Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মন্দারমণির সমুদ্রে স্নান করতে নেমে তলিয়ে গেল পূর্ব বর্ধমানের যুবক!

পূর্ব বর্ধমানের মাত্র ২৪ বছরের যুবক সুরজ বসুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে এলাকায়। বন্ধুদের সঙ্গে সপ্তাহান্তের আনন্দভ্রমণে মন্দারমণি গিয়েছিলেন তিনি। সমুদ্রের ধারে হাঁটাহাঁটি করতে করতে কিছুটা জলেও নেমেছিলেন সবাই। কিন্তু হঠাৎই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোতে সুরজকে গভীর জলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। বন্ধুদের চিৎকার, স্থানীয়দের সাহায্যের চেষ্টা সবকিছু সত্ত্বেও তাঁকে আর জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনায় পরিবার ভেঙে পড়েছে, এলাকাবাসী শোকাহত। সুরজের বাবা-মা, ভাই-বোন কেউই মানতে পারছেন না এই অকাল মৃত্যু। ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন ছিল তাঁদের, যা মুহূর্তে ভেঙে গেল সমুদ্রের স্রোতে। ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে সতর্কতা ছাড়া সমুদ্রে নামা কত বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। মন্দারমণি-তাজপুর এলাকায় পর্যটকদের আরও সাবধানতার জন্য প্রশাসনও পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পূর্ব বর্ধমানের ২৪ বছরের যুবক সুরজ বসুর মৃত্যুর ঘটনাটি গোটা জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়েছে। সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে বন্ধুদের সঙ্গে মন্দারমণিতে বেড়াতে গিয়েছিল সুরজ। রোজকার কাজের চাপ, পড়াশোনার ব্যস্ততা এবং পারিবারিক দায়িত্বের মাঝেই একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর আশায় তারা এই সমুদ্র সফরের পরিকল্পনা করেছিল। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, হাঁসি-মজা, ছবি তোলা সব মিলিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় এক ভয়ানক দুঃস্বপ্নে। মন্দারমণির উত্তাল ঢেউ কেড়ে নিল সুরজের তরতাজা প্রাণ।

বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রের ধারে হাঁটার সময় হঠাৎই জলস্রোতের টান বাড়তে থাকে। স্থানীয় মানুষজন বারবার সতর্ক করছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে তরুণদের উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনার কাছে সতর্কতার ডাক খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। সুরজ ও তার বন্ধুরা সমুদ্রে একটু নামার সিদ্ধান্ত নেয়। জলের ধারে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই তারা ধীরে ধীরে কিছুটা ভেতরে এগিয়ে যায়। তলদেশের বালির ঢাল, হঠাৎ গভীর গর্ত তৈরি হওয়া এবং জলোচ্ছ্বাসের টান এসব মিলিয়ে বিপদ যেন অপেক্ষায় ছিল।

সুরজের বন্ধুরা জানিয়েছেন, প্রথমে সবাই খুব স্বাভাবিকভাবে জলে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু একটি বড় ঢেউ এসে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে জলের তীব্র স্রোতে সুরজকে টেনে নিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। বন্ধুরা চিৎকার করে সাহায্য চাইতে থাকে। জেলেরা ছুটে আসে, লাইফগার্ডদের খবর দেওয়া হয়, পুলিশের কাছে খবর পাঠানো হয় কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। সমুদ্রের নিষ্ঠুর টান তাকে অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

কয়েক ঘণ্টা ধরে টানা অনুসন্ধানের পরে সুরজের দেহ উদ্ধার করা হয়। সেই দেহ যখন সমুদ্রের বালুচরে আনা হয়, তখন উপস্থিত পর্যটক, স্থানীয় মানুষ এবং বন্ধুরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। জীবনের সেরা মুহূর্ত কাটানোর আশায় যে যুবক মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বন্ধুদের সঙ্গে হাসিখুশি ছিল, সে ফিরে এলো নিথর দেহ হয়ে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যে কারও পক্ষে কঠিন।

