বিরিয়ানি খাওয়ার আগে অনেকের মনেই ভয় ওজন আর কোলেস্টেরল বাড়বে না তো? তবে চিকিৎসক পালানিপ্পান মানিক্কাম জানাচ্ছেন, কিছু সহজ নিয়ম মেনে বিরিয়ানি খেলে শরীরের ক্ষতি হয় না। সঠিক পরিমাণ, সময় ও খাবারের সঙ্গে ব্যালান্স রাখলে বিরিয়ানি উপভোগ করেও সুস্থ থাকা সম্ভব।
মটন বিরিয়ানি খেয়েও সুস্থ থাকা সম্ভব? চিকিৎসকের পরামর্শে জানুন সঠিক নিয়ম
চলছে উৎসবের মরসুম। বছরের এই সময়টা এলেই বাঙালির জীবনে যেন খাওয়াদাওয়ার আলাদা রং লাগে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, দীপাবলি, নববর্ষ কিংবা বড়দিন—যে উৎসবই হোক না কেন, বাঙালির কাছে তার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল জমিয়ে ভূরিভোজ। বন্ধু পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে পাত পেড়ে খাওয়ার আনন্দ ছাড়া উৎসব যেন পূর্ণতা পায় না। ঘরে তৈরি নানা পদের পাশাপাশি বাইরে থেকে অর্ডার করা খাবারও আজ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। চাইনিজ়, কোরিয়ান কিংবা কন্টিনেন্টাল খাবার যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, বাঙালির উৎসবের টেবিলে বিরিয়ানির জায়গা বরাবরের মতোই অটুট।
অনেকের কাছেই উৎসব মানেই বিরিয়ানি। বিশেষ করে মটন বিরিয়ানি—এই নামটা শুনলেই যেন জিভে জল চলে আসে। সুগন্ধি বাসমতী চালের ঝরঝরে ভাত, নরম খাসির মাংস, মশলার ভারসাম্যপূর্ণ ঝাঁজ আর ঘিয়ে ভেজানো সুবাস—সব মিলিয়ে মটন বিরিয়ানি শুধুই একটি খাবার নয়, বরং বাঙালির আবেগ। জন্মদিন থেকে শুরু করে বিয়ে, উৎসব কিংবা বিশেষ কোনও সেলিব্রেশন—সব ক্ষেত্রেই মটন বিরিয়ানি যেন এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। তবে এই রাজকীয় ভোজের আনন্দের মাঝেই অনেকের মাথায় ভিড় করে নানা চিন্তা।
ধোঁয়া ওঠা গরম বিরিয়ানির প্লেট সামনে রেখে অনেকেই মনে মনে প্রশ্ন করেন—ওজন বেড়ে যাবে না তো? কোলেস্টেরল বাড়বে না তো? ডায়াবিটিস থাকলে বিপদ হবে না তো? এত তেল-মশলা খেলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে না তো? এই প্রশ্নগুলো আজকের দিনে খুবই স্বাভাবিক। কারণ আধুনিক জীবনে এক দিকে যেমন উৎসবের আনন্দ আছে, তেমনই আছে জীবনযাত্রা সংক্রান্ত নানা রোগের ভয়। ফলে পছন্দের খাবার খাওয়ার আগে দ্বিধা তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সত্যিই কি বিরিয়ানি মানেই অসুস্থতা? গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট চিকিৎসক পালানিপ্পান মানিক্কামের মতে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি বলছেন, সঠিক নিয়ম মেনে, পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে বিরিয়ানি খেলে তা শরীরের শত্রু হয়ে ওঠে না। বরং সচেতনভাবে খেতে পারলে উৎসবের আনন্দও বজায় থাকে, আবার শরীরও সুস্থ থাকে।
মটন বিরিয়ানি নিয়ে ভয় কেন তৈরি হয়, তা বুঝতে গেলে আগে জানতে হবে এর পুষ্টিগুণ এবং গঠন সম্পর্কে। খাসির মাংস উচ্চমানের প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এতে আয়রন, জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি১২-এর মতো উপাদান রয়েছে, যা শরীরের রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। যাঁরা শারীরিক পরিশ্রম করেন বা যাঁদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি, তাঁদের জন্য খাসির মাংস উপকারী হতে পারে। তবে এর সঙ্গে একটি বড় বিষয় হল, খাসির মাংসে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরে জমতে থাকলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্য দিকে, বিরিয়ানির ভাত সাধারণত বাসমতী চাল দিয়ে তৈরি হলেও তা মূলত দ্রুত হজমযোগ্য শর্করার উৎস। একসঙ্গে অনেকটা ভাত খেলে শরীরে দ্রুত গ্লুকোজ় ঢুকে পড়ে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা এক লাফে বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, যখন উচ্চ ফ্যাটযুক্ত মাংস এবং দ্রুত হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেট একসঙ্গে খাওয়া হয়, তখন শরীরে এক ধাক্কায় অনেকটা ক্যালোরি ঢুকে পড়ে। এই অতিরিক্ত ক্যালোরি যদি নিয়মিত খরচ না হয়, তা হলে তা চর্বি হিসেবে জমা হতে শুরু করে।
