৩ জুলাই পর্তুগিজ ফুটবলের কাছে শুধু একটি দিন নয়, শোক আর স্মৃতির ভারে ভরা এক আবেগের মুহূর্ত। জোটার মৃত্যুবার্ষিকীর যন্ত্রণাকে বুকে নিয়েই এবার কাপের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে নামছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
বৃহস্পতিবার রাতে টরন্টোর আলো ঝলমলে মঞ্চে বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ৩২-এর এক হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। কাগজে-কলমে এটি নিছকই নকআউট পর্বের আরেকটি বড় ম্যাচ। কিন্তু পর্তুগালের জন্য এই রাত শুধুই ফুটবল নয়, শুধুই কৌশল নয়, শুধুই জেতা-হারা নয়। এই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর আবেগ, এক অপূরণীয় শূন্যতা, এক হারিয়ে যাওয়া সতীর্থের স্মৃতি। কারণ কানাডার ক্যালেন্ডারে যখন ২ জুলাই, পর্তুগালের ঘড়িতে তখন পেরিয়ে যাবে মধ্যরাত। এসে যাবে ৩ জুলাই। আর ৩ জুলাই মানেই পর্তুগিজ ফুটবলের হৃদয়ে এক অব্যক্ত ব্যথার দিন—দিয়োগো জোটার প্রয়াণের দিন।
দিয়োগো জোটা। নামটি উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে গতি, লড়াই, গোলের ক্ষুধা, দলের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। লিভারপুলের জার্সিতে যেমন তিনি ছিলেন সমর্থকদের প্রিয়, তেমনই পর্তুগালের জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমেও ছিলেন এক আপন মানুষ। ফুটবল মাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল তীক্ষ্ণ, প্রাণবন্ত ও কার্যকর। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩ জুলাই স্পেনের জামোরা প্রদেশে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর পথচলা। তাঁর সঙ্গে প্রাণ হারান ভাই আন্দ্রে সিলভাও। সেই শোক শুধু পরিবারের ছিল না, শুধু লিভারপুলের ছিল না, শুধু পর্তুগালের ছিল না—সেটা ছিল গোটা ফুটবলবিশ্বের শোক।
এক বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে যখন পর্তুগাল নামছে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে, তখন সেই স্মৃতিই যেন অদৃশ্যভাবে হাঁটবে রোনাল্ডোদের সঙ্গে। টরন্টোর সবুজ ঘাসে হয়তো জোটার পা পড়বে না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হবে প্রতিটি পাসে, প্রতিটি দৌড়ে, প্রতিটি ট্যাকলে, প্রতিটি গোলের চেষ্টায়। ফুটবল অনেক সময় পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায়—কে কত গোল করল, কার পাস অ্যাকিউরেসি কত, কার পজেশন বেশি। কিন্তু কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোর মাপ শুধু স্কোরলাইনে ধরা যায় না। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া সেই ধরনেরই এক ম্যাচ।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রাউন্ড অফ ৩২-এ পর্তুগালের সামনে প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। একদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্নের আবেগ, অন্যদিকে লুকা মদ্রিচের অভিজ্ঞতা ও মরিয়া লড়াই। দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচের গুরুত্ব বিরাট। কিন্তু পর্তুগালের কাছে এই ম্যাচ আরও গভীর। কারণ তারা শুধু কোয়ার্টার কিংবা রাউন্ড অফ ১৬-এর পথে এগোতে চাইছে না, তারা চাইছে একজন প্রয়াত সতীর্থের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৬ জন থাকলেও, পর্তুগালের হৃদয়ে এই অভিযানে রয়েছেন ২৭তম সদস্য—দিয়োগো জোটা।
পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্টিনেজ জোটাকে দলের সম্মানসূচক সদস্য হিসেবে মনে রেখেছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু আবেগের নয়, এটি দলের মানসিক শক্তিরও প্রতীক। একটি দল যখন বড় টুর্নামেন্টে নামে, তখন শুধুমাত্র ট্যাকটিক্স, ফর্মেশন বা স্টার পাওয়ার দিয়ে সবকিছু জেতা যায় না। দরকার থাকে বিশ্বাস, ঐক্য, ভেতরের আগুন। জোটার স্মৃতি সেই আগুনকেই আরও জ্বালিয়ে দিতে পারে। একজন ফুটবলার শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর প্রভাব কীভাবে একটি দলের মনস্তত্ত্বে বেঁচে থাকতে পারে, পর্তুগালের এই বিশ্বকাপ অভিযান তারই উদাহরণ।
রুবেন নেভেসের ২১ নম্বর জার্সি এখন আর শুধু একটি নম্বর নয়। সেটি এখন স্মৃতির ভার, বন্ধুত্বের প্রতীক, অসমাপ্ত স্বপ্নের বাহক। জোটার সঙ্গে নেভেসের সম্পর্ক ছিল গভীর। তাঁদের মধ্যে ছিল মাঠের বোঝাপড়া, ড্রেসিংরুমের বন্ধুত্ব এবং দেশের জার্সির প্রতি একসঙ্গে দায়বদ্ধতা। তাই যখন নেভেস জোটার নম্বর পরে মাঠে নামেন, তখন সেটা শুধু একজন সতীর্থকে মনে রাখার বিষয় নয়, বরং যেন এক নীরব অঙ্গীকার—“তুমি নেই, কিন্তু আমরা তোমাকে নিয়ে খেলছি।”
এই ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দিকেও থাকবে বিশ্বের নজর। বয়স যতই বাড়ুক, রোনাল্ডোর ক্ষুধা কমেনি। বিশ্বকাপ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য, ইউরো জয়, নেশনস লিগ—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর হাতে ওঠেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই পথ আর সহজ নয়। প্রতিটি নকআউট ম্যাচই হতে পারে শেষ সুযোগ। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে হার মানেই স্বপ্নভঙ্গ। আর জয় মানে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু এবার রোনাল্ডোদের সামনে শুধু ব্যক্তিগত ইতিহাস লেখার সুযোগ নয়, আছে জোটার স্মৃতিকে জয় দিয়ে সম্মান জানানোর দায়।
ক্রোয়েশিয়াও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। লুকা মদ্রিচের নেতৃত্বে এই দল বহুবার দেখিয়েছে, বড় মঞ্চে তাদের অবহেলা করা যায় না। ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০২২ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান—ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল চরিত্র তৈরি হয়েছে সংগ্রাম, ধৈর্য ও মানসিক শক্তির ওপর। বয়স বাড়লেও মদ্রিচ এখনও মাঠে ছন্দ তৈরি করতে জানেন। তাঁর এক পাস, এক টার্ন, এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে ম্যাচের গতিপথ। পর্তুগালের জন্য তাই ম্যাচটি আবেগের হলেও, আবেগের চাপে কৌশল হারালে বিপদ বাড়বে।
নকআউট ফুটবলে ভুলের ক্ষমা নেই। গ্রুপ পর্বে খারাপ ম্যাচের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে, কিন্তু রাউন্ড অফ ৩২ থেকে প্রতিটি মিনিটের মূল্য আলাদা। একটি ভুল পাস, একটি ভুল ক্লিয়ারেন্স, একটি মিস করা সুযোগ—সবকিছুই হতে পারে বিদায়ের কারণ। তাই পর্তুগালকে একই সঙ্গে আবেগী এবং ঠান্ডা মাথার হতে হবে। জোটার স্মৃতি যেন শক্তি হয়, চাপ নয়। তাঁর জন্য খেলতে গিয়ে যদি দল নিজের ছন্দ হারায়, তাহলে সেই আবেগই বিপরীত ফল দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই স্মৃতি দলকে আরও একত্র করে, তাহলে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পর্তুগাল ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
