Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অতল সমুদ্রে ডলফিনের নাচন শীতে ঘুরতে গেলে কোন ৩ জায়গা একদম মিস করবেন না!

সমুদ্র আর পাহাড় ঘোরার আনন্দ তো অনেকবারই পেয়েছেন। কিন্তু সেই ভ্রমণের সঙ্গে যদি যোগ হয় ডলফিনের মন মাতানো লাফালাফি তাহলে অভিজ্ঞতা হবে আরও জাদুকর! শীতের ছুটিতে কোথায় গেলে কাছ থেকে দেখা মিলবে এই সদাহাসি সমুদ্রসঙ্গীর? জেনে নিন সেরা গন্তব্যগুলোর তালিকা।

শীতে ডলফিন দর্শন—সমুদ্রের নীল রাজ্যে অপূর্ব এক অভিজ্ঞতা

টিভির পর্দায় কিংবা কোনও রিল ভিডিওতে ডলফিনের লাফালাফি দেখে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ কম। কখনও তারা জলের গাঢ় নীল স্তর ছুঁয়ে উঠে যায়, আবার মুহূর্তেই নিমেষে মিলিয়ে যায় জলের অতলে। এই দৃশ্যের মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত জাদু লুকিয়ে থাকে। বাস্তবে সামনে থেকে সেই লম্ফঝম্ফ দেখা—যেখানে হাওয়ায় লেগে থাকে নোনাধরা গন্ধ, আর সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলে বেড়ায় ডলফিন—এর থেকে বড় রোমাঞ্চ আর কিছুই হতে পারে না। শীতের মিঠে রোদে সমুদ্রের বুক চিরে নৌকোয় বসে ডলফিনের ‘জিমন্যাস্টিক’ দেখার আনন্দ তাই অন্যরকম।

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক গন্তব্য আছে যেখানে ডলফিন পর্যটন আজ বিশেষ পরিচিত। বছরভর পর্যটকরা ভিড় করেন শুধু এই প্রাকৃতিক দৃশ্য মনভরে দেখতে। চিলিকা, গোয়া এবং আন্দামান—এই তিন জায়গা শীতে ডলফিন দর্শনের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়। কোথায় কীভাবে দেখা মিলবে ডলফিনের? কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, কোন সময় দেখবেন—সবকিছু জানার জন্য পড়ে ফেলুন এই বিস্তারিত ভ্রমণবৃত্তান্ত।

চিলিকা—ওড়িশার লোনাজলে ডলফিনের খেলা

ওড়িশার বিস্তীর্ণ উপহ্রদ চিলিকা শুধু নিজের সৌন্দর্যের জন্যই নয়, ডলফিন দর্শনের জন্য আজ সারা ভারতের পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। পুরী, গঞ্জাম এবং খুরদা জেলার বুক জুড়ে থাকা এই উপহ্রদ ভারতের অন্যতম বৃহৎ উপকূলীয় লেগুন।

চিলিকার ডলফিন দর্শনের কেন্দ্র হল সাতপাড়া। এখান থেকেই নৌকা ছাড়ে ডলফিন পয়েন্টের দিকে। সরকারি এবং বেসরকারি—দুই ধরনের নৌকা পাওয়া যায়। গভীর নীল জলরাশির মাঝে নৌকা এগিয়ে গেলে জলের ঢেউ হঠাৎ বদলে যায়। কোথাও মৃদু আলোড়ন, কোথাও আচমকাই দেখা মেলে ডলফিনের কালো-পিঠের ছায়া। তাদের লাফিয়ে ওঠা, আবার দ্রুত জলে তলিয়ে যাওয়া—দর্শকদের মাঝে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

চিলিকা ভ্রমণের সময় একবার ঘুরে আসা যায় রাজহংস দ্বীপ। শীতের দিনে এখানে আসে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। সমুদ্র-লেগুন মিলিয়ে এই দ্বীপ নিজেই এক অসামান্য অভিজ্ঞতা।

ডলফিন দেখার সেরা সময়

সকালের দিকে—সূর্য ওঠার পরপরই। এই সময়ে ডলফিনরা বেশি সক্রিয় থাকে।

ভাড়া

মাথাপিছু টিকিটে ডলফিন পয়েন্ট দেখা যায়। আর যদি পুরো লেগুন ঘুরে দেখতে চান, তাহলে ব্যক্তিগত নৌকা ভাড়া করাই উত্তম।

কি খাবেন?

চিলিকার কাঁকড়া দেশের অন্যতম সুস্বাদু। পাশাপাশি টাটকা মাছের স্বাদও অসাধারণ। চিলিকা এলে অবশ্যই চেখে দেখতে হবে।

কোথায় থাকবেন?

