Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

তাজমহলের সামনে রহস্য প্রৌঢ় দম্পতির ছবি তুলতে গিয়ে ক্যামেরায় শূন্যতা!

তাজমহলের সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলেন এক প্রৌঢ় দম্পতি। হঠাৎ প্রৌঢ় ব্যক্তি ফিরে এসে একটু দূরে দাঁড়ানো এক যুবকের হাতে ফোন তুলে দিয়ে অনুরোধ করেন একটি ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। মুহূর্তটি ছিল একদিকে স্বাভাবিক, অন্যদিকে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরা, যা উপস্থিত যুবককে কিছুক্ষণের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দেয়।

সকাল ঠিক সাতটা। শীতের হালকা কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। আগ্রার আকাশে সূর্য উঠেছে একটু আগেই, কিন্তু তার আলো এখনও তীক্ষ্ণ নয়—নরম, লালচে, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে শ্বেতমর্মরের গায়ে। সেই আলোয় তাজমহলের সাদা রং যেন মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে—কখনও হালকা গোলাপি, কখনও জাফরানি, কখনও আবার নিস্তেজ সোনালি। দিনের শুরুতে এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। সেই সৌভাগ্যের অংশীদার ছিলেন দু’জন মানুষ—এক প্রৌঢ় পুরুষ ও তাঁর সহচরী।

দু’জনেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন না। তাজমহলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা—এটাই যেন তখন তাঁদের একমাত্র কাজ। আশপাশে পর্যটকের সংখ্যা কম। কেউ কেউ ছবি তুলছে, কেউ গাইডের কথা শুনছে, কেউ আবার নিঃশব্দে হাঁটছে। কিন্তু এই দু’জনের মধ্যে আলাদা এক ধরনের স্থিরতা ছিল। যেন সময় তাঁদের ছুঁতে সাহস পাচ্ছিল না।

প্রৌঢ়ের পরনে ছিল সাধারণ একটি টি-শার্ট। তার উপর কোনও ভারী শীতের পোশাক নয়, কেবল একটি পুরনো আলয়ান। আলয়ানটি এমনভাবে জড়ানো যে বোঝাই যায়, এটি নতুন নয়—অনেক শীত পেরিয়েছে, অনেক ভোর দেখেছে। নীচে একটি টেরিলিনের প্যান্ট। পায়ে চটি, মোজা নেই। শীতের সকালে এমন পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা শহরের মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তাজমহলের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে তা যেন আরও চোখে পড়ে।

পাশে থাকা মহিলাটির পরনে লাল রঙের একটি সিন্থেটিক শাড়ি। শাড়িটি একটু উঁচু করে পরা, গোড়ালি দেখা যাচ্ছে। তাঁর গায়েও ভারী কিছু নেই—শুধু একটি সাধারণ চাদর। পায়ে তাঁরও চটি। দু’জনের পোশাকেই কোনও আড়ম্বর নেই, নেই ভ্রমণকারীদের সাজগোজ, নেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। তবু তাঁদের উপস্থিতিতে কোনও অভাবের ছাপ ছিল না। বরং এক ধরনের শান্ত তৃপ্তি যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।

দু’জনেই তাজমহলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। সেই তাকিয়ে থাকা কোনও কৌতূহলের তাকানো নয়, কোনও পর্যটকের চোখ নয়। যেন তাঁরা দেখছিলেন শুধু একটি সৌধ নয়, বরং তার মধ্যে জমে থাকা গল্প, ইতিহাস, প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা। সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসা, মুমতাজের স্মৃতি—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছিল তাঁদের চোখে।

হঠাৎ প্রৌঢ় ফিরে তাকালেন। যেন কিছু মনে পড়েছে। চারপাশে চোখ বোলালেন। কাউকে খুঁজছেন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। বয়সে অনেকটাই ছোট। হাতে আধুনিক ফোন, চোখে ব্যস্ততার ছাপ, হয়তো ভিডিও বা ছবি তুলছিলেন। প্রৌঢ় ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগোলেন।

