প্রথম ম্যাচে হতাশাজনক ফলের পর হাইতির বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া ব্রাজিল। বড় জয়ের লক্ষ্য নিয়ে দল সাজাচ্ছেন কোচ আনসেলোত্তি।
মিউজিয়াম অব আর্টের বাইরে জর্জ ওয়াশিংটনের ব্রোঞ্জের মূর্তি পড়ন্ত বিকেলের লালচে আভায় ঝলমল করছে। চারপাশে উৎসবের আবহ। ৪৪ ফুটের ওয়াশিংটন মনুমেন্টের সামনে সেলফি তুলতে ব্যস্ত পর্যটক থেকে ফুটবলপ্রেমী—সবার মধ্যেই যেন এক আলাদা উত্তেজনা। কিন্তু এই শহরের বাতাসে এখন শুধু পর্যটনের গন্ধ নেই, রয়েছে ফুটবলের উত্তাপও। ফিলাডেলফিয়ার রাস্তা, স্থানীয় স্পোর্টস পাব, রেস্তরাঁ, নদীর পাড়—সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে হলুদ জার্সির ভিড়। ডেলওয়াড়ে নদীর পার যেন ব্রাজিল সমর্থকদের উপস্থিতিতে হলুদ সর্ষেখেতের মতো রঙিন হয়ে উঠেছে।
শনিবার ভারতীয় সময় ভোর ৬টায় ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে হাইতির বিরুদ্ধে মাঠে নামবে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’র এই ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে। কারণ প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিরুদ্ধে কোনওরকমে ড্র করেছিল কার্লো আনসেলোত্তির দল। হার না হলেও সেই ফল এবং পারফরম্যান্স ব্রাজিল সমর্থকদের মন ভরাতে পারেনি। ব্রাজিল মানেই আক্রমণাত্মক ফুটবল, ব্রাজিল মানেই ছন্দ, গতি, সৃজনশীলতা এবং জোগো বোনিতো—সুন্দর ফুটবলের এক অনন্য পরিচয়। কিন্তু প্রথম ম্যাচে সেই ছন্দের অভাব স্পষ্ট ছিল।
মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচে ব্রাজিলের খেলা দেখে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। দল বল পজেশন রেখেছে, মাঝমাঠে কিছু মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, কিন্তু আক্রমণে ধার ছিল না। গোলের সামনে যে আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিলকে দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক অপেক্ষা করেন, সেই ব্রাজিলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাসেমিরোদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রক্ষণভাগে সতর্কতা থাকলেও মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সংযোগে ঘাটতি ছিল। ফলে ম্যাচের অনেকটা সময় ব্রাজিলকে অস্বস্তিতে দেখিয়েছে।
সমর্থকদের হতাশা আরও বেড়েছে অন্য বড় তারকাদের ঝলক দেখার পর। এমবাপে, মেসিদের মতো ফুটবলাররা যখন বড় মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন, তখন ব্রাজিলের তারকারা প্রত্যাশিত আলো ছড়াতে পারেননি। এই তুলনা হয়তো সব সময় ন্যায্য নয়, কিন্তু ফুটবল আবেগের খেলা। ব্রাজিল সমর্থকদের প্রত্যাশাও অন্যরকম। তাঁদের কাছে শুধু জয় যথেষ্ট নয়, জয়টা হতে হবে সুন্দর ফুটবল খেলে। বলের গতিতে, পায়ের কাজে, আক্রমণের বৈচিত্র্যে, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে—সেই পুরনো ব্রাজিলিয়ান সৌন্দর্য ফিরে পেতে চান তাঁরা।
এই আবহেই ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভার মন্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি রসিকতার ছলেই বলেছেন, এই ব্রাজিল দলে মেসিকে দেখতে পেলে ভালো হত। কথাটি মজার ছলে বলা হলেও এর মধ্যে সমর্থকদের হতাশার প্রতিফলন রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। কারণ ব্রাজিল ফুটবল নিয়ে দেশটির মানুষের আবেগ অন্য স্তরের। এখানে ফুটবল শুধু খেলা নয়, জাতীয় পরিচয়ের অংশ। তাই ব্রাজিল যখন প্রত্যাশিত খেলতে পারে না, তখন আলোচনা শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না, পৌঁছে যায় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও।
