বিশ্বকাপে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখলেন Lionel Messi। জর্ডানের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফ্রিকিক গোল করে টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়লেন এলএম১০। তাঁর এই কীর্তিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচের আগেই নকআউট নিশ্চিত করে ফেলেছিল আর্জেন্টিনা। ফলে জর্ডনের বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল মূলত গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার লড়াই। পাশাপাশি দলের প্রধান তারকা লিওনেল মেসিকে বিশ্রাম দেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নও ছিল সমর্থকদের আলোচনার কেন্দ্রে। ম্যাচের আগেই কোচ জানিয়ে দিয়েছিলেন, মেসি প্রথম একাদশে থাকবেন না। কিন্তু সেই ঘোষণায় সমর্থকদের উন্মাদনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস শহর যেন ম্যাচের দিন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল আর্জেন্টিনা উৎসবে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় আকাশি-সাদা জার্সি পরা হাজার হাজার সমর্থককে দেখা যায়। কোথাও উড়ছে আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকা, কোথাও আবার 'সোল দে মায়ো' চিহ্নিত ঐতিহ্যবাহী পতাকা। স্টেডিয়ামের বাইরের পরিবেশ থেকে শুরু করে দলের হোটেলের সামনে—সব জায়গাতেই ছিল একটাই নাম, লিওনেল মেসি।
অনেকেই জানতেন, তিনি শুরু থেকে খেলবেন না। তবুও শুধু একবার চোখের সামনে নিজের প্রিয় ফুটবলারকে দেখার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন সমর্থকেরা। গত দুই দশকে ফুটবল বিশ্বকে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন মেসি। তাই তিনি মাঠে নামবেন কি না, সেটি বড় বিষয় হলেও তাঁকে ঘিরে ভালোবাসা কখনও কমে না।
স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই প্রায় প্রতিটি আসন পূর্ণ হয়ে যায়। গ্যালারিতে ছিল উৎসবের আবহ। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের গান, ঢাক-ঢোল, পতাকা আর করতালিতে পুরো স্টেডিয়াম মুখর হয়ে ওঠে। জর্ডনের সমর্থকেরাও নিজেদের দলকে উৎসাহ দিলেও সংখ্যার বিচারে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
কোচ প্রথম একাদশে কয়েকটি পরিবর্তন আনেন। দলের নিয়মিত কয়েকজন ফুটবলারকে বিশ্রাম দিয়ে বেঞ্চে রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নকআউট পর্বের আগে খেলোয়াড়দের ফিট রাখা এবং রিজার্ভ বেঞ্চের ফুটবলারদের ম্যাচ অনুশীলনের সুযোগ করে দেওয়া।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের কাছে রাখে আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে দ্রুত ছোট ছোট পাসে জর্ডনের ডিফেন্সকে চাপে রাখতে থাকে তারা। একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রথম গোল আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি। দারুণ এক দলগত আক্রমণ থেকে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। সেই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে আসে তাদের হাতে। জর্ডন মাঝে কয়েকটি পাল্টা আক্রমণ করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ যথেষ্ট সংগঠিত ছিল।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা আরও কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করে। তবে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভ এবং কিছুটা দুর্ভাগ্যের কারণে ব্যবধান বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে জর্ডন কিছুটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা সমতাসূচক গোল করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। এতে স্টেডিয়ামে সাময়িক নীরবতা নেমে এলেও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা দ্রুত নিজেদের ছন্দ ফিরে পান।
এরপরই আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য হাজার হাজার সমর্থক অপেক্ষা করছিলেন। বেঞ্চ থেকে উঠে ওয়ার্ম-আপ শুরু করেন লিওনেল মেসি। কয়েক মিনিট পর চতুর্থ কর্মকর্তার বোর্ডে তাঁর জার্সি নম্বর ভেসে উঠতেই পুরো স্টেডিয়াম বজ্রধ্বনির মতো করতালিতে ফেটে পড়ে।
মেসি মাঠে নামার পরই আর্জেন্টিনার আক্রমণে নতুন গতি আসে। তাঁর প্রতিটি স্পর্শে দর্শকদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়তে থাকে। সতীর্থদের সঙ্গে ছোট ছোট পাস, দ্রুত মুভমেন্ট এবং নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণে তিনি ম্যাচের গতি বদলে দেন।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের বক্সের ঠিক বাইরে একটি ফ্রি-কিক পায়। বলের সামনে দাঁড়ান মেসি। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। সবাই যেন আগেই অনুমান করে ফেলেছিলেন কী হতে চলেছে।
রেফারির বাঁশি বাজতেই মেসি তাঁর চিরচেনা ভঙ্গিতে বাঁ পায়ের জাদুকরী শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের একেবারে কোণায়। জর্ডনের গোলরক্ষক ঝাঁপিয়েও বল ছুঁতে পারেননি। মুহূর্তেই স্টেডিয়াম আনন্দে বিস্ফোরিত হয়। গ্যালারিতে শুরু হয় 'মেসি, মেসি' ধ্বনি।
