শীতকালে চুল শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে পড়ে, তাই সঠিক তেল বেছে নেওয়া জরুরি। নারকেল তেল চুলের গোড়া মজবুত করে, খুশকি কমাতে সাহায্য করে এবং চুলে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধরে রাখে। অন্য দিকে কাঠবাদামের তেল ভিটামিন ই ও ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, যা চুলকে গভীর পুষ্টি দেয়, রুক্ষতা কমায় ও চুল ঝরার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। চুলের ধরন ও সমস্যার উপর নির্ভর করে শীতে নারকেল বা কাঠবাদামের তেল—দু’টিই উপকারী হতে পারে।
চুলের যত্ন নিয়ে কেশসজ্জা ও কেশচর্চা বিশেষজ্ঞদের একটি কথা প্রায় সকলেই শুনে থাকেন চুলে নিয়মিত অল্প করে তেল মালিশ করা অত্যন্ত জরুরি। শীত হোক বা গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শরৎ বছরের সব ঋতুতেই চুল সুস্থ রাখতে তেলের ভূমিকা অপরিসীম। তবে অনেকেই মনে করেন, চুলে তেল মানেই জবজবে করে মাখতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই তেমন নয়। বরং সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক তেল ব্যবহার করলেই চুল পায় প্রকৃত উপকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্নানের আগে শ্যাম্পু করার ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে তেল হালকা গরম করে মাথার ত্বকে মালিশ করলে রক্তসঞ্চালন ভাল হয়। এতে চুলের গোড়ায় পুষ্টি পৌঁছয়, চুলের বৃদ্ধি বাড়ে এবং মাথার ত্বকও থাকে সুস্থ। তেল মালিশ মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে, যা পরোক্ষ ভাবে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।
চুলের যত্নে নানা ধরনের তেলের ব্যবহার নিয়ে ইদানীং অনেক আলোচনা শুরু হয়েছে। হোহোবা অয়েল, আর্গন অয়েল, জবা তেল, ক্যাস্টর অয়েল এই সব তেলের নাম এখন সৌন্দর্যচর্চার দুনিয়ায় বহুল পরিচিত। তবে বহু যুগ ধরেই চুলের যত্নে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে নারকেল তেল। এর পিছনে রয়েছে একাধিক বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক কারণ।
ভারতীয় উপমহাদেশে চুলের যত্ন বলতে আজও অনেকের প্রথম পছন্দ নারকেল তেল। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক গবেষণাতেও নারকেল তেলের উপকারিতার কথা উঠে এসেছে। নারকেল তেল মূলত একটি প্রাকৃতিক তেল, যা সহজে চুলের গভীরে প্রবেশ করতে পারে।
নারকেল তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে লরিক অ্যাসিড, চুলের প্রোটিন লস কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে চুল ভিতর থেকে শক্ত হয় এবং ভাঙার প্রবণতা কমে। নিয়মিত নারকেল তেল ব্যবহার করলে চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় থাকে, যা শীতকালে বিশেষ ভাবে প্রয়োজনীয়।
নারকেল তেল চুলের জন্য কেন এত উপকারী, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক
মাথার ত্বক আর্দ্র রাখে:
শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে মাথার ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়। নারকেল তেল মাথার ত্বকে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
চুল মসৃণ করে:
নারকেল তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড চুলের কিউটিকল মসৃণ করে, ফলে চুল হয় নরম ও উজ্জ্বল।
চুলের বর্ম হিসাবে কাজ করে:
নারকেল তেলের ফ্যাট চুলের উপর একটি প্রাকৃতিক স্তর তৈরি করে, যা বাইরের দূষণ, ধুলো ও শুষ্কতা থেকে চুলকে রক্ষা করে।
চুলের গভীরে গিয়ে ক্ষতি রোধ করে:
অন্যান্য অনেক তেলের তুলনায় নারকেল তেল সহজেই চুলের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে চুলের ভিতরের ক্ষতি সারাতে সাহায্য করে।
রুক্ষ ভাব দূর করে:
শীতে চুলের রুক্ষতা, জট পড়া ও ভেঙে যাওয়ার সমস্যা কমাতে নারকেল তেল অত্যন্ত কার্যকর।
যদিও নারকেল তেল খুবই উপকারী, তবে এটি সবার চুলের জন্য সমান ভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। যাঁদের মাথার ত্বক খুব বেশি তৈলাক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নারকেল তেল ব্যবহার করলে চুল ভারী হয়ে যেতে পারে বা খুশকির সমস্যা বাড়তে পারে। তাই চুলের ধরন বুঝে তেলের পরিমাণ ঠিক করা প্রয়োজন।