এই কারণেই ডায়াবিটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলতার সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মটন বিরিয়ানি খাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। চিকিৎসক পালানিপ্পান মানিক্কামের কথায়, এই ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভোগা কেউ যদি একবারে অনেকটা মটন বিরিয়ানি খান, তা হলে তাঁর পোস্ট মিল গ্লুকোজ়ের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে এবং অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ শরীর ভারী, ক্লান্ত ও নিস্তেজ লাগে। বিরিয়ানি হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়, ফলে অতিরিক্ত খেলে গ্যাস, অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তবে এই সব কথার মানে এই নয় যে বিরিয়ানি একেবারেই বাদ দিতে হবে। চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য হল, বিরিয়ানি শরীরের শত্রু নয়, শত্রু হল অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস। কতটা পরিমাণ খাচ্ছেন, কত ঘন ঘন খাচ্ছেন এবং কোন সময়ে খাচ্ছেন—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলির দিকে নজর রাখলেই মটন বিরিয়ানি খেয়েও সুস্থ থাকা সম্ভব।
সবচেয়ে প্রথম যে নিয়মটি মানা জরুরি, তা হল পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ। এক প্লেট ভরতি বিরিয়ানি খাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। আধা প্লেট বা ছোট পরিমাণে খেলেও বিরিয়ানির স্বাদ উপভোগ করা যায়। অনেক সময় আমরা ভাবি বেশি খেলে তবেই তৃপ্তি আসে, কিন্তু বাস্তবে স্বাদ জিভে, পরিমাণে নয়। ধীরে ধীরে, মন দিয়ে খেলে অল্প খাবারেই তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব।
বিরিয়ানি খাওয়ার সময় ভাতের পরিমাণ কমিয়ে মাংসও পরিমিত রাখা জরুরি। প্রোটিন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত প্রোটিন এবং ফ্যাট একসঙ্গে শরীরের উপর চাপ ফেলতে পারে। ভাত কম রাখলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে।
এর পাশাপাশি বিরিয়ানির সঙ্গে কাঁচা স্যালাড রাখা অত্যন্ত উপকারী। শসা, গাজর, টমেটো, পেঁয়াজের মতো সবজি ফাইবারে সমৃদ্ধ। ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়তে বাধা দেয়। পেটও দ্রুত ভরে যায়, ফলে অতিরিক্ত বিরিয়ানি খাওয়ার প্রবণতা কমে।
বিরিয়ানি খাওয়ার সময় নির্বাচন করাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের মতে, রাতে বিরিয়ানি খাওয়া উচিত নয়। রাতের দিকে শরীরের হজমক্ষমতা কমে যায়, ফলে ভারী খাবার হজম হতে সমস্যা হয়। সূর্য ডোবার আগেই ভারী খাবার খেয়ে নেওয়া ভালো। দুপুরে বা বিকেলের দিকে বিরিয়ানি খেলে শরীর সহজে তা হজম করতে পারে এবং শক্তিও পাওয়া যায়।
অনেকেই বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য সারাদিন উপোস করে থাকেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে হঠাৎ ভারী খাবার খেলে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বরং বিরিয়ানি খাওয়ার আগে হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া ভালো, যাতে হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে না যায়।
বিরিয়ানির সঙ্গে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা উচিত। বিরিয়ানি নিজেই কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাটে সমৃদ্ধ, তার পর আবার মিষ্টি খেলে শরীরে অতিরিক্ত শর্করা ঢুকে পড়ে। মিষ্টির বদলে ফল খেলে হজম ভালো হয় এবং শরীরও হালকা থাকে।
বিরিয়ানি খাওয়ার পরে হালকা হাঁটা খুবই উপকারী। এতে হজম প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় এবং শরীর ভারী লাগে না। সঙ্গে পর্যাপ্ত জল পান করাও জরুরি, কারণ জল হজমে সাহায্য করে এবং শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে সহায়তা করে।
চিকিৎসকদের মতে, সপ্তাহে একবার বা ১০ থেকে ১৫ দিনে একবার মটন বিরিয়ানি খাওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয়, যদি বাকি দিনগুলোতে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রিত থাকে। প্রতিদিন বা খুব ঘন ঘন বিরিয়ানি খেলে ওজন ও কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই উৎসবের দিনে বা বিশেষ উপলক্ষেই বিরিয়ানি খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি হল খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা। সুস্থ থাকার জন্য নিজের পছন্দের খাবার একেবারে বাদ দেওয়া প্রয়োজন নেই। বরং কী ভাবে, কতটা এবং কখন খাবেন—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব মানেই আনন্দ, আর আনন্দ মানেই নিজের প্রিয় খাবার। তবে সেই আনন্দ যেন ভবিষ্যতে শরীরের উপর বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সে দিকেও সচেতন থাকা জরুরি।
মটন বিরিয়ানি খাওয়া মানেই ডায়েট নষ্ট হয়ে যাবে—এই ভয় ভুলে যান। নিয়ম মেনে, পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে বিরিয়ানি খেলেই উৎসবের স্বাদ আর স্বাস্থ্যের ভারসাম্য—দু’টোই বজায় রাখা সম্ভব।