Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেসি বনাম রোনাল্ডো ভক্তদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে চাঞ্চল্যকর সমীক্ষা

চলতি বিশ্বকাপে মেসি ও রোনাল্ডো দু’জনেই নজরকাড়া ফর্মে রয়েছেন। মেসি দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে দাপট দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে ছন্দে ফিরেছেন রোনাল্ডো। দুই মহাতারকার পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপের উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল।

ফুটবল দুনিয়ায় লিওনেল মেসি নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বিতর্কের শেষ নেই। গত প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডা, সোশ্যাল মিডিয়া, মাঠের গ্যালারি, সংবাদমাধ্যম কিংবা পাড়ার চায়ের দোকান—সব জায়গাতেই এই দুই মহাতারকাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক চলেছে সমান তালে। কেউ বলেন মেসি ফুটবলের শিল্পী, আবার কেউ বলেন রোনাল্ডো কঠোর পরিশ্রম, মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কারও কাছে মেসির বাঁ পায়ের জাদু অতুলনীয়, আবার কারও কাছে রোনাল্ডোর গোল করার ক্ষুধা এবং বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা অনন্য। কিন্তু এবার মেসি-রোনাল্ডো বিতর্ক শুধু ফুটবলের মাঠ বা পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, এই দুই তারকার ভক্তদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্যও চোখে পড়ার মতো।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের ন্যানইয়াং টেকনলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি বা NTU Singapore-এর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন সমীক্ষা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। NTU-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৬টি দেশের ১০ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নিয়ে এই সমীক্ষা করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের শুধু মেসি বা রোনাল্ডোর মধ্যে পছন্দ বেছে নিতে বলা হয়নি, পাশাপাশি তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা নিজেদের তুলনামূলকভাবে উদারমনস্ক বা লিবারাল বলে মনে করেন, তাঁদের মধ্যে মেসিকে পছন্দ করার প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে, যাঁরা নিজেদের তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ মতাদর্শের বলে মনে করেন, তাঁদের মধ্যে রোনাল্ডোকে পছন্দ করার প্রবণতা বেশি। তবে গবেষকরা এটাও জানিয়েছেন, এই সম্পর্ক সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম নয়; তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি স্পষ্ট, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।

এই সমীক্ষার বিষয়টি শুধু ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে মজার আলোচনার বিষয় নয়, বরং সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বিস্তৃত প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণভাবে আমরা মনে করি, ফুটবলার পছন্দ করা একেবারেই ব্যক্তিগত রুচির বিষয়। কেউ ড্রিবলিং পছন্দ করেন, কেউ গোল স্কোরিং রেকর্ড দেখেন, কেউ বড় ট্রফি গোনেন, আবার কেউ ফুটবলারের ব্যক্তিত্ব, জীবনসংগ্রাম বা মাঠের আচরণ দেখে তাঁকে ভালোবাসেন। কিন্তু এই সমীক্ষা দেখাচ্ছে, মানুষের রাজনৈতিক ভাবনা বা সামাজিক মূল্যবোধ কখনও কখনও বিনোদন, খেলা, তারকা-পূজা এবং সাংস্কৃতিক পছন্দকেও প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, মেসি বা রোনাল্ডোকে পছন্দ করার বিষয়টি অনেক সময় শুধু ফুটবলের বিশ্লেষণ নয়, বরং মানুষের বৃহত্তর মানসিক ও সামাজিক অবস্থানের প্রতিফলনও হতে পারে।

লিওনেল মেসি দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক ধরনের নীরব প্রতিভার প্রতীক। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহর থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার ছোটবেলায় শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়েছেন, পরে বার্সেলোনার যুবদলে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন। মেসির ফুটবলীয় চরিত্রে আছে স্বাভাবিক প্রতিভা, নিখুঁত বল কন্ট্রোল, দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত প্রচারের তুলনায় মাঠের পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা। অনেক ভক্তের কাছে মেসি যেন ফুটবলের কবি—যিনি কম কথা বলেন, কিন্তু বল পায়ে কথা বলেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর খেলার মধ্যে অনেকে খুঁজে পান সৌন্দর্য, সহজতা, সৃজনশীলতা এবং দলগত ফুটবলের এক অনন্য রূপ।

অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ফুটবল ইতিহাসে এক অন্য ধরনের প্রতীক। পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপ থেকে উঠে আসা রোনাল্ডোর জীবনকাহিনিতে আছে দারিদ্র্য, সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের শরীর ও দক্ষতাকে প্রায় যান্ত্রিক নিখুঁততায় গড়ে তোলার গল্প। রোনাল্ডো নিজেকে তৈরি করেছেন এক বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে। তাঁর ফিটনেস, গোলের ক্ষুধা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের দাবি এবং বারবার নিজেকে নতুন লিগে প্রমাণ করার মানসিকতা তাঁকে অনেক ভক্তের কাছে সাফল্যের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। রোনাল্ডো ভক্তদের অনেকেই মনে করেন, প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাফল্যের আসল চাবিকাঠি হলো শৃঙ্খলা, পরিশ্রম এবং নিজের উপর অগাধ বিশ্বাস।

সমীক্ষার আলোচনায় বলা হয়েছে, এই দুই ফুটবলারের জন-ইমেজ বা public image তাঁদের ভক্তদের পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। মেসিকে অনেকেই দেখেন বিনয়ী, দলমুখী এবং স্বাভাবিক প্রতিভার প্রতীক হিসেবে। অন্যদিকে রোনাল্ডোকে অনেকে দেখেন উচ্চাভিলাষী, আত্মবিশ্বাসী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্য এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে এই প্রতীকী ভাবনার মিল খুঁজে পেতে পারেন সমীক্ষকরা। উদারমনস্ক মানুষ অনেক সময় সমষ্টিগততা, সৃজনশীলতা ও নমনীয়তার মূল্য দেন; সেখানে মেসির ফুটবলীয় ভাবমূর্তি তাঁদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আবার রক্ষণশীল মানসিকতার অনেক মানুষ ব্যক্তিগত অর্জন, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেন; সেখানে রোনাল্ডোর ইমেজ তাঁদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

news image
আরও খবর

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এই ধরনের সমীক্ষা কোনওভাবেই বলে না যে প্রত্যেক মেসি ভক্ত বামপন্থী বা প্রত্যেক রোনাল্ডো ভক্ত দক্ষিণপন্থী। বাস্তবে ফুটবলপ্রেমীদের পছন্দ অনেক জটিল। একজন মানুষ মেসিকে পছন্দ করতে পারেন তাঁর ড্রিবলিংয়ের জন্য, আবার রাজনৈতিকভাবে তিনি রক্ষণশীল হতে পারেন। আবার কেউ রোনাল্ডোর ফিটনেস ও গোল করার ক্ষমতায় মুগ্ধ হতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত উদারমনস্ক হতে পারেন। তাই এই সমীক্ষাকে ব্যক্তিগত বিচার বা লেবেল দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। বরং এটি একটি সামগ্রিক প্রবণতা বোঝার চেষ্টা, যেখানে বড় সংখ্যক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি সম্পর্ক বা correlation দেখা হয়েছে। সম্পর্ক থাকা মানেই সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নয়—এ কথাও মনে রাখা জরুরি।

SSRN-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই সমীক্ষার নমুনা হিসেবে ১০,৬৬১ জন অংশগ্রহণকারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, আত্মসম্মান, authoritarianism বা কর্তৃত্ববাদী মনোভাব, short-form video news consumption বা ছোট ভিডিও-ভিত্তিক সংবাদ ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিও খেলোয়াড় পছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, cognitive reflection বা চিন্তনক্ষমতার একটি দুর্বল সম্পর্ক মেসি-পছন্দের সঙ্গে দেখা গেছে। এই তথ্যগুলি দেখায় যে মেসি-রোনাল্ডো বিতর্কের মধ্যে শুধু খেলার রুচি নয়, বরং সামাজিক মনস্তত্ত্ব, মিডিয়া ব্যবহারের ধরণ এবং ব্যক্তিত্বের নানা স্তরও কাজ করতে পারে।

