Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মনবীরের হ্যাটট্রিক ৮ গোলের ঝড়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিল মোহনবাগান

চলতি মরশুমে মুম্বই সিটি থেকে লালিয়ানজুয়ালা ছাংতেকে দলে নিয়েছে মোহনবাগান। তাঁর আগমনে প্রথম একাদশে মনবীর সিংয়ের জায়গা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

মনবীরের হ্যাটট্রিকে মোহন বাগানের গোলের উৎসব, সাউথ ইউনাইটেডকে ৮-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করল সবুজ-মেরুন

মুম্বই সিটি এফসি থেকে লালিয়ানজুয়ালা ছাংতেকে দলে নেওয়ার পর থেকেই মোহন বাগানে মনবীর সিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা থাকবে কি না, তাঁকে কোন পজিশনে ব্যবহার করা হবে কিংবা নতুন তারকার আগমনে তাঁর খেলার সময় কমে যাবে কি না— এসব নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে চলছিল জোর আলোচনা। মাঠের বাইরে চলতে থাকা সেই জল্পনার উত্তর মনবীর দিলেন মাঠের মধ্যেই। শুধু একটি ভালো পারফরম্যান্স নয়, রীতিমতো হ্যাটট্রিক করে বুঝিয়ে দিলেন যে মোহন বাগানের আক্রমণভাগে নিজের জায়গা ছাড়তে তিনি এখনও প্রস্তুত নন।

মঙ্গলবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডুরান্ড কাপের ম্যাচে বেঙ্গালুরুর সাউথ ইউনাইটেড এফসিকে ৮-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিল মোহন বাগান। সবুজ-মেরুনের এই বিশাল জয়ের প্রধান নায়ক মনবীর সিং। তাঁর তিন গোলের পাশাপাশি জোড়া গোল করেন তরুণ সুহেল ভাট। স্কোরশিটে নাম তোলেন রাহুল ভেকে ও আলবার্তো রডরিগেজ। একটি গোল আসে সাউথ ইউনাইটেডের আত্মঘাতী ভুল থেকে।

ম্যাচের ফলাফল যতটা একপেশে, মাঠের লড়াইটিও ছিল প্রায় ততটাই একতরফা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলের দখল, আক্রমণের গতি, সুযোগ তৈরি এবং গোল করার দক্ষতা— প্রায় প্রতিটি বিভাগেই প্রতিপক্ষকে অনেক পিছনে ফেলে দেয় মোহন বাগান। সাউথ ইউনাইটেডের রক্ষণকে বারবার ভেঙে সবুজ-মেরুন ফুটবলাররা যেভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, তাতে মরশুমের শুরুতেই দলের আক্রমণাত্মক শক্তির একটি স্পষ্ট ছবি সামনে এসেছে।

ছাংতের আগমনের পর মনবীরকে নিয়ে জল্পনা

চলতি মরশুমে মুম্বই সিটি এফসি থেকে ছাংতেকে দলে নিয়েছে মোহন বাগান। ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম দ্রুতগতির ও কার্যকর উইঙ্গার হিসেবে পরিচিত ছাংতে। তিনি সাধারণত ডান প্রান্ত ধরে খেলতে স্বচ্ছন্দ। মনবীর সিংকেও অতীতে একই জায়গায় বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ছাংতের আগমনের পর স্বাভাবিকভাবেই মনবীরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তবে আধুনিক ফুটবলে একজন খেলোয়াড়কে শুধু একটি পজিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় না। মনবীরের বড় শক্তি হল তাঁর বহুমুখিতা। তিনি উইঙ্গার হিসেবে খেলতে পারেন, দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে মূল স্ট্রাইকার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। জাতীয় দলের হয়েও তাঁকে সামনে খেলানো হয়েছে। সাউথ ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে সেই গোল করার ক্ষমতাই আবার সামনে এল।

মনবীরের হ্যাটট্রিক শুধু তিনটি গোলের পরিসংখ্যান নয়। এটি মোহন বাগান কোচিং স্টাফের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও। ম্যাকলারেনের পাশে কিংবা পিছনে মনবীরকে ব্যবহার করা গেলে দলের আক্রমণ আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে। তাঁর গতি, শারীরিক শক্তি, বল ছাড়া দৌড় এবং গোলের জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার দক্ষতা সবুজ-মেরুনের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে।

