Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেসির রেকর্ড ভাঙা গোল নিয়ে বিতর্ক, রেফারির সিদ্ধান্তে তুমুল প্রশ্ন

মেসির প্রথম গোল নিয়েই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অনেকের দাবি, গোলের আগে ফাউল হওয়ায় সেটি বাতিল করা উচিত ছিল। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্তকে ঘিরে উঠেছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও।

মেসির গোল নিয়ে ফের বিতর্ক! অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম গোল কি আদৌ বৈধ ছিল? রেফারির সিদ্ধান্তে প্রশ্ন, সরব পিটার স্মাইকেল

ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসির নাম মানেই অসংখ্য রেকর্ড, অবিশ্বাস্য গোল এবং সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর কিছু গোলকে ঘিরে বিতর্কও নতুন নয়। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যাচে মেসির করা প্রথম গোলকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের আড্ডা— সর্বত্রই একটাই প্রশ্ন, গোলটি কি সত্যিই বৈধ ছিল? নাকি গোলের আগেই খেলা থামিয়ে ফাউল দেওয়া উচিত ছিল?

ম্যাচে শুরুতেই পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এদিন তাঁর জন্য ভাগ্য খুব একটা সহায় হবে না। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার কেন তিনি, সেটাই আবারও প্রমাণ করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক ফিনিশে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। পরে আরও একটি গোল করে নিজের জোড়া গোলও পূর্ণ করেন।

তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে গোলের আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। অনেকের দাবি, গোল হওয়ার আগে মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড় জাভের স্লাগেরকে ফাউল করেছিলেন। সেই ফাউল থেকে বলের দখল বদল হয় এবং পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা আক্রমণ গড়ে তুলে গোল করে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) কি সেই ঘটনা খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করেছে?

কী ঘটেছিল সেই মুহূর্তে?

ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে মাঝমাঠে বলের জন্য লড়াইয়ের সময় ম্যাক অ্যালিস্টার অস্ট্রিয়ার মিডফিল্ডার জাভের স্লাগেরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড় মাটিতে পড়ে গেলেও রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আর্জেন্টিনা দ্রুত বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আক্রমণে ওঠে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাঁদিক থেকে আসা একটি নিখুঁত পাস মেসির সামনে পৌঁছে যায়। সুযোগ হাতছাড়া না করে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে পাঠান তিনি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন। কিন্তু রিপ্লে দেখার পর থেকেই বিতর্কের সূচনা।

অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতে, ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জটি ছিল স্পষ্ট ফাউল। যদি সেটি ফাউল হিসেবে ধরা হতো, তাহলে খেলা সেখানেই থেমে যেত এবং মেসির গোল হওয়ার সুযোগই তৈরি হতো না।

বিল্ড-আপ প্লে নিয়ে কেন এত আলোচনা?

আধুনিক ফুটবলে শুধু গোল হওয়ার মুহূর্ত নয়, গোলের আগে পুরো আক্রমণ তৈরির প্রক্রিয়াও বিশ্লেষণ করা হয়। VAR চালু হওয়ার পর বিশেষ করে ‘অ্যাটাকিং ফেজ অব প্লে’ বা আক্রমণ তৈরির ধাপগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কোনও গোলের আগে যদি স্পষ্ট ফাউল, হ্যান্ডবল বা নিয়মভঙ্গের ঘটনা ঘটে থাকে এবং তা সরাসরি আক্রমণ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তাহলে VAR সেই গোল বাতিল করার সুপারিশ করতে পারে।

এই কারণেই সমালোচকদের প্রশ্ন— ম্যাক অ্যালিস্টারের ট্যাকলটি যদি সত্যিই ফাউল হয়ে থাকে, তাহলে VAR কেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করল না?

পিটার স্মাইকেলের অভিযোগ

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন কিংবদন্তি গোলকিপার পিটার স্মাইকেল। সাবেক এই তারকার মতে, গোলের আগে সংঘটিত ঘটনাটি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল।

স্মাইকেলের বক্তব্য, বর্তমান ফুটবলে বিল্ড-আপ পর্যায়ে সংঘটিত ফাউলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেফারি ও VAR কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল পুরো পরিস্থিতি পুনরায় পরীক্ষা করা। তাঁর মতে, যদি একই ঘটনা অন্য কোনও দলের ক্ষেত্রে ঘটত, তাহলে হয়তো সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারত।

যদিও স্মাইকেল সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেননি, তবে তাঁর মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে রেফারিং নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্ক

ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। একদল সমর্থক দাবি করেন, গোলের আগে স্পষ্ট ফাউল হয়েছিল এবং VAR সেটি উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে মেসি ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মতে, সংঘর্ষটি ছিল স্বাভাবিক ফুটবলীয় চ্যালেঞ্জ এবং তাতে ফাউল দেওয়ার মতো কিছু ছিল না।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। কেউ বলছেন, ম্যাক অ্যালিস্টার বলের দিকে গিয়েছিলেন এবং এটি বৈধ ট্যাকল ছিল। আবার অন্যদের মতে, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা ফাউল হিসেবে বিবেচিত হতে পারত।

