বিশ্বকাপে দেশের জার্সিতে দুরন্ত ছন্দে থাকার পর ক্লাব ফুটবলেও সেই ধারাই বজায় রাখলেন লিওনেল মেসি। জোড়া গোল করে ইন্টার মায়ামিকে দারুণ জয় এনে দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চ হোক বা ক্লাব—মেসির জাদু একই রকম।
বিশ্বকাপের ব্যস্ততা শেষ করে ক্লাব ফুটবলে ফিরে প্রথম ম্যাচে গোলের দেখা পাননি লিয়োনেল মেসি। তবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের কাছে একটি ম্যাচ গোলশূন্য থাকা যেন সাময়িক বিরতি মাত্র। দ্বিতীয় ম্যাচেই নিজের চেনা ছন্দে ফিরলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে জোড়া গোল করলেন, পাশাপাশি একটি গোল করিয়েও দিলেন। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সের উপর ভর করে মেজর লিগ সকারে (MLS) সান লুইসকে ৪-২ গোলে হারাল ইন্টার মায়ামি।
এই জয়ের ফলে শুধু তিনটি পয়েন্টই অর্জন করেনি মায়ামি, বরং লিগ শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে। টানা আট ম্যাচ অপরাজিত থেকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এখন মেসির দল।
ম্যাচের শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি ইন্টার মায়ামির। খেলা শুরুর মাত্র চতুর্থ মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায় সান লুইস। ডেভিড রদ্রিগেজের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে মায়ামির রক্ষণভাগ হতভম্ব হয়ে পড়ে। ঘরের মাঠে খেলতে নেমে এত দ্রুত গোল হজম করায় কিছুটা চাপে পড়ে যায় মেসির দল।
তবে এই চাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাঠে যখন লিয়োনেল মেসির মতো ফুটবলার থাকেন, তখন যে কোনো মুহূর্তেই ম্যাচের রং বদলে যেতে পারে।
গোল হজমের কিছুক্ষণের মধ্যেই আক্রমণের গতি বাড়ায় ইন্টার মায়ামি। বাঁ দিক থেকে ভেসে আসা একটি দারুণ বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ পায়ের দুরন্ত শটে জালে পাঠিয়ে দেন মেসি। গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না।
এই গোল শুধু স্কোরলাইন সমান করেনি, পুরো দলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দেয়। দর্শকরাও আবার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন।
সমতা ফেরানোর পর যেন আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে ইন্টার মায়ামি।
দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন টেলাস্কো সেগোভিয়া। দ্রুত পাসিং, দুর্দান্ত মুভমেন্ট এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে সান লুইসের রক্ষণভাগ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
এরপর আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মেসি। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে অসাধারণ দক্ষতায় কাটিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এই গোলটি ছিল তাঁর ক্লাসিক স্টাইলের—বল নিয়ন্ত্রণ, গতি, ভারসাম্য এবং নিখুঁত শট।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি গোল উপহার দেয় ইন্টার মায়ামি। এবার গোলদাতার ভূমিকায় ছিলেন মাইকেল। তবে গোলটির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মেসির। তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকেই সহজে বল জালে জড়িয়ে দেন সতীর্থ।
প্রথম ৪৫ মিনিট শেষ হয় ৪-১ ব্যবধানে।
দ্বিতীয়ার্ধে সান লুইস ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ইন্টার মায়ামি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখে। মাঝমাঠে বলের দখল, আক্রমণে ধার এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি তারা।
সান লুইস একটি গোল শোধ করলেও ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ইন্টার মায়ামি।
এই ম্যাচে মেসি শুধু দুটি গোলই করেননি, একটি অ্যাসিস্টও করেছেন। পুরো ম্যাচে তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, ড্রিবলিং এবং আক্রমণ পরিচালনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
পরিসংখ্যান বলছে—
এই পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও মেসির ফুটবল মেধা ও দক্ষতা একটুও কমেনি।
বিশ্বকাপের সময় যেমন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তেমনি ক্লাব ফুটবলেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন মেসি।
প্রথম ম্যাচে গোল না পাওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি কি ক্লান্ত? কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই জোড়া গোল করে সব প্রশ্নের জবাব দিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
এই মৌসুমে ইন্টার মায়ামির অন্যতম শক্তি তাদের আক্রমণ।
মেসির পাশাপাশি টেলাস্কো সেগোভিয়া, মাইকেলসহ অন্যান্য ফুটবলাররাও ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছেন। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য মায়ামিকে আটকানো কঠিন হয়ে উঠছে।
এই ম্যাচে ইন্টার মায়ামির কৌশল ছিল দ্রুত আক্রমণ, উইং ব্যবহার এবং ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙা।