নারকেল তেলের পাশাপাশি ইদানীং অনেকেই চুলে কাঠবাদামের তেল বা আমন্ড অয়েল ব্যবহার করছেন। শুধু চুল নয়, ত্বকের যত্নেও এই তেল বেশ জনপ্রিয়। কাঠবাদামের তেলে রয়েছে ভিটামিন ই, ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বায়োটিন এবং নানা ধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা চুল ও ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
বিশেষ করে যাঁদের চুল দুর্বল, পাতলা বা অতিরিক্ত ঝরে যাচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে কাঠবাদামের তেল ভাল ফল দিতে পারে।
চুলে আর্দ্রতা যোগায়:
কাঠবাদামের তেল চুল ও মাথার ত্বকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
চুলের গোড়া মজবুত করে:
ভিটামিন ই ও বায়োটিন চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায়, ফলে চুল মজবুত হয়।
চুল নরম ও মসৃণ রাখে:
নিয়মিত কাঠবাদামের তেল ব্যবহার করলে চুলের রুক্ষতা কমে এবং চুল হয় মোলায়েম।
মাথার ত্বকের চুলকানি কমায়:
শীতে অনেকের মাথার ত্বকে চুলকানি বা জ্বালার সমস্যা দেখা যায়। কাঠবাদামের তেল এই সমস্যা উপশমে সাহায্য করে।
চুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক:
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় কাঠবাদামের তেল চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ভূমিকা নেয়।
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ চুলের ধরন, মাথার ত্বকের অবস্থা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ সব কিছুর উপর নির্ভর করে সঠিক তেল নির্বাচন করা উচিত।
যাঁদের চুল বেশি রুক্ষ ও জট পড়ে:
শীতকালে যাঁদের চুল খুব বেশি শুষ্ক হয়ে যায়, জট পড়ে বা ভেঙে যায়, তাঁদের জন্য নারকেল তেল অত্যন্ত উপকারী। এটি চুলে প্রোটিন ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং গভীর পুষ্টি জোগায়।
যাঁদের চুল সাধারণ বা একটু তৈলাক্ত:
যাঁদের চুল খুব বেশি শুষ্ক নয় বা মাথার ত্বক সামান্য তৈলাক্ত, তাঁদের জন্য কাঠবাদামের তেল ভাল বিকল্প। এটি হালকা হওয়ায় চুল ভারী করে না।
সংবেদনশীল মাথার ত্বক হলে:
মাথার ত্বকে চুলকানি বা সংবেদনশীলতা থাকলে কাঠবাদামের তেল তুলনামূলক ভাবে বেশি আরাম দিতে পারে।
যে তেলই বেছে নিন না কেন, সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলেই মিলবে সেরা ফল
তেল হালকা গরম করে নিন
আঙুলের ডগা দিয়ে মাথার ত্বকে আলতো করে মালিশ করুন
জোরে ঘষবেন না
১০–১৫ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করুন
সপ্তাহে ২–৩ দিন তেল মাখলেই যথেষ্ট
চুলের যত্নে তেল ব্যবহার নতুন কোনও বিষয় নয়। প্রাচীনকাল থেকেই নানা প্রাকৃতিক তেল চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক কালে যদিও নানা ধরনের কসমেটিক প্রোডাক্ট বাজারে এসেছে, তবু চুলের পুষ্টির ক্ষেত্রে তেলের গুরুত্ব আজও অটুট। বিশেষ করে নারকেল তেল ও কাঠবাদামের তেল এই দু’টি তেল আলাদা আলাদা ভাবে যেমন উপকারী, তেমনই একসঙ্গে ব্যবহার করলেও মিলতে পারে চুলের জন্য বাড়তি সুফল।
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, দু’টি তেল একসঙ্গে মেশালে আদৌ কোনও সমস্যা হয় কি না, কিংবা এতে উপকার কমে যায় কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক অনুপাতে এবং নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে নারকেল ও কাঠবাদামের তেল একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কার্যকর।
নারকেল তেল চুলের গভীরে গিয়ে প্রোটিন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা লরিক অ্যাসিড চুলের গঠন মজবুত করে এবং রুক্ষতা কমায়। অন্য দিকে কাঠবাদামের তেল ভিটামিন ই, ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড ও বায়োটিনে সমৃদ্ধ, যা চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায় এবং চুল ঝরে যাওয়ার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এই দুই তেলের গুণ একসঙ্গে মিললে চুল পায় গভীর পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা।