আলজেরিয়া ম্যাচের বিতর্কও ফিরে এল আলোচনায়

এটি অবশ্য প্রথম নয়। এর আগেও আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মেসির একটি গোল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই ম্যাচেও গোলের আগে আক্রমণ তৈরির একটি পর্যায় নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। ফলে সমালোচকদের দাবি, মেসির গোলের ক্ষেত্রে বিতর্ক যেন বারবার ফিরে আসছে।

news image
আরও খবর

যদিও মেসি নিজে এসব বিতর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই মন্তব্য করেন। তাঁর মনোযোগ সবসময় মাঠের খেলায় এবং দলের সাফল্যে।

রেফারির সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল?

ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শারীরিক সংঘর্ষই ফাউল নয়। রেফারিকে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় ঘটনাটি বৈধ চ্যালেঞ্জ নাকি নিয়মভঙ্গ। অনেক সময় একই ঘটনা একেকজন রেফারির কাছে একেকভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে।

এই ক্ষেত্রেও মূল বিতর্কের জায়গা হলো, ঘটনাটি ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড অবভিয়াস এরর’ বা স্পষ্ট ভুল ছিল কি না। VAR সাধারণত তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে ভুল বলে মনে হয়।

যদি VAR কর্মকর্তারা মনে করে থাকেন যে ঘটনাটি বিতর্কিত হলেও স্পষ্ট ফাউল নয়, তাহলে তারা রেফারিকে মনিটরে গিয়ে পুনরায় দেখার পরামর্শ না-ও দিতে পারেন।

মেসির পারফরম্যান্স চাপা পড়ছে কি?

বিতর্কের কারণে অনেকেই মনে করছেন, ম্যাচে মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্স কিছুটা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। পেনাল্টি মিস করার পরও মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে জোড়া গোল করা সহজ কাজ নয়।

ম্যাচজুড়ে তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, মুভমেন্ট এবং ফিনিশিং আবারও দেখিয়ে দিয়েছে কেন তিনি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত হন।

তবে আধুনিক ফুটবলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখন ক্যামেরার নজরদারিতে থাকে। ফলে কোনও বিতর্কিত ঘটনা দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে না।

উপসংহার

অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে লিওনেল মেসির প্রথম গোল বৈধ ছিল কি না, সেই বিতর্কের হয়তো চূড়ান্ত উত্তর সহজে মিলবে না। একদল বলছেন গোলের আগে ম্যাক অ্যালিস্টারের ট্যাকল ছিল স্পষ্ট ফাউল, অন্যরা বলছেন সেটি ছিল স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংঘর্ষ। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত— এই ঘটনা আবারও VAR-এর ভূমিকা, রেফারিংয়ের মান এবং ফুটবলের নিয়ম প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

মেসির গোলের সৌন্দর্য নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গোলের আগের কয়েক সেকেন্ড। আর সেই কারণেই ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় তারকাকে ঘিরে বিতর্কের আগুন আবারও জ্বলে উঠেছে।

বিতর্ক যতই থাকুক না কেন, ফুটবলে রেফারির সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তবে প্রযুক্তির যুগে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্লেষণের মুখে পড়ে। VAR চালু হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত কমিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থেকেই যাচ্ছে। মেসির গোল ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গোলের আগে ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জটি হয়তো খুব বেশি কঠোর ছিল না, কিন্তু প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল কি না, সেটিও বিচার্য বিষয়। অন্যদিকে, যারা গোলটিকে সম্পূর্ণ বৈধ বলছেন, তাদের যুক্তি হলো ফুটবলে শারীরিক লড়াই স্বাভাবিক ব্যাপার এবং প্রতিটি সংস্পর্শকে ফাউল হিসেবে ধরা যায় না। তাই রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিকে ভুল বলা কঠিন।

এদিকে মেসির সমর্থকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গোলটি করার সময় আর্জেন্টিনা অধিনায়কের ফিনিশিং ছিল অসাধারণ। আক্রমণের শেষ মুহূর্তে তাঁর অবস্থান নির্বাচন, বল নিয়ন্ত্রণ এবং শট নেওয়ার দক্ষতা ছিল বিশ্বমানের। ফলে শুধুমাত্র বিল্ড-আপের একটি বিতর্কিত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে পুরো গোলের কৃতিত্বকে খাটো করা উচিত নয় বলেই মনে করেন তারা।

তবে সমালোচকদের বক্তব্যও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ আধুনিক ফুটবলে একটি গোলের আগে আক্রমণ তৈরির প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই কারণে ভবিষ্যতেও এই গোল নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। বিশেষ করে যখন পিটার স্মাইকেলের মতো কিংবদন্তি ফুটবলার প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, তখন বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মেসির গোলটি স্কোরশিটে থেকে গেলেও বিতর্কের রেশ এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। বরং এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, ফুটবলে প্রযুক্তি থাকলেও ব্যাখ্যা ও মতভেদের জায়গা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

Preview image