নতুন ফুটবলার দলে এলে পুরনো খেলোয়াড়ের উপর চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা অনেক সময় একজন ফুটবলারকে আরও ভালো পারফরম্যান্স করতে সাহায্য করে। সাউথ ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে মনবীরকে দেখে মনে হয়েছে, তিনিও সেই প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছেন। নিজের জায়গা ধরে রাখার জন্য তিনি বাড়তি চার্জড এবং বাড়তি মরিয়া।

প্রি-সিজন প্রস্তুতিতে বড় জয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মরশুমের শুরুতে কিংবা প্রি-সিজন পর্যায়ে প্রস্তুতি ম্যাচ এবং তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার উপর কোচেরা বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই ধরনের ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ার প্রধান সুবিধা হল ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়া।

একজন স্ট্রাইকারের জন্য গোল পাওয়ার চেয়ে ভালো প্রস্তুতি খুব কমই হতে পারে। একইভাবে মিডফিল্ডাররা যদি নিয়মিত সুযোগ তৈরি করতে পারেন এবং ডিফেন্ডাররা সেট-পিস থেকে গোল করতে পারেন, তাহলে দলের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। সাউথ ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে মোহন বাগানের আট গোলের মধ্যে আক্রমণভাগ, মাঝমাঠ এবং রক্ষণের ফুটবলারদের অবদান ছিল। ফলে জয়টি কেবল স্কোরলাইনের দিক থেকে নয়, দলগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বে প্রায় প্রতি মরশুমেই বড় দলগুলির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ দলের ম্যাচ দেখা যায়। শক্তির বিচারে ফারাক থাকলেও বড় দলগুলিকে মাঠে সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়। প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়া কিংবা সুযোগ নষ্ট করলে পরিস্থিতি কঠিনও হতে পারে। মোহন বাগান সেই ভুল করেনি। প্রথম মিনিট থেকেই আক্রমণ শুরু করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় সবুজ-মেরুন।

এর আগে সিআইএসএফের বিরুদ্ধে আট গোল করেছিল ইস্ট বেঙ্গল। এবার সাউথ ইউনাইটেডকে একই ব্যবধানে হারিয়ে ডুরান্ড কাপে নিজেদের শক্তির জানান দিল মোহন বাগান। দুই প্রধানের বড় জয় কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বৃষ্টির কারণে ম্যাচ শুরুতে বিলম্ব

মঙ্গলবার ডুরান্ড কাপে রাঁচিতে জামশেদপুর এফসির মুখোমুখি হয়েছিল স্পোর্টিং দিল্লি। প্রবল বৃষ্টির কারণে সেই ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়। তার প্রভাব পড়ে মোহন বাগান ও সাউথ ইউনাইটেডের ম্যাচের সময়সূচিতেও। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২০ মিনিট পরে শুরু হয় যুবভারতীর ম্যাচ।

তবে খেলা শুরু হওয়ার পর গোলের জন্য মোহন বাগান সমর্থকদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র তৃতীয় মিনিটেই সাউথ ইউনাইটেডের রক্ষণ ভেঙে প্রথম গোলটি করেন মনবীর সিং। শুরুতেই গোল পাওয়ার ফলে মোহন বাগানের ফুটবলাররা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে দ্রুত পিছিয়ে পড়ে সাউথ ইউনাইটেডের পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে এলোমেলো হয়ে যায়।

news image
আরও খবর

তৃতীয় মিনিটেই মনবীরের প্রথম গোল

মোহন বাগানের প্রথম গোলটির নেপথ্যে ছিল সাহাল আব্দুল সামাদের নিখুঁত পাস। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণের দিকে উঠে এসে সাহাল বল বাড়ান মনবীরের উদ্দেশে। মনবীর পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত জায়গা তৈরি করেন এবং বাঁ পায়ের শটে বল জালে পাঠান।

গোলটির বিশেষত্ব ছিল মনবীরের ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং। ম্যাচের শুরুতে অনেক সময় ফুটবলাররা অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে ফেলেন। কিন্তু মনবীর বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর গোলরক্ষকের অবস্থান দেখে শট নিয়েছিলেন। তাঁর বাঁ পায়ের শট থামানোর সুযোগ পাননি সাউথ ইউনাইটেডের গোলরক্ষক।

মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পাওয়া এই গোলটি গোটা ম্যাচের ছন্দ নির্ধারণ করে দেয়। মোহন বাগান বুঝে যায় যে দ্রুত পাস এবং দুই প্রান্ত ব্যবহার করে খেললে প্রতিপক্ষের রক্ষণ সহজেই ভাঙা সম্ভব। এরপর থেকে আক্রমণের গতি আরও বাড়িয়ে দেয় সবুজ-মেরুন।

পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে আলবার্তোর গোল

প্রথম গোলের পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আলবার্তো রডরিগেজ। সেট-পিস পরিস্থিতি থেকে তাঁর শক্তিশালী হেড সাউথ ইউনাইটেডের জালে জড়িয়ে যায়। ম্যাচের আট মিনিটের মধ্যেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মোহন বাগান।

একজন ডিফেন্ডারের গোল করা সব সময় দলের জন্য বাড়তি সুবিধা। বিশেষ করে কর্নার কিংবা ফ্রি-কিকের মতো সেট-পিস থেকে নিয়মিত গোল পাওয়া গেলে কঠিন ম্যাচেও তার সুফল পাওয়া যায়। আলবার্তোর হেডে গোল মোহন বাগানের সেট-পিস প্রস্তুতির ইতিবাচক দিকটি সামনে আনে।

আলবার্তো শুধু গোলই করেননি, রক্ষণেও দলকে নিশ্চিন্ত রেখেছিলেন। যদিও সাউথ ইউনাইটেড খুব বেশি আক্রমণের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি, তবুও পিছন থেকে খেলা তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের লম্বা বল নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ড্র্যাজিচের ক্রসে রাহুল ভেকের দুরন্ত হেড

ম্যাচের ১৮ মিনিটে মোহন বাগানের তৃতীয় গোলটি আসে রাহুল ভেকের মাথা থেকে। ড্র্যাজিচের মাপা সেন্টারে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে দুরন্ত হেড করেন ভেকে। বল সাউথ ইউনাইটেডের গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে দিয়ে জালে চলে যায়।

এই গোলটির মাধ্যমে মোহন বাগানের আক্রমণের বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম গোল এসেছিল নিচু পাস এবং বাঁ পায়ের শট থেকে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোল এল হেডের মাধ্যমে। অর্থাৎ মাটিতে ছোট পাসের ফুটবলের পাশাপাশি দুই প্রান্ত থেকে ক্রস এবং সেট-পিসেও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল সবুজ-মেরুন।

রাহুল ভেকে সাধারণত রক্ষণ সামলানোর দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু আক্রমণাত্মক সেট-পিসে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। সাউথ ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে তাঁর গোল সেই সম্ভাবনারই প্রমাণ।

মনবীরের দ্বিতীয় গোল, প্রথমার্ধেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ

মোহন বাগানের চতুর্থ গোলটিও করেন মনবীর। বক্সের মধ্যে বল পাওয়ার পর কোনও রকম তাড়াহুড়ো না করে ঠান্ডা মাথায় সুযোগটি কাজে লাগান তিনি। গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় গোল পূর্ণ হয় তাঁর।

প্রথম গোলের ক্ষেত্রে মনবীরকে বাঁ দিক থেকে আসা পাস কাজে লাগাতে দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় গোলের সময় তিনি মূল স্ট্রাইকারের মতো সঠিক জায়গায় উপস্থিত ছিলেন। এখানেই তাঁর বহুমুখিতা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু বল পায়ে নিয়ে দৌড়ে গোল করতে পারেন না, বক্সের মধ্যে জায়গা বুঝে দাঁড়িয়ে সুযোগের অপেক্ষাও করতে পারেন।

প্রথমার্ধেই ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের ফলাফল প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মোহন বাগান আক্রমণের গতি কমায়নি। সাহাল আব্দুল সামাদ নিজেও গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর দুটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

সাহাল গোল না পেলেও ম্যাচে তাঁর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। প্রথম গোলের পাস দেওয়া থেকে শুরু করে মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর দু’টি শট পোস্টে না লাগলে মোহন বাগানের গোলসংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

Preview image