শীতকালে চুলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল শুষ্কতা। ঠান্ডা আবহাওয়া ও কম আর্দ্রতার কারণে মাথার ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়, চুলে জট পড়ে এবং আগা ফেটে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এই সময় শুধুমাত্র একটি তেল অনেকের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে। তখন দুই ধরনের তেল একসঙ্গে ব্যবহার করলে চুলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান একসঙ্গে পাওয়া যায়।
নারকেল তেল চুলে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর তৈরি করে, যা বাইরের শুষ্কতা ও দূষণের হাত থেকে চুলকে রক্ষা করে। অন্য দিকে কাঠবাদামের তেল চুলের ভিতরে পুষ্টি পৌঁছে দেয় এবং মাথার ত্বককে আরাম দেয়। ফলে শীতে এই দুই তেলের মিশ্রণ চুলের জন্য বিশেষ ভাবে উপকারী হতে পারে।
নারকেল ও কাঠবাদামের তেলের মিশ্রণ প্রায় সব ধরনের চুলেই ব্যবহার করা যায়। তবে কিছু নির্দিষ্ট সমস্যায় এটি আরও বেশি কার্যকর
যাঁদের চুল খুব রুক্ষ ও প্রাণহীন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই তেল মিশ্রণ চুলে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
যাঁদের চুলের গোড়া দুর্বল এবং অতিরিক্ত চুল ঝরছে, তাঁদের জন্য কাঠবাদামের তেলের পুষ্টিগুণ বিশেষ উপকারী।
যাঁদের মাথার ত্বকে শুষ্কতা ও হালকা চুলকানির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই তেল মিশ্রণ আরাম দিতে পারে।
তবে যাঁদের মাথার ত্বক খুব বেশি তৈলাক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে তেলের পরিমাণ কম রাখা জরুরি। বেশি তেল ব্যবহার করলে চুল ভারী হয়ে যেতে পারে।
সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলেই তেলের আসল উপকার পাওয়া যায়। নারকেল ও কাঠবাদামের তেল মিশিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি
প্রথমে একটি পাত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী নারকেল তেল নিন। তার সঙ্গে সমপরিমাণ বা সামান্য কম কাঠবাদামের তেল মেশান।
এই মিশ্রণটি হালকা গরম করে নিন। খুব বেশি গরম করা যাবে না, শুধু হালকা উষ্ণ হলেই যথেষ্ট।
এবার আঙুলের ডগা দিয়ে মাথার ত্বকে আলতো করে মালিশ করুন। নখ ব্যবহার করবেন না।
মাথার ত্বকে মালিশ করার পর চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত তেল লাগান।
১০–১৫ মিনিট রেখে হালকা শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।
সপ্তাহে ২–৩ দিন এইভাবে তেল মাখলেই যথেষ্ট।
অনেকেই কাঠবাদামের তেল মুখ ও ত্বকে ব্যবহার করেন। তবে নারকেল তেল মুখে ব্যবহার করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্রণ বা র্যাশ হতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত। তাই মুখের ক্ষেত্রে এই দুই তেল একসঙ্গে ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ত্বকের ধরন বুঝে নেওয়া দরকার। সংবেদনশীল ত্বক হলে আগে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়াই ভাল।
চুলের যত্নে কোনও একটি তেলই যে সবার জন্য সেরা হবে, এমনটা নয়। নারকেল তেল ও কাঠবাদামের তেল দু’টিই চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারী, তবে তাদের কাজের ধরন আলাদা। নারকেল তেল চুলের সুরক্ষা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, আর কাঠবাদামের তেল চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায় ও চুলকে মজবুত করে।
এই দুই তেল একসঙ্গে ব্যবহার করলে চুল পায় দ্বিগুণ যত্ন। বিশেষ করে শীতকালে এই মিশ্রণ চুলের রুক্ষতা, জট পড়া ও শুষ্কতার সমস্যা কমাতে কার্যকর হতে পারে। তবে চুলের ধরন ও মাথার ত্বকের অবস্থার উপর ভিত্তি করে তেলের পরিমাণ ও ব্যবহারের নিয়ম ঠিক করা জরুরি।
নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে তেল মালিশ করলে চুল থাকবে সুস্থ, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত শীত হোক বা গ্রীষ্ম, সারা বছরই।