এই হালকা শীতের দুপুরের ওড়িশার তরকারিতে বাদাম ও মুলোর পাশাপাশি আরও অনেক স্বাস্থ্যকর উপাদান মিশেছে। ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলে এটি শুধু পেট ভরাবে না শরীরকেও সুস্থ ও তেজস্বী রাখতে সাহায্য করবে। সহজ উপায়ে তৈরি হওয়া এই তরকারি সুস্বাদু পুষ্টিকর এবং হালকা হওয়ায় শীতের দুপুরে আরামদায়ক একটি খাবারের অভিজ্ঞতা দেবে।
শীত ধীরে ধীরে কমছে, আর সঙ্গে আসছে ঋতুবদলের নানা চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এই সময়ে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করার জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও তখন পরিবর্তন আসে। গরম, তাজা এবং মৌসুমী সব্জি বাজারে আসতে শুরু করে, যা শরীরকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখে।
এই মৌসুমের অন্যতম স্বাস্থ্যকর সব্জি হল মুলো এবং তার শাক। মুলোতে আছে প্রচুর ভিটামিন সি, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মুলোশাকেও রয়েছে ভিটামিন এ, কে, এবং মিনারেলস, যা হাড় ও চামড়ার জন্য উপকারী। বাংলায় মুলো এবং মুলোশাকের নানা রকম রান্না প্রচলিত আছে, কিন্তু ওড়িশার ‘বাদাম দিয়া মুলা’ তার স্বাদের দিক থেকে ভিন্ন এবং একেবারে অনন্য।
এই রান্নার নাম বাংলায় করলে দাঁড়ায় ‘বাদাম দিয়ে মুলো’। তবে শুধু বাদাম আর মুলো নয়, এতে রয়েছে আরও অনেক উপাদান, যেমন আলু, বেগুন, কুমড়ো, টম্যাটো, রসুন এবং লঙ্কা। এগুলো একত্রে মিলে তৈরি করে একটি সুস্বাদু, স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর তরকারি। হালকা শীতের দুপুরে ভাতের সঙ্গে এটি পরিবেশন করলে পেটকে তৃপ্ত রাখার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকেও সুস্থ ও শক্তিশালী রাখে।
উপকরণের বিস্তারিত বিবরণ ও তাদের গুরুত্ব
মাঝারি আলু – আলুতে থাকে কার্বোহাইড্রেট এবং ভিটামিন বি৬। এটি শরীরকে শক্তি দেয় এবং ভাতের সঙ্গে মিলিয়ে খেলে খাবার সহজে হজম হয়।
ছোট বেগুন – বেগুনে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবার আছে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
মাঝারি মুলো – মুলো হল প্রোটিন ও ভিটামিন সি’র উৎস। এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে।
মুলোশাক – ভিটামিন এ, কে এবং ফাইবার সমৃদ্ধ। এটি দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে এবং হাড়কে শক্তিশালী করে।
কুমড়ো – ভিটামিন এ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এটি ত্বক ও চামড়ার জন্য উপকারী।
ভাজা চিনাবাদাম – প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস। এটি খাবারে ক্রাঞ্চি স্বাদ এবং পুষ্টিগুণ যোগ করে।
রসুন – অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিভাইরাল উপাদান সমৃদ্ধ। এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
শুকনো লঙ্কা ও কাঁচা লঙ্কা – খাবারে স্বাদ ও তাপ যোগ করে। এছাড়াও রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।
সর্ষের তেল এবং সর্ষের দানা – হজমে সহায়ক এবং খাবারে সুগন্ধ যোগ করে।
মাঝারি টম্যাটো – ভিটামিন সি এবং লাইকোপিন সমৃদ্ধ। এটি স্বাদের সঙ্গে খাবারে রঙ ও পুষ্টি যোগ করে।
নুন – স্বাদ অনুযায়ী।
এই উপকরণগুলো একত্রিত হলে তৈরি হয় একটি সুস্বাদু, সুগন্ধী, এবং স্বাস্থ্যকর তরকারি।
প্রণালী
প্রথমে আলু, বেগুন, মুলো, কুমড়ো এবং টম্যাটো ভালোভাবে ধুয়ে সমান মাপে কেটে নিন। এরপর একটি পাত্রে সামান্য জল দিয়ে আঁচে বসান এবং এতে সবজি ও কুচনো মুলোশাক দিয়ে ফুটতে দিন। সবজি ও শাক নরম হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রেখে দিন।
একটি মিক্সিতে চিনাবাদাম, রসুন, শুকনো লঙ্কা এবং কাঁচা লঙ্কা বেটে নিন। প্রয়োজনে অল্প জল দিন যাতে মসলা ভালোভাবে ব্লেন্ড হয়।
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করুন। তেল হালকা ধোঁয়া ওঠা শুরু করলে সর্ষের দানা এবং শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বের হলে বাটা মসলা ঢেলে কম আঁচে ৩–৪ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। এরপর নুন ও টম্যাটো দিয়ে দিন এবং টম্যাটো নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
শেষে ভাপানো সবজি এবং শাক ঢেলে অল্প জল দিয়ে ২–৩ মিনিট রান্না করুন এবং আঁচ বন্ধ করুন।
স্বাস্থ্যগুণ