পূর্ব বর্ধমানের বাড়িতে এই খবর পৌঁছাতেই পরিবারের উপর নেমে আসে শোকের ঝড়। সুরজের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, বাবা বাকরুদ্ধ, ছোট ভাই বারবার বলছে দাদা ফিরে আসবে। প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভিড় জমিয়েছেন, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ আবার নিজের ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরছেন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে এক তরুণের অকাল মৃত্যু যন্ত্রণার সীমা ছাড়িয়ে যায়।

সুরজ বসু অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র এবং প্রাণবন্ত স্বভাবের ছেলে হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল। কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। দায়িত্বশীলতার কারণে সবার কাছে প্রশংসা পেত। পরিবারকে সাহায্য করতে রাত জেগে কাজ করত, পড়াশোনাও চালিয়ে যেত। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পরিবার যথেষ্ট আশাবাদী ছিল। সম্প্রতি সে একটি নতুন কোর্সে ভর্তি হওয়ার কথা ভাবছিল, আগামী বছর বিয়ের কথাও চলছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন সবকিছুই ভেঙে দিল কয়েক মিনিটের সমুদ্রের স্রোতে।

এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল যে সমুদ্র ভ্রমণ যতই রোমাঞ্চকর মনে হোক না কেন, মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। গত কয়েক মাসে মন্দারমণি, দীঘা ও তাজপুরে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। পর্যটকদের সতর্ক থাকার বার্তা বারবার দেওয়া হয়, লাল পতাকা তোলা থাকলে জলে নামতে নিষেধ করা হয়, লাইফগার্ডদের উপস্থিতি থাকে—তবুও অনেকেই সেসব নির্দেশ মানতে চান না। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দের নেশায় বা সেলফি তোলার আবেগে তাঁরা সমুদ্রের বিপদকে হালকা ভাবে নেন। ফলাফল হয় মারাত্মক দুর্ঘটনা।

এই ঘটনার পর মন্দারমণির বহু পর্যটক গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন, সমুদ্র এতটাই অস্থির ছিল যে স্নান করা একেবারেই উচিত ছিল না। অনেক ট্যুরিস্ট দাবি করেছেন, পর্যাপ্ত সাইরেন বা সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। আবার স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বছরভরই পর্যটকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়, কিন্তু পর্যটকদের অসচেতন আচরণেই এই ধরনের বিপদ তৈরি হয়। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সমুদ্রবেলায় আরও নজরদারি বাড়ানো হবে, লাইফগার্ড দল বাড়ানো হবে এবং টহলদারি আরও জোরদার করা হবে।

সুরজের বন্ধুরা শোকাহত অবস্থায় জানিয়েছেন যে তারা নিজেরাও বুঝতে পারেননি পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলে যাবে। সুরজ সমুদ্র ভালবাসত, ঢেউয়ের সঙ্গে খেলতে ভালো লাগত। প্রায়ই সে বলত, সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে জীবনের সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। কিন্তু সেই সমুদ্রই হয়ে উঠল তার মৃত্যুর কারণ। বন্ধুদের চোখে পানি, তাদের মুখে অপরাধবোধ—“আমরা যদি ওকে থামাতাম! যদি আর একটু সতর্কতা নিতাম!” এই কথাগুলোই তাদের বুক ফাটিয়ে দিচ্ছে।

news image
আরও খবর

সমুদ্রের এই দুর্বার শক্তি বহুবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্দারমণির সমুদ্র তটের তলদেশ অসমান, হঠাৎ গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়, ঢেউয়ের তীব্রতা অন্য সমুদ্রসৈকতের তুলনায় অনেক বেশি এবং পানির টান এতটাই দ্রুত যে একজন দক্ষ সাঁতারুও বিপদে পড়তে পারে। তাই জলোচ্ছ্বাস বা লাল পতাকার সময় সমুদ্রে নামা একেবারেই উচিত নয়।