এই গোল শুধু ম্যাচের ফল নিশ্চিত করেনি, আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফ্রি-কিক বিশেষজ্ঞ বলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা আজও তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা আরও একটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়রা সমর্থকদের অভিবাদন জানান। পুরো স্টেডিয়াম উৎসবের রূপ নেয়।
এই জয়ের ফলে আর্জেন্টিনা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে উঠে যায়। দলের আত্মবিশ্বাসও আরও বেড়ে যায়। বেঞ্চের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স যেমন ইতিবাচক ছিল, তেমনি বদলি হিসেবে নেমে মেসির গোল পুরো দলকে বাড়তি অনুপ্রেরণা দেয়।
নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে। তুলনামূলকভাবে কেপ ভার্দে আন্ডারডগ হলেও নকআউট ফুটবলে কোনো প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এক ম্যাচের ভুলেই বিদায় নিশ্চিত হতে পারে। তাই আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েই মাঠে নামবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু মেসি নন; বরং পুরো দলের ভারসাম্য। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ—সব বিভাগেই রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দারুণ সমন্বয়। মেসির উপস্থিতি সেই শক্তিকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ডালাসের দর্শকরাও এই ম্যাচের মাধ্যমে স্মরণীয় একটি সন্ধ্যার সাক্ষী হয়ে থাকলেন। শুরুতে না খেলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে নেমে গোল করলেন মেসি, আর সেটিও তাঁর ট্রেডমার্ক ফ্রি-কিক থেকে। এমন দৃশ্য দেখার জন্যই যেন হাজার হাজার সমর্থক স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এখন সকলের চোখ নকআউট পর্বে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা কি একই ছন্দ ধরে রাখতে পারবে? মেসি কি আবারও জাদু দেখাবেন? সেই উত্তর মিলবে পরবর্তী ম্যাচেই। তবে জর্ডনের বিরুদ্ধে এই জয় এবং মেসির ফ্রি-কিক গোল সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে এগিয়ে চলা আর্জেন্টিনা আরেক ধাপ সফলভাবে পার করল গ্রুপ পর্বের চ্যালেঞ্জ।
জর্ডনের বিরুদ্ধে এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট পাওয়ার গল্প নয়, বরং নকআউট পর্বের আগে আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তারও বড় পরীক্ষা ছিল। প্রথম একাদশে একাধিক পরিবর্তন থাকা সত্ত্বেও দলের খেলার ধার একটুও কমেনি। বরং যারা নিয়মিত সুযোগ পান না, তাঁরাও নিজেদের সেরাটা তুলে ধরে কোচের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। এতে বোঝা যায়, আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের গভীরতা কতটা শক্তিশালী এবং দীর্ঘ টুর্নামেন্টে সেটাই হতে পারে তাদের অন্যতম বড় অস্ত্র।
অন্যদিকে, লিওনেল মেসির উপস্থিতি যেন পুরো ম্যাচের আবহই বদলে দেয়। তিনি মাঠে নামার আগ পর্যন্ত গ্যালারিতে একটাই অপেক্ষা—কখন জার্সি নম্বর ১০-কে দেখা যাবে সবুজ ঘাসে। বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর প্রতিটি বল স্পর্শে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। আর যখন ফ্রি-কিক থেকে তাঁর বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়ায়, তখন মুহূর্তেই উৎসবে মেতে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। সেই গোল আবারও মনে করিয়ে দিল, বয়স বাড়লেও বড় মঞ্চে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও অটুট রয়েছে ফুটবলের এই মহাতারকার।
এবার আর্জেন্টিনার সামনে নকআউটের কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী দল হলেও নকআউট পর্বে কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একটিমাত্র ভুল, এক মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা একটি সুযোগ হাতছাড়া করলেই শেষ হয়ে যেতে পারে বিশ্বকাপ অভিযান। তাই গ্রুপ পর্বের সাফল্য ভুলে নতুন উদ্যমে মাঠে নামতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
সমর্থকদের প্রত্যাশাও এখন আকাশছোঁয়া। ডালাসে জর্ডনের বিরুদ্ধে যে আত্মবিশ্বাস, দলগত সমন্বয় এবং মেসির জাদু দেখা গেল, সেটাই যদি নকআউট পর্বেও বজায় থাকে, তবে শিরোপার দৌড়ে আর্জেন্টিনাকে থামানো যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন হয়ে উঠবে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইগুলোতে 'লা আলবিসেলেস্তে' সেই দুর্দান্ত ছন্দ ধরে রাখতে পারে কি না।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব আলাদা। গ্রুপ পর্বে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স দেখিয়ে আর্জেন্টিনা সেই বার্তাই দিয়েছে। মেসির অভিজ্ঞতা, তরুণদের উদ্যম এবং গোটা দলের সমন্বিত ফুটবলই এখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নকআউট পর্বে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে শিরোপার স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।