হাইতির বিরুদ্ধে ম্যাচ তাই ব্রাজিলের কাছে শুধু তিন পয়েন্ট পাওয়ার লড়াই নয়, আত্মবিশ্বাস ফেরানোরও পরীক্ষা। প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে দলকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা এখনও বড় মঞ্চের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। আনসেলোত্তির সামনে চ্যালেঞ্জ পরিষ্কার—দলকে শুধু সংগঠিত করলেই চলবে না, আক্রমণাত্মক ও আকর্ষণীয় ফুটবল খেলাতেও হবে। ব্রাজিল সমর্থকরা ফল চান, কিন্তু তার সঙ্গে চান সেই চেনা ছন্দ, যে ছন্দ এক সময় বিশ্ব ফুটবলকে মুগ্ধ করেছিল।
হাইতি তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হলেও ব্রাজিল কোনওভাবেই এই ম্যাচকে হালকাভাবে নিতে পারবে না। বড় দলগুলির জন্য অনেক সময় এ ধরনের ম্যাচই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রত্যাশা থাকে বড় জয়ের, কিন্তু যদি শুরুতে গোল না আসে, চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। প্রতিপক্ষ আত্মবিশ্বাস পেয়ে যায়, আর বড় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় কাজ হবে ম্যাচের শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দ্রুত গোলের সুযোগ তৈরি করা।
মাঝমাঠে ব্রাজিলকে আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মরক্কোর বিরুদ্ধে অনেক সময় বল ধরা থাকলেও আক্রমণে গতি আসেনি। হাইতির বিরুদ্ধে যদি ব্রাজিল দ্রুত পাসিং, উইং ব্যবহার এবং বক্সের সামনে সৃজনশীলতা দেখাতে পারে, তাহলে ম্যাচ সহজ হতে পারে। তবে সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেই সুযোগকে গোলে পরিণত করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। বড় টুর্নামেন্টে গোলের সুযোগ নষ্ট করলে তার মূল্য দিতে হয়।
কাসেমিরোর ভূমিকা এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং মাঝমাঠে ভারসাম্য রাখার ক্ষমতা তাঁকে দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ করে তুলেছে। তবে তাঁর পাশাপাশি আক্রমণভাগের ফুটবলারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু রক্ষণ সামলে বা মাঝমাঠে বল ঘোরালে ব্রাজিলের মতো দলের মান রক্ষা হয় না। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে হলে ব্যক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে দলগত বোঝাপড়াও দরকার।
আনসেলোত্তি একজন অভিজ্ঞ কোচ। ক্লাব ফুটবলে তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। কিন্তু জাতীয় দলের ফুটবল আলাদা। এখানে সময় কম, প্রত্যাশা বেশি, আর সমর্থকদের আবেগ অনেক তীব্র। ব্রাজিলের মতো দলের দায়িত্ব নেওয়া মানে প্রতি ম্যাচেই বিশ্লেষণ, সমালোচনা এবং চাপের মুখে থাকা। প্রথম ম্যাচের পর তাঁর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও হাইতির বিরুদ্ধে ম্যাচ তাঁকে জবাব দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
ফিলাডেলফিয়ার পরিবেশ ব্রাজিলের পক্ষে বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রাজিল সমর্থকদের উপস্থিতি প্রমাণ করছে, দলকে ঘিরে উন্মাদনা এখনও কমেনি। স্থানীয় স্পোর্টস পাব ও রেস্তরাঁয় হলুদ জার্সির সমুদ্র, পতাকা হাতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, ম্যাচের আগে শহরের রাস্তায় গান—সব মিলিয়ে ফুটবল উৎসবের ছবি তৈরি হয়েছে। এই সমর্থন খেলোয়াড়দের বাড়তি শক্তি দিতে পারে।
তবে সমর্থন যেমন অনুপ্রেরণা, তেমনই চাপও। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে নামা মানে প্রত্যেক ফুটবলারের কাঁধে ইতিহাসের ওজন থাকে। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, কাকা, নেইমার—এই ধারার উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান প্রজন্মকে বিচার করেন সমর্থকরা। তাই সাধারণ জয় দিয়ে মন ভরানো কঠিন। ব্রাজিলকে ব্রাজিলের মতোই খেলতে হবে—এই দাবিই সবচেয়ে বড়।
