশেষ দিনে, যেখানে প্রত্যেকে একটু আনন্দের খোঁজে আসেন, সেখানে এমন কঠোর নির্দেশ অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হয়। তবে এখানেই শেষ নয়।
ভিডিয়োর পরবর্তী দৃশ্যে দেখা যায় সোফায় বসে বর–কনের ওপর নোট বর্ষণ করা হচ্ছে। ক্যামেরা তৈরি, লাইট–ক্যামেরা–অ্যাকশন—যেন নিখুঁত একটি সিনেমাটিক শট ধারণ করার প্রস্তুতি। ঠিক তখনই ছুটে আসে সেই কিশোর। এবং মুহূর্তের মধ্যেই বর ক্ষেপে ওঠেন। কোনও কথা না বলেই বর বালকটির মাথায় চড় মারেন এবং তাকে সরে যেতে বলেন। বর–কনের পিছনে দাঁড়ানো অতিথিরা এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান। কেউ কেউ অবাক হয়ে চারদিক তাকান, অনেকে নীরবে পরিস্থিতি দেখেন, কেউ আবার মুচকি হেসে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কারও চেহারায় যে অস্বস্তি, তা স্পষ্ট।
এই চড় মারার দৃশ্যই ভিডিয়োটিকে ভাইরাল হওয়ার প্রধান কারণ। বিয়ের মঞ্চে অতিথিদের সন্তানের উপর এমন আচরণ অনেকের কাছেই অসংগত, অসম্মানজনক এবং আক্রমণাত্মক বলে মনে হয়েছে। বালকটি মুহূর্তেই ভীত হয়ে পড়ে। তার মুখে দেখা যায় হতবাক চাহনি। ছোট্ট শিশুর জন্য এমন পরিস্থিতি যে মানসিকভাবে আঘাত হানতে পারে, তা বলাই যায়।
ঘটনার পর, বালককে সরিয়ে দেওয়ার পরেই বর আবার অতিথিদের উদ্দেশে বলেন—অনুগ্রহ করে আপনারা সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রাখুন; ব্যয়বহুল ফোটোশুট নষ্ট করবেন না। তাঁর কথাতেই স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে এই ফোটোশুটে তিনি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে অতিথিদের অনেকেই মনে করেন, বিয়ের আনন্দোৎসবে অতিরিক্ত শৃঙ্খলার চেষ্টা আসলে মনোরম পরিবেশ নষ্ট করে দেয়।
এই ভিডিয়োটি ‘মিমেক্রিকার’ নামে একটি এক্স হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করা হয়। সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ে ইনস্টাগ্রাম এবং পরে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম জুড়ে। ভিডিয়োটি মুহূর্তে নজর কাড়ে নেটপাড়ার। ইতিমধ্যেই ভিডিয়োটি প্রায় তিন লক্ষ বার দেখা হয়েছে, লাইক, কমেন্টের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, “এটা বিয়ের অনুষ্ঠান নাকি কোনও সামরিক শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ শিবির?” অন্য কেউ লিখেছেন, “মানুষ যদি অতিথিদের সম্মান করতে না পারে, তবে তাদের আমন্ত্রণ জানানোই উচিত নয়!”
এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, “বিয়ের আনন্দ হচ্ছে সবার—শুধু বর–কনের নয়। বাচ্চারা তো স্বাভাবিক ভাবেই একটু দৌড়োবে, হাসবে–খেলবে। তাতে এত রাগ কেন?” আর এক জন লিখেছেন, “যদিও অতিথিদেরও বোঝা উচিত ছিল এটি ব্যয়বহুল ফোটোশুট। কিন্তু শিশুকে মারার অধিকার কারও নেই।”
বেশ কিছু মন্তব্যে দেখা যায় মানুষ প্রশ্ন তুলছেন বরের আচরণ নিয়ে। কেউ লিখেছেন, “এই ধরনের আচরণ খুবই সংবেদনশীলতার অভাব প্রকাশ করে।” কেউ বলেছেন, “বিয়ের দিন এমন রূঢ় আচরণ মানায় না।” অনেকেই মনে করছেন শিশুকে চড় মারা কোনও অবস্থাতেই ন্যায়সঙ্গত নয়। বিশেষত জনসমক্ষে, বিশেষত যখন ওই শিশুটি বর–কনের কোনও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও নাও হতে পারে।
এদিকে কিছু মানুষ আবার বরকে সমর্থনও করেছেন। তাঁদের মতে, বিয়ের ফোটোশুটে এত অর্থ ব্যয় করা হয় যে এমন বিঘ্ন ঘটায় স্বাভাবিক ভাবেই বিরক্তি আসতে পারে। কারও মতে, “শিশুর অভিভাবকদেরই উচিত ছিল তাকে কাছে রাখা। বিয়ের ফটোশুট কোনও খেলার জায়গা নয়।”
তবে সমালোচকদের যুক্তি—বিরক্তি প্রকাশ করা যায়, কিন্তু শারীরিক আঘাত নয়। শিশুর প্রতি এমন কঠোরতা প্রকাশ্য স্থানে দেখালে তার মানসিক আঘাতের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এই ঘটনা ঘিরে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে—বিয়ের অনুষ্ঠানে ফোটোশুটের গুরুত্ব কতটা হওয়া উচিত? শোভনতা ও শালীনতার সীমা কোথায়? কিছু মানুষের মতে, আজকাল ফোটোশুটকে ঘিরে এত বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে আসল আনন্দটাই হারিয়ে যায়। বিয়ে মানে শুধুই নিখুঁত ছবি নয়—এমনটাই মনে করেন অনেকে।
ভিডিয়োটির সত্যতা অবশ্য কোনও সাংবাদিক সংস্থা এখনো যাচাই করেনি। ভিডিয়োটি কোথায়, কোন দেশে, কোন পরিবারের বিয়ে—এসবই অজানা। তবে ঘটনা যাই হোক, এটি যে মানুষের অনুভূতিতে নাড়া দিয়েছে এবং বরের আচরণ নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিয়ো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এক দিকে আক্রমণ, সমালোচনা, নিন্দা; অন্য দিকে কিছু মানুষের সমর্থন—মতবিরোধের মাঝেই ভিডিয়োটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। শিশুদের প্রতি আচরণ, বিয়ের শৃঙ্খলা, অতিথিদের দায়িত্ব—এসবই নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাই হোক, এই বিয়ের ভিডিয়ো আবারও দেখিয়ে দিল—সামাজিক মাধ্যমে কোনও ঘটনা ভাইরাল হতে সময় লাগে না, আর এর জেরে মানুষের প্রতিক্রিয়ার ঢেউও পৌঁছে যায় দূর–দূরান্তে। এই ঘটনার পর থেকেই নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা—একদিকে বরের আচরণকে কঠোর, কর্তৃত্বপরায়ণ ও অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন অনেকে, অন্যদিকে কয়েকজন আবার শিশুর অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতার দিকেও আঙুল তুলছেন। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে, তা হল বিয়ের অনুষ্ঠানে বাড়তি প্রটোকল ও নিখুঁত শটের নামে স্বাভাবিকতার যে ক্ষয় হচ্ছে, তা মোটেই কাম্য নয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—মানবিকতা ও সংবেদনশীলতার জায়গা কি ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে এমন বিলাসবহুল আড়ম্বরের পিছনে? দিনের শেষে, বিয়ে তো আনন্দ, হাসি আর উদযাপনের জায়গা—নিয়ন্ত্রণ আর রাগের মঞ্চ নয়।