২৬টি দেশের উপর সমীক্ষা হওয়ায় এই গবেষণার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ মেসি ও রোনাল্ডো দু’জনেই বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়। তাঁদের ভক্ত শুধু আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন বা ইউরোপে সীমাবদ্ধ নন; ভারত, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা—প্রায় সব ফুটবলপ্রেমী দেশেই তাঁদের বিশাল ফ্যানবেস রয়েছে। NTU-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশভেদে পছন্দের ভিন্নতাও দেখা গেছে। কিছু দেশে মেসির প্রতি ঝোঁক বেশি, কিছু দেশে রোনাল্ডোর জনপ্রিয়তা বেশি, আবার কয়েকটি দেশে স্পষ্ট কোনও একপক্ষীয় পছন্দ দেখা যায়নি। এই দেশভিত্তিক ভিন্নতা দেখায়, ফুটবলারের জনপ্রিয়তা শুধু ব্যক্তিগত মতাদর্শ নয়, স্থানীয় ফুটবল সংস্কৃতি, মিডিয়া কাভারেজ, ক্লাব-ভিত্তিক সমর্থন, জাতীয় দলের আবেগ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপরও নির্ভর করে।

ভারতের মতো দেশে মেসি-রোনাল্ডো বিতর্ক আরও আবেগপ্রবণ। এখানে ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা, কেরল, গোয়া, উত্তর-পূর্ব ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গভীর আবেগের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকায় গ্রাম-শহর রঙিন হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে রোনাল্ডোর জনপ্রিয়তাও ভারতে ব্যাপকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব শর্টস, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং ফুটবল গেমিং কালচারের মাধ্যমে রোনাল্ডো এক শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছেন। মেসির ক্ষেত্রে আবেগের জায়গাটি অনেক সময় আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য, বার্সেলোনার স্বর্ণযুগ এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাই ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এই সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

মেসি ও রোনাল্ডোর তুলনা করতে গেলে পরিসংখ্যানের প্রশ্নও উঠে আসে। ব্যালন ডি’অর, গোলসংখ্যা, অ্যাসিস্ট, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, জাতীয় দলের সাফল্য, ক্লাব ক্যারিয়ার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই তারকার নিজস্ব শক্তি আছে। মেসি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা দূর করেছেন। রোনাল্ডো পর্তুগালকে ইউরো কাপ জেতানোর অন্যতম মুখ। মেসি খেলাকে শিল্পে পরিণত করেছেন—এ কথা তাঁর ভক্তরা বলেন। রোনাল্ডো অসম্ভব আত্মনিবেদন দিয়ে নিজের সীমা বারবার ভেঙেছেন—এ কথা তাঁর ভক্তরা বলেন। ফলে কে সেরা, তা শেষ পর্যন্ত অনেকাংশে নির্ভর করে দর্শকের চোখে ফুটবলের সংজ্ঞা কী তার উপর।

এই সমীক্ষা তাই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যেমন মজার, তেমনই চিন্তারও বিষয়। কারণ আমরা অনেক সময় ভাবি, রাজনীতি মানে শুধু ভোট, দল, সরকার বা মতাদর্শ। কিন্তু আধুনিক সমাজে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের সাংস্কৃতিক পছন্দের মধ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। কোন সিনেমা ভালো লাগে, কোন সংবাদমাধ্যমে ভরসা করি, কোন তারকাকে আদর্শ মনে করি, কোন ফুটবলারকে বেশি পছন্দ করি—এসব ক্ষেত্রেও মানুষের সামাজিক অবস্থান, মূল্যবোধ এবং মতাদর্শের ছাপ থাকতে পারে। মেসি-রোনাল্ডো বিতর্ক সেই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি জনপ্রিয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Preview image