মেসিকে কিছুটা স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল, যার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন তিনি।
এই জয়ের মাধ্যমে ইন্টার মায়ামির অপরাজিত থাকার রেকর্ড দাঁড়াল টানা আট ম্যাচ।
এটি শুধু দলের আত্মবিশ্বাসই বাড়ায়নি, বরং লিগ শিরোপার দৌড়েও তাদের অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
১৮ ম্যাচ শেষে ইন্টার মায়ামির সংগ্রহ ৩৮ পয়েন্ট।
তারা বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
শীর্ষে থাকা ন্যাশভিলের পয়েন্ট ১৮ ম্যাচে ৪০।
ফলে মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যবধান থাকায় আগামী কয়েকটি ম্যাচই নির্ধারণ করতে পারে কে লিগের শীর্ষে উঠবে।
ইন্টার মায়ামির সামনে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে।
মেসি যদি একই ছন্দ বজায় রাখতে পারেন, তাহলে শুধু নিয়মিত মৌসুম নয়, প্লে-অফেও দলটি বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখতে পারে।
মেসির এই পারফরম্যান্সের পর সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমর্থকরা তাঁর গোল, ড্রিবল ও অ্যাসিস্টের ভিডিও শেয়ার করেন।
অনেকেই লিখেছেন, "বিশ্বকাপের মেসিই আবার ক্লাব ফুটবলে ফিরে এসেছে।"
লিয়োনেল মেসি আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চ হোক বা ক্লাব ফুটবল—তিনি এখনও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সান লুইসের বিরুদ্ধে দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে তিনি শুধু ইন্টার মায়ামিকে ৪-২ ব্যবধানে জয়ই এনে দেননি, শিরোপার লড়াইয়েও দলকে নতুন উদ্দীপনা দিয়েছেন।
টানা আট ম্যাচ অপরাজিত থাকা, লিগ টেবিলে দ্বিতীয় স্থানে ওঠা এবং মেসির দুরন্ত ফর্ম—সব মিলিয়ে ইন্টার মায়ামির সমর্থকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বপ্নের সময়। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে চলতি মৌসুমে মেজর লিগ সকারের শিরোপা জয়ের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হয়ে উঠতে পারে মেসির দল।
লিয়োনেল মেসির এই পারফরম্যান্স আবারও মনে করিয়ে দিল কেন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়। বয়স যতই বাড়ুক, মাঠে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং গোল করার দক্ষতা এখনও একই রকম কার্যকর। সান লুইসের বিরুদ্ধে ম্যাচেও সেটাই দেখা গেল। প্রতিপক্ষ শুরুতে গোল করে এগিয়ে গেলেও মেসি এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি। বরং দলের আক্রমণকে আরও সংগঠিত করে তুলেছেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
প্রথম গোলটি ছিল নিখুঁত টাইমিং এবং অসাধারণ ফিনিশিংয়ের উদাহরণ। বাঁ দিক থেকে আসা বলকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শট নেন তিনি। গোলরক্ষক বুঝে ওঠার আগেই বল জালে জড়িয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় গোলেও দেখা যায় তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যেভাবে গোলটি করেছেন, তা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের গোল শুধুমাত্র বিশ্বমানের ফুটবলাররাই নিয়মিত করতে পারেন।
শুধু গোল করাতেই থেমে থাকেননি মেসি। সতীর্থদের খেলায় যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মাইকেলের করা গোলটির আগে তাঁর নিখুঁত ক্রসই ছিল পুরো আক্রমণের ভিত্তি। ম্যাচজুড়ে একাধিক সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। ফলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ বারবার চাপে পড়েছে এবং নিজেদের পরিকল্পনা কার্যকর করতে পারেনি।
ইন্টার মায়ামির এই জয়ে দলের অন্যান্য ফুটবলারদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। টেলাস্কো সেগোভিয়া মাঝমাঠে দারুণ খেলেছেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন। রক্ষণভাগ দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের ভুল শুধরে নিয়ে সান লুইসকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। গোলরক্ষকও প্রয়োজনীয় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের জয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করেন।
এই জয়ের ফলে ইন্টার মায়ামির আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। টানা আট ম্যাচ অপরাজিত থাকা যে কেবল কাকতালীয় নয়, তা আবারও প্রমাণ করল তারা। কোচের কৌশল, ফুটবলারদের সমন্বয় এবং মেসির নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে দলটি এখন লিগের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। সামনে ন্যাশভিলসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে। সেই ম্যাচগুলোতেও যদি মেসি একই ছন্দ ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ইন্টার মায়ামির শীর্ষস্থান দখল করা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সমর্থকদের বিশ্বাস, এই ফর্ম ধরে রাখতে পারলে চলতি মৌসুমে লিগ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে পারে।