Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে সহজ যোগাসন, নিয়মিত করলে মিলবে দ্রুত উপকার

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত যোগাসন হতে পারে কার্যকর সমাধান, মাত্র তিনটি আসনেই মিলতে পারে বড় উপকার

বর্তমান সময়ে ডায়াবিটিস এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। শহর হোক বা গ্রাম, তরুণ হোক বা বৃদ্ধ, প্রায় সব বয়সের মানুষই আজ শর্করার সমস্যায় আক্রান্ত। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই সবকিছু মিলিয়ে ডায়াবিটিস আজ সাধারণ মানুষের জীবনের এক বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেকেই ভাবেন, ডায়াবিটিস মানেই সারাজীবন ওষুধ, কড়াকড়ি খাদ্যনিয়ন্ত্রণ এবং নানা বিধিনিষেধ। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সঠিক জীবনযাপন এবং নিয়মিত কিছু সহজ অভ্যাস ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে যোগাসন এই ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে পরিচিত।

ডায়াবিটিস মূলত এমন একটি রোগ, যেখানে শরীরের ইনসুলিন ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এই সমস্যা অব্যাহত থাকলে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি এবং নানা জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। তাই ডায়াবিটিসকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল যোগাসন।

যোগাসন শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার এক প্রাচীন বিজ্ঞান। হাজার হাজার বছর ধরে যোগাসন মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাও প্রমাণ করেছে যে, নিয়মিত যোগাসন করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া উন্নত হয়, মানসিক চাপ কমে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে। এসব কারণেই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে যোগাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগাসন অত্যন্ত উপকারী। এই আসনগুলি শরীরের অগ্ন্যাশয়কে সক্রিয় করে, ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিয়মিত অভ্যাস করলে ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ডায়াবিটিসের উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

প্রথম যে আসনের কথা বলা যায়, তা হল ভুজঙ্গাসন। এই আসন শরীরের মধ্যভাগকে সক্রিয় করে এবং অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ভুজঙ্গাসন করলে পেটের পেশি শক্তিশালী হয় এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়। ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। নিয়মিত ভুজঙ্গাসন করলে শরীরের ক্লান্তি কমে এবং মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আসন হল পবনমুক্তাসন। এই আসন বিশেষভাবে পেটের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। পবনমুক্তাসন করলে পেটের গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং হজমজনিত সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হজমের সমস্যা থাকলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত পবনমুক্তাসন করলে শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলি সক্রিয় হয় এবং ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ আসন হল মণ্ডুকাসন। এই আসন অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে সহায়ক। মণ্ডুকাসন করলে পেটের উপর চাপ পড়ে, যা অগ্ন্যাশয়কে সক্রিয় করতে সাহায্য করে। ফলে ইনসুলিন নিঃসরণে উন্নতি ঘটে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে। অনেক যোগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য মণ্ডুকাসন অত্যন্ত কার্যকর একটি আসন।

এই তিনটি আসন নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী ধীরে ধীরে উন্নত হয়। তবে শুধু যোগাসন করলেই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। চিকিৎসকরা বলেন, ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য খাদ্য তালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি, চর্বিযুক্ত খাবার এবং জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

মানসিক চাপও ডায়াবিটিসের একটি বড় কারণ। বর্তমান জীবনে মানুষ প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক উদ্বেগ সবকিছু মিলিয়ে মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। এই মানসিক চাপ সরাসরি শরীরের উপর প্রভাব ফেলে এবং ডায়াবিটিসের সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। যোগাসন এবং ধ্যান মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত যোগাসন করলে মন শান্ত থাকে এবং শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে।

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে যোগাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটি শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ওজন ডায়াবিটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। যোগাসন করলে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমে এবং শরীরের গঠন সুস্থ থাকে। ফলে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ ডায়াবিটিসকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গুরুতর সমস্যা, যা ধীরে ধীরে শরীরের নানা অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই ডায়াবিটিসকে অবহেলা না করে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যোগাসন এই ক্ষেত্রে একটি সহজ, নিরাপদ এবং কার্যকর উপায়।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত যোগাসন করেন, তাদের মধ্যে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। এমনকি যারা ইতিমধ্যে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত যোগাসন করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে যোগাসন শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে কিছু আসন সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন।

news image
আরও খবর

যোগাসনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি শরীরের পাশাপাশি মনকেও সুস্থ রাখে। ডায়াবিটিস শুধু শরীরের রোগ নয়, এটি মানসিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। অনেক রোগী ডায়াবিটিসের কারণে হতাশায় ভোগেন। যোগাসন এই হতাশা দূর করতে সাহায্য করে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।

আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার সময় খুব কমই পায়। কিন্তু যদি প্রতিদিন মাত্র কিছু সময় যোগাসনের জন্য বরাদ্দ করা যায়, তাহলে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সকালে বা সন্ধ্যায় কয়েক মিনিট যোগাসন করলে শরীর ও মন উভয়ই সুস্থ থাকে।

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে যোগাসনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। অনেক হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও এখন যোগাসনকে চিকিৎসার সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ওষুধের পাশাপাশি যোগাসন করলে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হয়।

সবশেষে বলা যায়, ডায়াবিটিস কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত যোগাসনের মাধ্যমে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনটি সহজ আসন নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্ষমতা উন্নত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

মানুষের জীবনযাত্রায় যদি যোগাসন একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে ডায়াবিটিসের মতো রোগকে জয় করা অসম্ভব নয়। সুস্থ শরীর, শান্ত মন এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এই তিনের সমন্বয়ই ডায়াবিটিস মোকাবিলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

আজ যদি মানুষ সচেতন হয়, আজ যদি মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নেয়, তাহলে আগামী দিনে ডায়াবিটিস আর ভয়ংকর রোগ হিসেবে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিতে পারবে না। যোগাসন সেই সচেতনতার প্রথম ধাপ।

সবশেষে বলা যায়, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সচেতনতা। যত দ্রুত মানুষ ডায়াবিটিস সম্পর্কে সচেতন হবে, তত দ্রুত এই রোগের জটিলতা কমানো সম্ভব হবে। যোগাসন সেই সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতিদিন যদি মানুষ নিজের শরীরের জন্য কিছু সময় বরাদ্দ করে, তাহলে ডায়াবিটিসের মতো রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনটি সহজ যোগাসন নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের ভেতরের কার্যক্ষমতা উন্নত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হয়।

ডায়াবিটিসের বিরুদ্ধে লড়াই একদিনে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু নিয়মিত যোগাসন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ইতিবাচক মানসিকতার মাধ্যমে এই লড়াই জয় করা সম্ভব। আজ যদি মানুষ সচেতন হয়, আজ যদি মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নেয়, তাহলে আগামী দিনে ডায়াবিটিস আর ভয়ংকর রোগ হিসেবে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিতে পারবে না।

যোগাসন শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এই জীবনদর্শন গ্রহণ করলে মানুষ শুধু ডায়াবিটিস নয়, বহু রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সুস্থ শরীর, শান্ত মন এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এই তিনের সমন্বয়ই সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি।

আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ যদি একটু থামে, নিজের শরীরের দিকে তাকায় এবং যোগাসনকে জীবনের অংশ করে তোলে, তাহলে ডায়াবিটিসের মতো রোগও ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে তার ভয়ংকর রূপ হারাবে।

Preview image