রাজ্যে ফের নিপা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়ছে। উচ্চ মৃত্যুহার ও দ্রুত সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্য দফতর সতর্ক। কী এই নিপা ভাইরাস, কীভাবে ছড়ায় এবং কোন কোন মাংস ও খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি—জেনে নিন বিস্তারিত।
রাজ্যে ফের নিপা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অংশ ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের খবর সামনে আসার পর থেকেই রাজ্য প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাস এমন একটি সংক্রমণ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের হাসপাতালগুলিকে হাই অ্যালার্টে রাখা হয়েছে। জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশনে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের তরফে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও নিপা ভাইরাসের উচ্চ মৃত্যুহার স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নিপা ভাইরাসকে বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক ও প্রাণঘাতী জুনোটিক ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং পূর্ববর্তী সংক্রমণের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার অনেক ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এত উচ্চ মৃত্যুহারের কারণেই নিপা ভাইরাসকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেন।
এই ভাইরাসের আরেকটি ভয়াবহ দিক হল—এটি শুধু শ্বাসতন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। নিপা ভাইরাস সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। সংক্রমণ গুরুতর হলে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর মানসিক বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা কোমায় চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
নিপা ভাইরাস (Nipah Virus) একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা মূলত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জুনোটিক ভাইরাস। এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হল ফলখেকো বাদুড়, বিশেষ করে Pteropus প্রজাতির বাদুড়।
এই বাদুড় সাধারণত ফল, ফুলের রস কিংবা বিভিন্ন গাছের রস খেয়ে থাকে। খাবার গ্রহণের সময় তাদের লালা, মল বা প্রস্রাবের মাধ্যমে ভাইরাস পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই দূষিত ফল বা খাদ্য যদি মানুষ গ্রহণ করেন, তাহলে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নিপা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়। সেই সময় একটি শূকর খামারকে কেন্দ্র করে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের মৃত্যু হয়। পরে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একাধিকবার নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে কেরালা ও বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে নিপা সংক্রমণ ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাস ছড়ানোর একাধিক পথ রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই পথগুলি অত্যন্ত সাধারণ হওয়ায় মানুষ সহজেই তা অবহেলা করে ফেলেন।
প্রথমত, সংক্রমিত বাদুড়ের সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। বাদুড়ের লালা, মল বা প্রস্রাব পরিবেশে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাদুড়ের দ্বারা দূষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটে। খোলা জায়গায় রাখা ফল, বাদুড় কামড় দেওয়া ফল বা বাদুড়ের লালা লেগে থাকা ফল নিপা ভাইরাস সংক্রমণের বড় মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে কাঁচা খেজুরের রস নিপা সংক্রমণের একটি বড় উৎস হিসেবে পরিচিত।
তৃতীয়ত, সংক্রমিত পশুর মাধ্যমে নিপা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শূকরের মাধ্যমে নিপা ভাইরাস ছড়ানোর ইতিহাস রয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রাথমিক সংক্রমণে শূকর ছিল এই ভাইরাসের অন্যতম মধ্যবর্তী বাহক।
চতুর্থত, মানুষ থেকে মানুষেও নিপা ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, শ্বাসপ্রশ্বাস, লালা বা শরীরের তরলের মাধ্যমে পরিবারের সদস্য, পরিচর্যাকারী বা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথম দিকে উপসর্গগুলি অনেকটাই সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো হওয়ায় অনেক সময় রোগটিকে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করা হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব এবং বমি। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সর্দি বা হালকা শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে।
পরবর্তীকালে রোগ গুরুতর হলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়, কথা জড়িয়ে যায়, খিঁচুনি শুরু হতে পারে এবং রোগীর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রংশ বা অচেতন হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। এই পর্যায়ে পৌঁছালে রোগীর প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায় এবং প্রায়শই আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসকদের মতে, নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা কার্যকর ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। চিকিৎসা মূলত রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী দেওয়া হয়, যাকে সাপোর্টিভ কেয়ার বলা হয়।
এছাড়া রোগ শনাক্তে দেরি হওয়াও বড় কারণ। শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। কিন্তু নিপা ভাইরাস খুব দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
নিপা ভাইরাস আতঙ্কের আবহে সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোন মাংস বা খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমেই শূকরের মাংস নিয়ে সতর্ক হতে হবে। নিপা ভাইরাস ছড়ানোর ইতিহাসে শূকরের মাংস একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত। কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ শূকরের মাংস একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। মাংসের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে শূকরের মাংস এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।
এছাড়া আধসিদ্ধ বা কাঁচা যেকোনো ধরনের মাংস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকেন, মাটন বা অন্যান্য মাংস ভালোভাবে রান্না না হলে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে।
বন্য বা বনজ প্রাণীর মাংস খাওয়া সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কারণ এই ধরনের প্রাণীর শরীরে অজানা ও মারাত্মক ভাইরাস থাকতে পারে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা জায়গায় রাখা ফল, বাদুড়ের সংস্পর্শে আসতে পারে এমন ফল, কাঁচা খেজুরের রস এবং অপরিষ্কার পরিবেশে তৈরি খাবার থেকে দূরে থাকা জরুরি। বিশেষ করে কাঁচা খেজুরের রস নিপা ভাইরাস সংক্রমণের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে পরিচিত।
স্বাস্থ্য দফতর ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সব ধরনের মাংস ভালোভাবে রান্না করতে হবে। ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। খোলা ফল ও রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। জ্বর বা সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকাঠামো, আইসোলেশন ও আইসিইউ প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নিপা ভাইরাস নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী সংক্রমণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক নয়—সচেতনতা ও সতর্কতাই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে সচেতন থাকাই সকলের প্রধান দায়িত্ব।