Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মৃত্যুমুখ থেকে অলৌকিক উদ্ধার—২৮ ঘণ্টা খালে আটকে থাকা হাতিকে ছুটে এসে বাঁচাল বনদল

গত রবিবার জল খেতে এসে মাত্র ১০-১২ বছর বয়সি একটি হাতি হঠাৎই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে থাকা প্রায় ৬০ ফুট গভীর একটি খালে পড়ে যায়। খালের দেয়াল ছিল এতটাই খাড়া যে বহু চেষ্টা করেও ওপরের দিকে উঠতে পারেনি সে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পথ খুঁজে বেরোনোর চেষ্টা করলেও কোনো ফল হয়নি। ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়তে থাকে অসহায় হাতিটি।

কর্নাটকের বিস্তীর্ণ জঙ্গলাঞ্চল প্রতিদিনই সাক্ষী থাকে নানান অঘটন–সঘটনের। কখনও প্রকৃতির খামখেয়াল, কখনও মানুষের অবিবেচনার ফল—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই বিপন্ন হয়ে পড়ে অসংখ্য বন্যপ্রাণ। তবে সম্প্রতি শিবানসমুদ্র এলাকায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনাই প্রমাণ করে দিয়েছে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও মানবিকতা এখনও অনেক জীবনের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন হৃদয়স্পর্শী উদ্ধার অভিযান যে সিনেমার রোমাঞ্চকেও হার মানাতে পারে, তা বিশ্বাস করা কঠিন—তবু ঘটেছে ঠিক তাই।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাত্র ১০–১২ বছর বয়সি একটি হাতি। জল খেতে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬০ ফুট গভীর একটি খালে পড়ে যায় সে। খালের খাড়া কংক্রিটের দেওয়াল, তীব্র জলস্রোত এবং অন্ধকার গভীরতার মধ্যে আটকে গিয়ে প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করছিল ছোট্ট গজরাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটে, ধাক্কা খেয়ে, শুঁড় দিয়ে দেয়ালে ওঠার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ধীরে ধীরে ক্লান্তি তাকে গ্রাস করতে থাকে। অবশেষে স্থানীয় মানুষের নজরে আসে ঘটনাটি। মুহূর্তে খবর পৌঁছয় বনদফতরের কাছে।

এরপর শুরু হয় আসল নাটকীয়তা। প্রায় শতাধিক বনকর্মী উপস্থিত হন উদ্ধার অভিযানে। ভেটেরিনারি টিম হাতিটিকে শান্ত করার জন্য হালকা সেডেটিভ দেন। তারপর বিশাল ক্রেন নামিয়ে খালের মধ্যে একটি লোহার জালের প্ল্যাটফর্ম নামানো হয়। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন বনকর্মী জলে নেমে হাতটিকে দড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে তুলতে সাহায্য করেন। ঘণ্টাব্যাপী সমন্বিত প্রচেষ্টার পর ধীরে ধীরে ওপরে তোলা হয় হাতিটিকে।

শেষ পর্যন্ত সফলভাবেই তাকে খাল থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে প্রশংসার ঢল নামে। মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন—বনকর্মীদের সাহস, তৎপরতা এবং মানবিকতাই হাতিটির বাঁচার মূল কারণ।

ঘটনাটি শুরু হয় গত রবিবার ভোরবেলা। ১০–১২ বছরের একটি কিশোর হাতি, যাকে স্থানীয় গ্রামবাসীরা প্রায়ই আশেপাশের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেখতেন, সেদিন তীব্র তৃষ্ণা মেটাতে জল খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে যায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের খালে। খালটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর গভীরতা ছিল প্রায় ৬০ ফুট—যা যে কোনও প্রাণীর পক্ষে বিপজ্জনক। খালের জলে প্রবল স্রোত, আর তার দু’পাশে কংক্রিটের তৈরি খাড়া দেয়াল। সামান্য পা পিছলে গেলেই প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা।

দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক এমনটাই ঘটে সেই কচি হাতিটির সঙ্গে। খালের পাশে নেমে জল খাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়েই এক মুহূর্তে দাঁড়ানোর ভর হারায় সে, আর সজোরে পিছলে নেমে যায় গভীর খালে। মুহূর্তের মধ্যে সে জলে তলিয়ে গিয়ে ভেসে ওঠে আবার। প্রথম দিকে প্রাণপণে সাঁতরে খালের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে চাইলেও, কংক্রিটের মসৃণ দেয়ালে বারবার পিছলে যাচ্ছিল। জলস্রোতের ধাক্কায় তাকে কখনও ডানে, কখনও বাঁ দিকে ছুড়ে দিচ্ছিল স্রোত। হাতিটি সব শক্তি দিয়ে লড়াই করছিল, কিন্তু এভাবে কতক্ষণ আর লড়া যায়?