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি – মুলো এবং মুলোশাকের ভিটামিন সি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
হজমে সহায়ক – রসুন, সর্ষের তেল এবং সবজি হজম প্রক্রিয়া সহজ করে।
ত্বক ও চুলের যত্ন – কুমড়ো ও টম্যাটোতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে সুস্থ রাখে।
হাড় ও দৃষ্টিশক্তি – মুলোশাকের ভিটামিন কে হাড় শক্ত রাখে, ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক – ফাইবার সমৃদ্ধ এই তরকারি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।
রান্নার টিপস
সবজি সমান মাপে কেটে নিলে রান্না একসাথে হয়।
মসলার সঙ্গে অল্প জল দেওয়া উচিত, যাতে খাবারের স্বাদ বেশি ক্ষয় না হয়।
ফ্রেশ মুলোশাক ব্যবহার করলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বাড়ে।
ভাজা বাদাম আগে ব্লেন্ড করলে তরকারিতে ক্রাঞ্চি টেক্সচার আসে।
হালকা শীতে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলে এটি আরও স্বাদ বৃদ্ধি পায়। রান্নার প্রণালী
আলু, বেগুন, মুলো, কুমড়ো এবং টম্যাটো ভালোভাবে ধুয়ে সমান মাপে কেটে নিন।
একটি পাত্রে সামান্য জল দিয়ে আঁচে বসান। এতে আলু, বেগুন, মুলো, কুমড়ো এবং কুচনো মুলোশাক দিয়ে ফুটতে দিন। সবজি ও শাক নরম হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রাখুন।
মিক্সিতে চিনাবাদাম, রসুন, শুকনো লঙ্কা এবং কাঁচা লঙ্কা ব্লেন্ড করুন। প্রয়োজনে অল্প জল ব্যবহার করতে পারেন।
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করুন। হালকা ধোঁয়া উঠা শুরু করলে সর্ষের দানা এবং শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বের হলে বাটা মসলা ঢেলে ৩–৪ মিনিট নাড়াচাড়া করুন।
নুন এবং টম্যাটো দিয়ে দিন। টম্যাটো নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
শেষে ভাপানো সবজি এবং শাক ঢেলে অল্প জল দিয়ে ২–৩ মিনিট রান্না করুন। আঁচ বন্ধ করুন এবং পরিবেশন করুন।
পরিবেশন ও সংরক্ষণ
তরকারি তৈরি হলে তা সঙ্গে সঙ্গে ভাত বা চিঁড়ের সঙ্গে পরিবেশন করা সবচেয়ে ভালো।
অল্প জল দিয়ে ফ্রাই করলে এটি হালকা হয় এবং স্বাস্থ্যকর থাকে।
অবশিষ্ট তরকারি ফ্রিজে রাখলে ১–২ দিন ভেতর ব্যবহার করা উচিত।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি
ওড়িশার রান্না সাধারণত সুগন্ধী, হালকা, কিন্তু পুষ্টিকর হয়। এই “বাদাম দিয়া মুলা” রান্নায় ওড়িশার ঐতিহ্য এবং মৌসুমী সবজির ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বাংলায় মুলো ও মুলোশাকের জনপ্রিয়তা থাকলেও, ওড়িশার রান্না স্বাদে ভিন্নতা এবং মসলার ব্যবহার ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
সবজি সমান মাপে কেটে নিলে রান্না একসাথে হয়।
মসলার সঙ্গে অল্প জল দেওয়া উচিত, যাতে খাবারের স্বাদ বজায় থাকে।
ফ্রেশ মুলোশাক ব্যবহার করলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পায়।
ভাজা বাদাম আগে ব্লেন্ড করলে তরকারিতে ক্রাঞ্চি টেক্সচার আসে।
হালকা শীতে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলে স্বাদ আরও বৃদ্ধি পায়।
শীতের দুপুরে খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করলে এটি শরীরকে উষ্ণ রাখে।
প্রায়শই শাক-সবজি হালকা ভাপে রান্না করা হয় যাতে পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে।
বাদাম, রসুন এবং সর্ষার তেল সংযোজন এই তরকারিকে স্বাদে সমৃদ্ধ করে
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: মুলো এবং মুলোশাকের ভিটামিন সি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
হজমে সহায়ক: রসুন, সর্ষের তেল এবং সবজি হজম সহজ করে।
ত্বক ও চুলের যত্ন: কুমড়ো ও টম্যাটোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চামড়া ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।
হাড় ও চোখের স্বাস্থ্য: মুলোশাকের ভিটামিন কে হাড় শক্ত রাখে, ভিটামিন এ চোখের স্বাস্থ্য উন্নত করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: ফাইবার সমৃদ্ধ তরকারি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।
শক্তি যোগায়: আলু ও বাদাম শরীরকে শক্তি যোগায়। উপসংহার
শীতের হালকা দুপুরে বাদাম দিয়ে মুলো তরকারি শুধুই খাবার নয়; এটি একটি স্বাস্থ্যকর অভিজ্ঞতা। সহজ উপকরণ, স্বাস্থ্যকর প্রণালী, সুগন্ধি স্বাদ—all মিলিয়ে এটি একটি রেসিপি যা বারবার খেতে ইচ্ছে করবে।