পর্তুগালের আক্রমণভাগের শক্তি বরাবরই বড়। রোনাল্ডোর উপস্থিতি যেমন বক্সের ভেতরে ভয় তৈরি করে, তেমনই ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, রাফায়েল লিয়াওদের সৃজনশীলতা যে কোনও রক্ষণকে বিপদে ফেলতে পারে। দ্রুত উইং প্লে, বক্সের বাইরে থেকে শট, সেট-পিস—সব দিক থেকেই পর্তুগালের অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ধৈর্য। কারণ ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের গতি কমিয়ে দিতে পারে, মাঝমাঠে বল ধরে রাখতে পারে, প্রতিপক্ষকে হতাশ করতে পারে। তাই প্রথম ২০-২৫ মিনিটে গোল না পেলেও পর্তুগালকে তাড়াহুড়ো করা চলবে না।
মাঝমাঠের লড়াই হতে পারে ম্যাচের আসল কেন্দ্রবিন্দু। ক্রোয়েশিয়া মাঝমাঠ দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। মদ্রিচের অভিজ্ঞতা, বল ধরে রাখার ক্ষমতা এবং খেলার গতি বোঝার দক্ষতা পর্তুগালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে পর্তুগালের মাঝমাঠকে শুধু আক্রমণ গড়লেই চলবে না, ক্রোয়েশিয়ার পাসিং রিদম ভাঙতেও হবে। রুবেন নেভেস, ভিতিনহা কিংবা ব্রুনোদের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দল মাঝমাঠ দখল করবে, ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই তাদের দিকে ঝুঁকতে পারে।
রক্ষণেও পর্তুগালকে সতর্ক থাকতে হবে। নকআউট ম্যাচে আক্রমণের উত্তেজনায় অনেক সময় দল রক্ষণে ফাঁক রেখে দেয়। ক্রোয়েশিয়া এমন দল, যারা খুব বেশি সুযোগ না পেলেও একটি সুযোগকে গোল বানাতে পারে। সেট-পিস, কাউন্টার অ্যাটাক, দ্বিতীয় বল—এই জায়গাগুলোতে পর্তুগালকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ ফুটবলাররা জানেন কীভাবে বড় ম্যাচে ছোট ভুলের সুবিধা নিতে হয়। পর্তুগাল যদি আবেগে ভেসে অতিরিক্ত ওপরে উঠে যায়, তাহলে বিপদ আসতে পারে দ্রুত।
এই ম্যাচের আরেকটি বড় নাটকীয় দিক হলো দুই কিংবদন্তির মুখোমুখি হওয়া—ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বনাম লুকা মদ্রিচ। দুজনেই ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে অমর নাম। রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি অধ্যায়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। একসঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্মৃতি, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা, অসাধারণ ক্যারিয়ার—সবকিছুই তাঁদের ঘিরে। কিন্তু বিশ্বকাপে এবার তাঁরা প্রতিপক্ষ। একজনের স্বপ্ন বাঁচবে, অন্যজনের শেষ হয়ে যেতে পারে। এই নির্মম বাস্তবতাই নকআউট ফুটবলের সৌন্দর্য ও যন্ত্রণা।
পর্তুগালের সমর্থকদের জন্য এই রাত আবেগের। জোটার মৃত্যুবার্ষিকীতে দল মাঠে নামছে, সেটাই যেন আলাদা করে বুক ভারী করে দেয়। গ্যালারিতে থাকা পর্তুগিজ সমর্থক, ঘরে বসে থাকা লাখো দর্শক, লিভারপুলের অ্যানফিল্ডের স্মৃতিতে ভেজা মানুষ—সবাই হয়তো একই কথা ভাববেন, “আজ জোটার জন্য জিততেই হবে।” কিন্তু ফুটবল কখনও শুধু আবেগে জয় দেয় না। জয় পেতে হলে দরকার শৃঙ্খলা, কৌশল, পরিশ্রম এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।
জোটার ক্যারিয়ার ছিল লড়াইয়ের গল্প। তিনি কখনও শুধু প্রতিভার ওপর দাঁড়িয়ে থাকেননি, বরং নিজের জায়গা তৈরি করেছেন পরিশ্রম দিয়ে। সুযোগ পেলে গোল করেছেন, সুযোগ না পেলে সুযোগ তৈরি করেছেন। প্রেস করেছেন, দৌড়েছেন, দলের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করেছেন। তাঁর খেলার মধ্যে ছিল আধুনিক ফরোয়ার্ডের সব গুণ—গতি, ফিনিশিং, পজিশনাল সেন্স এবং অদম্য মানসিকতা। পর্তুগাল যদি সত্যিই তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানাতে চায়, তাহলে সেই মানসিকতাকেই মাঠে দেখাতে হবে।