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে থাকে। স্থানীয় মানুষ দূর থেকে টের পান খালে কিছু একটা অস্বাভাবিক নড়াচড়া হচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখেই আঁতকে ওঠেন—একটি হাতি ধাক্কাধাক্কি করে বাঁচার জন্য লড়াই করছে। সঙ্গে সঙ্গেই খবর দেওয়া হয় বনদফতরকে। বনকর্মীদের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি দেখে হতবাক—এত গভীর খাল, তীব্র স্রোত, আর মাঝখানে অসহায়ভাবে আটকে থাকা একটি হাতি। সাধারণ কোনও পদ্ধতিতে তাকে তোলা সম্ভব নয়। যদি ভুলভাবে টানা হয়, হাতিটির হাড় ভেঙে যেতে পারে বা গুরুতর আঘাত লাগতে পারে।

এর মধ্যেই সময় গড়িয়ে যায়। হাতিটি প্রায় ২৮ ঘণ্টা ধরে সেই খালের মধ্যে আটকে থাকে। প্রথমে যে তেজে লড়াই করছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসে। ক্লান্তিতে জলের ওপর মাথা তুলেই রাখতে পারছিল না। চক্ষুসন্ধানী চোখে কেবল বাঁচবার আর্তি। তার শুঁড়ে ভর দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা আরও কয়েকবার করেছিল, কিন্তু প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে তাকে আরও ক্লান্ত করে তুলছিল।

এই অবস্থায় বনকর্মীরা সিদ্ধান্ত নেন—এবার আর অপেক্ষা করা যাবে না। দ্রুত, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে হবে। দফতরের এক্স হ্যান্ডলে ভিডিও পোস্ট করে বন দফতরের আধিকারিক প্রবীণ কাসওয়ান পরে লিখেছেন—“যা ঘটেছিল, তা কোনো সিনেমার রোমাঞ্চের থেকেও কম কিছু নয়।” সত্যিই, মুহূর্তগুলো ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা।

প্রথমেই বনকর্মীরা ডাকেন ভেটেরিনারি টিমকে। তারা হাতিটিকে শান্ত করতে এবং তার শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হালকা ডোজের একটি সেডেটিভ ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করেন। এতে হাতিটি অতিরিক্ত লাফালাফি বা আতঙ্ক দেখায়নি—যা উদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। তবে ওষুধের মাত্রা এমন ছিল, যাতে সে সম্পূর্ণ অচেতন না হয়ে যায়—কারণ পানিজলে অচেতন হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

news image
আরও খবর

এরপর শুরু হয় অভিযানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—কীভাবে হাতিটিকে উপরে তোলা হবে? প্রথমে ভাবা হয়েছিল দড়ি দিয়ে টেনে তোলা হবে। কিন্তু বিশাল দেহবিশিষ্ট এই প্রাণীকে ঝুলিয়ে তোলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ভুল টেনে দিলে সে আঘাত পেতে পারত, এমনকি অভ্যন্তরীণ চোটও লাগতে পারত। তাই ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ইস্পাতের তৈরি বড় লোহার জালের প্ল্যাটফর্ম, যা সাধারণত ভারী মালামাল ওঠাতে ব্যবহৃত হয়।

একটি বিশাল ক্রেন এনে প্ল্যাটফর্মটি ধীরে ধীরে খালের ভেতরে নামানো হয়। কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্মে হাতিটিকে উঠানোই ছিল চ্যালেঞ্জ। কয়েকজন বনরক্ষী—যাঁরা প্রতিনিয়ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করেন—নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে খালের জলে নেমে পড়েন। ৬০ ফুট নিচে গভীর অন্ধকার জলে নেমে বিশাল একটি হাতির পাশে পৌঁছনো মোটেই সহজ কাজ নয়। জলের তীব্র স্রোত, কাদা, অস্বচ্ছ দৃশ্যমানতা—সব মিলিয়ে কাজটি হয়ে ওঠে কঠিনতম।