  • সাতপাড়ায় ওড়িশা পর্যটনের পান্থনিবাস

  • সরকারি যাত্রীনিবাস

  • বেশ কয়েকটি বেসরকারি হোটেল

  • তবে পর্যটকেরা অধিকাংশই পুরীতে থাকেন, সেখান থেকে দিনে চিলিকা ঘুরে আসেন। পুরী–চিলিকা দূরত্ব: প্রায় ২ ঘণ্টা।

  • গোয়া—সৈকতে রোদ-পানি আর ডলফিনের নৃত্য

গোয়া মানেই সৈকতের দেশ। কিন্তু এই রোদঝলমলে সমুদ্ররাজ্য আজ ডলফিন ট্রিপের জন্যও সমান জনপ্রিয়। উত্তর ও দক্ষিণ গোয়ার বিভিন্ন সৈকত থেকেই প্রতিদিন যন্ত্রচালিত নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রের গভীরে।

কোথায় কোথায় দেখা যায়?

  • কো কো বিচ — মান্ডভি ও নেরুল নদীর মোহনায় থাকা জায়গাটি ডলফিনের স্বর্গরাজ্য

  • ফোর্ট আগুয়াড়া সংলগ্ন অঞ্চল

  • ক্যান্ডোলিম বিচ

  • বাগা বিচ

  • পালোলেম বিচ (দক্ষিণ গোয়া)

এই জায়গাগুলো থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডলফিন ট্রিপ চলে। নৌকা যখন সমুদ্রের ভেতরে এগিয়ে যায়, তখন হঠাৎই দেখা মেলে ডলফিনদের দলবদ্ধ সাঁতার। কখনও নৌকার সামনে সামনে ছুটে চলে, কখনও সমুদ্রের জলের ওপর লাফিয়ে ওঠে। পর্যটকেরা উল্লাসে বলে ওঠেন—‘ওই যে! ওইদিকে!’—এই আনন্দই গোয়ার সমুদ্রভ্রমণকে আরও অনন্য করে তোলে।

সেরা সময়

সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা—এই সময়ে সমুদ্র শান্ত থাকে এবং ডলফিন বেশি দেখা যায়।

news image
আরও খবর

প্যাকেজ

৩০–৪৫ মিনিটের ডলফিন ট্রিপের বিশেষ প্যাকেজ থাকে, দাম সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য।

কোথায় থাকবেন?

উত্তর ও দক্ষিণ গোয়ার প্রায় প্রতিটি জনপ্রিয় সৈকত এলাকায় হোটেল, রিসর্ট, গেস্টহাউস পাওয়া যায়। বাজেট থেকে লাক্সারি—সব ধরনের ব্যবস্থাই রয়েছে।

আন্দামান—অটুট সমুদ্ররাজ্যে ডলফিনের স্বর্গ

আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ নিজেই প্রকৃতির এক অপূর্ব বিস্ময়। স্বচ্ছ সবুজ-নীল জল, সাদা বালুর সৈকত, প্রবালপ্রাচীর আর সমুদ্রের প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপপুঞ্জে ডলফিন দেখা যায় বিভিন্ন জায়গায়।

এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হল গ্লাসবটম বোট। বোটের নিচে থাকা মোটা কাচের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ দেখা যায়—প্রবাল, রঙিন মাছ, সামুদ্রিক দৃশ্য সবকিছুই স্পষ্ট। কখনও কখনও তার মধ্যেই দেখা মেলে ডলফিনদের। তারা কখনও নৌকার পাশে সাঁতার কাটে, কখনও লাফিয়ে ওঠে, আবার কখনও জলের গভীরে মিলিয়ে যায়।

কোথায় কোথায় দেখা যায়?

  • হ্যাভলক দ্বীপ

  • নীল দ্বীপ

  • নর্থ বে
    এই সব জায়গায় বছরের বেশিরভাগ সময়ই ডলফিন দেখা যায়।

  • কোথায় থাকবেন?

  • নর্থ বে ঘুরতে হলে থাকতে হবে পোর্টব্লেয়ার

  • হ্যাভলক ও নীল দ্বীপে অসংখ্য রিসর্ট, সি-ভিউ কটেজ, হোটেল রয়েছে

এদের অধিকাংশই সমুদ্রের একদম ধারে, ফলে সকালবেলা সৈকতের বাতাস, ঢেউয়ের শব্দ এবং নিস্তব্ধ পরিবেশ—সব মিলিয়ে ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।

শীতে ডলফিন দেখার কারণ কী?