প্যান্টের পকেট থেকে তিনি বের করলেন একটি ছোট্ট ফোন। স্মার্টফোন নয়। পুরনো দিনের রঙিন স্ক্রিনওয়ালা বাটন ফোন। বোতামগুলি ছোট, স্ক্রিনটিও ছোট। ফোনটি এগিয়ে দিয়ে খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বললেন,
“এই ফোনে আমাদের একটা ছবি তুলে দিতে পারবেন? তাজমহলের সঙ্গে।”

অনুরোধে কোনও দ্বিধা ছিল না, কোনও সংকোচও নয়। যেন বহুদিনের অভ্যাস—কারও কাছে সাহায্য চাইতে জানেন, আবার না পেলেও মনখারাপ করেন না।

তাজমহল—প্রেমের সৌধ। পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ভালোবাসার প্রতীকগুলোর একটি। প্রেয়সী মুমতাজের স্মৃতিতে এই সৌধ গড়ে তুলেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সেই প্রেম আজ শতাব্দী পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায়, পর্যটনের ক্যামেরায়, কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। যুগে যুগে কত মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে এই সৌধের সামনে। কেউ প্রেমিক, কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ একা।

এই সৌধের সামনে ছবি তুলেছেন অসংখ্য বিখ্যাত মানুষ। রাজা-রানী, রাষ্ট্রনেতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াবিদ, শিল্পপতি—তালিকা শেষ হওয়ার নয়। ব্রিটেনের রাজা চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়না, উইলিয়াম ও কেট, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্ত্রীসহ, মার্ক জাকারবার্গ, টম ক্রুজ, ক্যাথরিন জেটা জোনস, জুলিয়া রবার্টস, উইল স্মিথ, বিল ক্লিনটন, জাস্টিন ট্রুডো—সবার ছবিই আছে এই তাজমহলের সঙ্গে।

তাজমহলের সামনে ছবি তোলার জন্য আলাদা পেশাদার আলোকচিত্রীও ঘুরে বেড়ান। কয়েকশো টাকার বিনিময়ে ছবি তুলে, প্রিন্ট করে, খামে ভরে হোটেলের ঘরে পৌঁছে দেন তাঁরা। অনেক পর্যটকই সেই সুযোগ নেন। কিন্তু এই দম্পতি সেই পথে যাননি। কেন যাননি, তা কেউ জানে না। হয়তো তাঁরা কোনও হোটেলে ওঠেননি। হয়তো সেই অতিরিক্ত কয়েকশো টাকা তাঁদের বাজেটে ছিল না। হয়তো তাঁরা এই মুহূর্তটিকে খুব ব্যক্তিগত রাখতে চেয়েছিলেন। তাই ফোনই তাঁদের ভরসা।

যুবক ফোনটি হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করলেন। এত পুরনো ফোনে ছবি তোলা সহজ নয়। দীর্ঘদিন স্মার্টফোন ব্যবহার করলে এমন ফোন চালানো সত্যিই কঠিন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“এই ফোন কীভাবে চালাতে হয়, সেটাই তো ভুলে গিয়েছি।”

news image
আরও খবর

কথাটা শুনেও প্রৌঢ়ের মুখে কোনও হতাশা এল না। বরং এক ধরনের আশা রয়ে গেল চোখে। তিনি ফিরে গেলেন তাঁর সঙ্গীর কাছে। দু’জনেই তাজমহলের দিকে পিঠ করে দাঁড়ালেন। যুবক কোনওমতে ক্যামেরা খুলে ছবি তুললেন।

ক্যামেরার মান ছিল খুবই দুর্বল। ০.০৩ মেগাপিক্সেলের সেই ক্যামেরায় সূর্যের আলোয় ঝকঝকে তাজমহলের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দু’জন কার্যত কালচে অবয়বে পরিণত হলেন। মুখ, চোখ, হাসি—কিছুই স্পষ্ট নয়। তবু ছবি উঠল।

প্রৌঢ় অসীম আগ্রহে এগিয়ে এলেন। ছবি দেখবেন। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। ছবিতে তাজমহল স্পষ্ট। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ শুধু দু’টি কালো ছায়া। বোঝার উপায় নেই, তাঁরা কারা। এমনকি সেটি যে মানুষ, সেটাও প্রথম নজরে বোঝা কঠিন।

মনখারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যভাবে প্রৌঢ়ের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। কোনও অভিযোগ নেই, কোনও আফসোস নেই। আরও একবার ছবি তোলার অনুরোধ করলেন না। বরং মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন—এটাই যথেষ্ট। এটাই দরকার ছিল।

ছবিটা নিখুঁত নয়। সুন্দর নয়। কিন্তু স্মৃতিটা সত্যি। সেই মুহূর্তটা তাঁদের। অন্য কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, তাঁরা জানবেন—এই কালো অবয়ব দু’টিই তাঁরা। এই তাজমহলের সামনে তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন। এই সকালে।

এই পুরো ঘটনাটি ধরা পড়েছিল আরেকটি ক্যামেরায়—এমনটাই পরে জানা যায়। যাঁর কাছে ছবি তোলার অনুরোধ এসেছিল, তিনি বা তাঁর সঙ্গে থাকা কেউ গোটা মুহূর্তটি নিঃশব্দে ভিডিওবন্দি করেছিলেন। তখন হয়তো কেউই ভাবেননি, এমন একটি সাধারণ ঘটনা এত মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে। সেই ভিডিওটি পরে পোস্ট করা হয় ইনস্টাগ্রামে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রৌঢ় দম্পতির গল্প।

ভিডিওটি ভাইরাল হতেই হাজার হাজার মানুষ থমকে যান। কেউ মন্তব্যে লিখেছেন, চোখে জল এসে গিয়েছে। কেউ আবার নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। কেউ ভাবছেন বাবা-মায়ের কথা, কেউ মনে করছেন নিজের দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা। চকচকে ছবি, দামি ফোন, নিখুঁত ফ্রেমের বাইরে যে এমন নিঃস্বার্থ, নির্ভেজাল মুহূর্তও থাকতে পারে—ভিডিওটি যেন সেটাই মনে করিয়ে দিল।

আজকের দিনে ভ্রমণ মানেই ক্যামেরা। কোথায় দাঁড়াবেন, কোন দিক থেকে আলো পড়বে, কোন ফিল্টার ব্যবহার করবেন—সবকিছু নিয়েই পরিকল্পনা। অনেক সময় দেখা যায়, ছবি তোলার ব্যস্ততায় জায়গাটাই আর দেখা হয়ে ওঠে না। প্রিয় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও মন থাকে ফোনের স্ক্রিনে। মুহূর্ত তখন আর মুহূর্ত থাকে না, হয়ে ওঠে কেবল একটি কনটেন্ট।

এই প্রেক্ষাপটে তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই প্রৌঢ় দম্পতি যেন এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। তাঁদের কাছে নিখুঁত ছবি ছিল না, ছিল না আধুনিক ক্যামেরা, ছিল না আলো-ছায়ার হিসেব। তবু তাঁদের মধ্যে ছিল তৃপ্তি। ছবি ঝাপসা হলেও স্মৃতিটা ছিল স্পষ্ট। তাঁরা জানতেন, এই মুহূর্ত তাঁদের জীবনের, তাঁদের গল্পের অংশ। সেটাই যথেষ্ট।

ভিডিওটি দেখার পর অনেকেই বুঝতে পেরেছেন—সব স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য নিখুঁত ছবি প্রয়োজন হয় না। কিছু স্মৃতি থাকে মনে, অনুভূতিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবি হয়তো হারিয়ে যায়, ফোন বদলায়, ফাইল ডিলিট হয়। কিন্তু অনুভূতি থেকে যায়। সেই অনুভূতিই একদিন গল্প হয়ে ফিরে আসে।

তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই দম্পতি যেন মনে করিয়ে দিলেন, ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য ছবি তোলা নয়, বরং মুহূর্তকে অনুভব করা। ভালোবাসার সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার মানুষটির পাশে থাকা—এর চেয়ে বড় স্মৃতি আর কী হতে পারে? ক্যামেরায় ধরা পড়ুক বা না পড়ুক, যে অনুভূতি মনে গেঁথে যায়, সেটাই চিরকাল বেঁচে থাকে।

Preview image