এই দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে শোকবার্তা ভেসে উঠেছে। অনেকেই সুরজের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। কেউ কেউ প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন, আবার অনেকে পর্যটকদের অসচেতনতার দিকেই আঙুল তুলেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এক তরুণের জীবন অকালে শেষ হয়ে গেল, যার সামনে ছিল অসংখ্য সম্ভাবনা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ।

মন্দারমণির এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেল। ছুটি কাটাতে গেলে আনন্দ করতেই হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি সচেতনতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্ত যেমন সুরজের হাসিখুশি জীবন শেষ করে দিল, তেমনই ভবিষ্যতে আরও কত তরুণ প্রাণ এইভাবে ঝরে যেতে পারে। তাই প্রত্যেক পর্যটকের উচিত প্রশাসনের নির্দেশ মানা, সতর্ক থাকা এবং বিপজ্জনক সময়ে কখনই সমুদ্রে না নামা।

সুরজ বসুর দেহ পূর্ব বর্ধমানে বাড়িতে আনার পর এলাকাবাসীর চোখে জল এসেছিল। শবদেহ যখন বাড়িতে পৌঁছায়, তখন গোটা অঞ্চল নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যেন বোবা শোক ছেয়ে যায় চারপাশে। সুরজের মা তাকে শেষবার দেখতে চাইছিলেন, বারবার দোতলার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন তিনি। একমাত্র ছেলের চলে যাওয়া মানুষকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়। সুরজের স্কুলের শিক্ষক, কলেজের বন্ধু, অফিসের সহকর্মী—সবার মুখেই একটাই কথা, “এত ভালো মানুষ ছিল, জীবনটা এভাবে শেষ হওয়া উচিত ছিল না।”

সুরজের এক বন্ধু জানিয়েছে, এই ট্রিপে যাওয়ার আগে সুরজ বলেছিল—“চলো একটু ফ্রেশ হয়ে আসি, কাজে মন বসছে না।” পরিবারের উপর চাপ কমাতে সে প্রায়ই নিজের ইচ্ছাগুলো চাপা দিত। মাত্র এক দিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল। কে জানত এই সফরই হবে তার জীবনের শেষ সফর।

এই দুর্ঘটনাকে ঘিরে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সমুদ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকমতো ছিল কি না, পর্যটকদের সতর্ক করা হয়েছিল কি না, এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনও ঘটনার পর থেকে টহলদারি বাড়িয়েছে। সমুদ্রের ধারে লাউডস্পিকারে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে এবং লাল পতাকা থাকলে কেউ যেন জলে না নামে তার কড়া নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

এমন এক তরুণের মৃত্যু সমাজকে আবার মনে করিয়ে দিল যে আনন্দের সঙ্গে সতর্কতার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সুরজের চলে যাওয়া তার পরিবারের জীবনে যে অপূরণীয় ক্ষত তৈরি করেছে, তা আর কখনই পূরণ হবে না। সমুদ্রযাত্রা যারা করেন, তাদের সবারই উচিত এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা। জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। মুহূর্তের আনন্দের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কখনই উচিত নয়।

সুরজ বসুর অকাল মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি পুরো সমাজের জন্য এক গভীর বেদনা এবং সতর্কতার বার্তা। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে যে যুবক আর ফিরে এল না, তার স্মৃতি আজীবন রয়ে যাবে পরিবার, বন্ধু এবং পরিচিতদের হৃদয়ে। সমুদ্রের নীল ঢেউ অনেকের কাছে আনন্দ, শান্তি এবং সৌন্দর্যের প্রতীক, কিন্তু সেই ঢেউ কখন যেন হয়ে ওঠে মৃত্যু ফাঁদ। তাই আগামী দিনে কেউ সমুদ্রে বেড়াতে গেলে অন্তত এই তরুণের গল্পটি মনে রাখবে—যেন আর কোনও পরিবারকে এরকম শোকের সাগরে ডুবতে না হয়।

Preview image