  • শীতকালে আবহাওয়া পরিষ্কার

  • সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত

  • ডলফিন এসময়ে বেশি সক্রিয়

  • নৌকায় চাপ কম, ঠান্ডা হাওয়া, আরামদায়ক ভ্রমণ

  • শেষকথা — শীতে ডলফিন দর্শন হোক আপনার ভ্রমণতালিকার প্রথমে

    শীতের মিঠে রোদ, পরিষ্কার আকাশ আর স্বচ্ছ গভীর জলের মাঝখানে ডলফিন দেখার আনন্দ অন্য সব অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যায়। ডলফিন এমন এক সামুদ্রিক প্রাণী, যাদের লাফ, খেলা আর জলকেলি চোখের সামনে দেখা মানে যেন প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন। এর আগে হয়তো টিভির পর্দায় বা কোনও রিল ভিডিওতে দেখে থাকবেন তাদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত সাঁতার বা আনন্দে ভেসে ওঠা লাফ—কিন্তু বাস্তবে সামনে থেকে ডলফিন দেখা একেবারেই অন্যরকম অনুভূতি। সমুদ্রের বুক চিরে নৌকা যখন এগিয়ে চলে, তখনই হঠাৎ কোথা থেকে উঠে আসে সেই ধূসর শরীরের হাসিখুশি প্রাণীরা। কখনও নৌকার সামনে সামনে পথ দেখায়, কখনও বা যেন পর্যটকদের সঙ্গে চোখেমুখে ‘হ্যালো’ বলতে আসে।

    চিলিকার শান্ত উপহ্রদে ডলফিন দেখা মানে প্রকৃতির কোলে এক শান্ত-স্নিগ্ধ সময় কাটানো। সাতপাড়ার ঘাট থেকে নৌকা যখন লেগুনের গভীরে ঢোকে, তখনই বুঝতে পারেন—শহুরে আমি-তুমি ভুলে গিয়ে প্রকৃতির কোনও নির্মল কোণে পৌঁছে গিয়েছেন। আর সেই মুহূর্তেই হঠাৎ দেখা মেলে ডলফিনের। কখনও কাছেই জলের উপর উঠে আসে, আবার নিমেষেই ডুব দিয়ে উধাও। শীতের সকালে লেগুনের কুয়াশা ভেদ করে ডলফিন দেখা মানে দিনের সেরা মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া।

    গোয়ার জলরাশি আবার একেবারে আলাদা। সেখানে সমুদ্রের নীলাভ ঢেউয়ের মাঝে ডলফিন দেখা যেন রোদঝলমলে সিনেমার দৃশ্য। কো কো বিচ, ক্যান্ডোলিম বা আগুয়াড়ার পাশ দিয়ে যন্ত্রচালিত নৌকায় যখন এগিয়ে যাবেন, তখন সমুদ্রের নোনাজলের গন্ধ, হাওয়া আর ঢেউয়ের তালে তালে মনটাই অন্যরকম হয়ে যাবে। এরপর হঠাৎ সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে দেখা মিলবে ডলফিনদের। জলের ওপর লাফিয়ে ওঠা তাদের শরীর যেন আলোর ঝলকানি তৈরি করে। শিশু থেকে বয়স্ক—সবাই এই দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন।

    আন্দামানের জল আবার আরও রহস্যময়, আরও গভীর নীল। পোর্টব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক বা নীল দ্বীপে গ্লাসবটম বোটে সমুদ্রের তলা দেখা—এটাই আলাদা মজা। রঙিন মাছ, প্রবাল প্রাচীর দেখা শেষে যখন হঠাৎ ডলফিনের দলবদ্ধ লম্ফঝম্ফ দেখা যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন আপনাকে চমকে দিতে চায়। কখনও তারা নৌকার পাশ দিয়ে সাঁতরে যায়, কখনও বা নৌকার নীচ দিয়ে চুপচাপ ভেসে বেড়ায়। সমুদ্রের এত নীরবতার মাঝেও এই প্রাণীগুলোর উপস্থিতি পুরো পরিবেশকেই আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

    যেখানেই যান—চিলিকার ধীর-স্থির জল, গোয়ার উচ্ছল সমুদ্র বা আন্দামানের রহস্যময় নীল ঢেউ—সব জায়গায় ডলফিন দর্শন আপনাকে এমন এক অভিজ্ঞতা দেবে যা হয়তো জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মনে থাকবে। শুধু ছবি তোলার সুখ নয়, প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার যে আনন্দ, তারও এক নিখাদ রূপ দেখা যায় ডলফিনের লাফালাফিতে।

    এই শীতে যদি পরিবার, বন্ধু বা সঙ্গীর সঙ্গে নতুন কোথাও ঘুরতে যেতে চান, তাহলে ডলফিন দর্শন আপনার ভ্রমণতালিকার একদম শীর্ষে রাখতেই পারেন। ঠান্ডা হাওয়ায় নৌকার আসনে বসে গভীর নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা—আর হঠাৎ ডলফিনের আনন্দময় উপস্থিতি—এই মুহূর্তগুলো আপনার শীতের ছুটি হয়ে উঠবে আরও বিশেষ, আরও স্মরণীয়।

Preview image