বনকর্মীরা প্রথমে শক্ত মোটা দড়ি দিয়ে হাতিটির শরীরের নিচের অংশ ঘিরে বাঁধতে শুরু করেন। হাতিটি তখন অর্ধেক ক্লান্ত, অর্ধেক আতঙ্কিত হলেও বনরক্ষীদের উপস্থিতি এবং মৃদু স্পর্শে ধীরে ধীরে স্থির হয়। দড়ির সাপোর্ট পেয়ে তাকে সাবধানে প্ল্যাটফর্মের ওপর ঠেলে দেওয়া হয়। কয়েকজন বনরক্ষী জালে দাঁড়িয়ে হাতিটিকে ধীরে ধীরে সেফ জোনে স্থাপন করতে থাকেন।

উদ্ধার অভিযান চলে আরও কয়েক ঘণ্টা। নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন ছিল প্রতিটি পদক্ষেপে—উপরে থাকা ক্রেনচালক থেকে শুরু করে নীচে জলে থাকা দলের সদস্য—সবাইকে মুহূর্তে মুহূর্তে নজর রাখতে হচ্ছিল।

অবশেষে যখন হাতিটি সম্পূর্ণভাবে প্ল্যাটফর্মে সুরক্ষিতভাবে স্থাপিত হয়, তখন ক্রেন ধীরে ধীরে ওপরে তুলতে থাকে তাকে। ৬০ ফুট গভীর খাল থেকে একটি বিশাল হাতি ওপরে উঠছে—দৃশ্যটি এতটাই নাটকীয় ছিল যে উপস্থিতরা আপ্লুত হয়ে পড়েন।

মাটির ওপরে আসার পরই হাতিটিকে একটি বড় ট্রাকের ওপর তোলা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বনদফতরের নিরাপদ অভয়ারণ্যে, যেখানে চিকিৎসা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, সে গুরুতর বিপদ থেকে রক্ষা পেলেও তার শরীর ক্লান্ত ছিল এবং কিছু চোট পেয়েছে। কয়েকদিন সঠিক যত্ন নিলেই সুস্থ হয়ে উঠবে।

যখন বনদফতর উদ্ধার অভিযানের ভিডিওটি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করে, মুহূর্তে তা ভাইরাল হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ লাইক, রিটুইট এবং মন্তব্য করে বনকর্মীদের এই সাহসিকতা ও মানবিকতাকে স্যালুট জানান। বহু নেটাগরিক লিখেছেন—“মানুষ যখন চায়, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক প্রাণী হতে পারে।” কেউ লিখেছেন—“প্রকৃত নায়করা এমনই—শব্দের আড়ালে নয়, কাজের মধ্যে তাদের মহত্ব।”

অনেকেই আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন—জঙ্গলের এলাকা দখল করে মানুষের তৈরি এই ধরনের বিপজ্জনক স্থাপনা বন্যপ্রাণীদের বারবার বিপদের মুখে ফেলছে। যদি আগেভাগে সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো—যেমন খালের চারপাশে নিরাপত্তা বেড়া বা বাধা—তবে হয়তো এমন দুর্ঘটনা ঘটত না।

দিনের শেষে যে সত্যিটি সবচেয়ে বড়ো সান্ত্বনা দেয়, তা হল—একটি নিরীহ বন্যপ্রাণীর জীবন মানবিকতার শক্তিতেই রক্ষা পেল। শিবানসমুদ্রের সেই গভীর খাল থেকে হাতিটিকে টেনে তোলা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র শতাধিক বনকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রম, নির্ভীক সাহস এবং অটল দৃঢ়তার কারণে। তারা নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে যে সমন্বয়, ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনন্য। তাঁদের তৎপরতায় শুধু একটি জীবনই বাঁচেনি, বরং আরও একবার প্রমাণ মিলেছে—মানুষ চাইলে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় রক্ষক হতে পারে।

Preview image