জোগো বোনিতো শুধু একটি ফুটবল দর্শন নয়, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের আত্মা। সুন্দর ফুটবল মানে শুধু পায়ের কারিকুরি নয়, তার মধ্যে থাকে আনন্দ, স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং সাহস। সমর্থকদের অভিযোগ, আধুনিক কৌশলগত ফুটবলের ভিড়ে ব্রাজিল অনেক সময় সেই স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ফেলছে। আনসেলোত্তির কাজ হবে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। রক্ষণ যেন মজবুত থাকে, কিন্তু আক্রমণে যেন স্বাধীনতার অভাব না হয়।
হাইতির বিরুদ্ধে ব্রাজিল যদি শুরু থেকেই চাপ তৈরি করতে পারে, তাহলে বড় জয়ের সম্ভাবনা থাকবে। উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণ, বক্সে ক্রস, মাঝমাঠ থেকে থ্রু বল, সেট পিস—সব দিক থেকেই ব্রাজিলকে কার্যকর হতে হবে। প্রতিপক্ষ যদি নিচে নেমে রক্ষণ সাজায়, তাহলে ধৈর্য হারালে চলবে না। দ্রুত বল ঘোরানো এবং ফাঁকা জায়গা তৈরি করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিট ব্রাজিলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই সময়ে গোল এলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। কিন্তু গোল না এলে সমর্থকদের উৎকণ্ঠা বাড়বে। প্রথম ম্যাচের স্মৃতি তখন আবার ফিরে আসতে পারে। তাই মানসিক দিক থেকেও দলকে প্রস্তুত থাকতে হবে। চাপ সামলে নিজের খেলা খেলতে পারাই বড় দলের লক্ষণ।
হাইতি নিশ্চয়ই জানে, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে তাদের হারানোর কিছু নেই। তারা সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার আক্রমণ এবং সেট পিসের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। ছোট দলগুলো অনেক সময় বড় দলের অস্থিরতাকে অস্ত্র বানায়। তাই ব্রাজিলকে সতর্ক থাকতে হবে। আক্রমণে উঠলেও রক্ষণে ফাঁক রাখা চলবে না। কারণ একটি ভুলই ম্যাচের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এই ম্যাচে ব্রাজিলের ফুটবলারদের শরীরী ভাষাও নজরে থাকবে। প্রথম ম্যাচে অনেক সময় দলকে ক্লান্ত, ধীর এবং অনিশ্চিত দেখিয়েছে। হাইতির বিরুদ্ধে চাই আত্মবিশ্বাসী শুরু। খেলোয়াড়দের মধ্যে যোগাযোগ, পাসিংয়ের গতি, প্রেসিংয়ের তীব্রতা—সবকিছুতেই উন্নতি দরকার। শুধু ফল নয়, পারফরম্যান্সের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ।
সমর্থকদের মধ্যে যে আক্ষেপ ছড়িয়েছে, তা দূর করার সবচেয়ে ভালো উপায় মাঠেই উত্তর দেওয়া। প্রেস কনফারেন্সে ব্যাখ্যা, কোচের কৌশল, বিশ্লেষকের মতামত—এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ কথা বলে মাঠের ফুটবল। হাইতির বিরুদ্ধে ব্রাজিল যদি বড় জয় পায় এবং সুন্দর ফুটবল উপহার দেয়, তাহলে প্রথম ম্যাচের হতাশা অনেকটাই কাটবে।
তবে বড় জয় না এলেও সবচেয়ে জরুরি হবে উন্নতির ইঙ্গিত। দল যদি আরও সংগঠিত দেখায়, আক্রমণ যদি ধারালো হয়, খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া যদি বাড়ে, তাহলে সমর্থকরা আশার আলো দেখতে পাবেন। কিন্তু যদি আবার ধীর, ছন্নছাড়া এবং লক্ষ্যহীন ফুটবল দেখা যায়, তাহলে সমালোচনা আরও বাড়বে।
ফিলাডেলফিয়ার মাঠ তাই ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে শুধু হাইতিকে হারানো নয়, নিজেদের পরিচয় ফেরানোর লড়াই। ব্রাজিল কি আবার সেই সুন্দর ফুটবলের পথে ফিরতে পারবে? আনসেলোত্তি কি দলের মধ্যে ভারসাম্য আনতে পারবেন? কাসেমিরোরা কি নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? আক্রমণভাগ কি গোলের রাস্তা খুঁজে পাবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে শনিবার ভোরে।