বিশ্বকাপের ফাইনালে পরিবর্ত ফুটবলার হিসাবে নেমে গা জোয়ারি ফুটবল খেলেছিলেন তিনি। সেই ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলেন না আর্জেন্টিনার ফুটবলার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তবে তাঁর লাল কার্ডটি ‘ডিলিট’ করে দিয়েছে ফিফা।
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়ে গেলেও তার উত্তাপ এখনও কমেনি। মাঠের ফলাফল, ফুটবলারদের আচরণ, রেফারিং এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা—সবকিছু নিয়েই চলছে আলোচনা ও বিতর্ক। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ফুটবলার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ফুটবলমহলে। ফাইনালে পরিবর্ত ফুটবলার হিসেবে মাঠে নেমে আগ্রাসী ফুটবল খেলেছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর স্পেনের কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ।
এই ঘটনার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দেশে ফিরে পারেদেস হয়তো নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দেবেন অথবা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে লেখা তাঁর দীর্ঘ বার্তায় ফাইনাল-পরবর্তী সংঘর্ষের প্রসঙ্গই উল্লেখ করা হয়নি। পরিবর্তে বিশ্বকাপের লড়াই, দেশের মানুষের প্রত্যাশা, দলের প্রচেষ্টা এবং শিরোপা জিততে না পারার কষ্টের কথাই তুলে ধরেছেন তিনি।
পারেদেসের এই নীরবতা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছে, বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন ফুটবলারের আবেগকে সম্মান করা প্রয়োজন। অন্যদিকে অনেকের বক্তব্য, মাঠে বা ম্যাচের পরে ঘটে যাওয়া কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়া পেশাদার ফুটবলারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়।
বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতার ফাইনালে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের পরিস্থিতি বদলানোর জন্য কোচেরা অনেক সময় এমন ফুটবলারকে মাঠে নামান, যিনি শারীরিক শক্তি, আগ্রাসন এবং মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারেন। পারেদেস দীর্ঘদিন ধরেই এমন একজন ফুটবলার হিসেবে পরিচিত, যিনি বলের লড়াইয়ে পিছিয়ে যান না এবং প্রতিপক্ষকে সহজে জায়গা ছেড়ে দেন না।
স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালেও পরিবর্ত ফুটবলার হিসেবে মাঠে নেমে একই ধরনের ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেন তিনি। আর্জেন্টিনা যখন ম্যাচে ফিরে আসার জন্য মরিয়া, তখন মাঝমাঠে প্রতিটি বলের জন্য লড়াই করতে দেখা যায় পারেদেসকে। তবে তাঁর খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কয়েকটি চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের সঙ্গে একাধিকবার বাকবিতণ্ডাতেও জড়িয়ে পড়েন তিনি।
ফাইনালের মতো উচ্চচাপের ম্যাচে ফুটবলারদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হওয়া নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু সেই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা খেলার সৌন্দর্য এবং খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব—দুটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। পারেদেসকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও মূলত সেখানেই।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে একদিকে স্পেনের ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস শুরু হয়, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরে নেমে আসে হতাশা। বিশ্বকাপের শিরোপার এত কাছে পৌঁছেও ব্যর্থ হওয়ার কষ্ট ফুটবলারদের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই আবেগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই দুই দলের কয়েকজন ফুটবলারের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। অভিযোগ, সেই উত্তেজনা দ্রুত ধাক্কাধাক্কি এবং সংঘর্ষে পরিণত হয়। পারেদেসকেও স্পেনের কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে দেখা যায়।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারিত ম্যাচে এমন দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের নজর কেড়েছে। সমাজমাধ্যমে ঘটনার বিভিন্ন মুহূর্ত ছড়িয়ে পড়ার পর পারেদেস এবং আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলারের আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
অনেকের প্রশ্ন, ম্যাচ হারার হতাশা থাকলেও একজন আন্তর্জাতিক ফুটবলার কি এভাবে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারেন? আবার আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, স্পেনের খেলোয়াড়দের উসকানিমূলক আচরণও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। শুধু একটি দলের ফুটবলারদের দায়ী করা উচিত নয়।
ফাইনাল-পরবর্তী ঘটনাকে ঘিরে আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। পারেদেসের নামও সেই তদন্তের আলোচনায় রয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
ফিফার তদন্তে সাধারণত ম্যাচের ভিডিও ফুটেজ, রেফারির রিপোর্ট, ম্যাচ কমিশনারের পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় বা দলের বক্তব্য খতিয়ে দেখা হয়। কোনও ফুটবলারের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, মারামারি অথবা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে ম্যাচ নির্বাসন, জরিমানা অথবা অন্য কোনও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে নিশ্চিতভাবে দোষী ঘোষণা করা উচিত নয়। ফাইনালের পরে ঠিক কী ঘটেছিল, কে প্রথমে উত্তেজনা তৈরি করেছিলেন এবং পারেদেসের ভূমিকা কতটা ছিল—এসব প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর তদন্তের ফল প্রকাশিত হলেই পাওয়া যাবে।
তার আগে পর্যন্ত সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্য এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে আলোচনা চললেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
বিশ্বকাপ অভিযান শেষে দেশে ফিরে সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন পারেদেস। সেখানে তিনি আর্জেন্টিনার মানুষ এবং দলের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে না পারার হতাশাও প্রকাশ করেছেন।
পারেদেস লিখেছেন, “ধন্যবাদ আর্জেন্টিনা! ভারী হৃদয় নিয়ে এই লেখা লিখছি। দেশ যে আনন্দের অধিকারী ছিল, তা আমরা এনে দিতে পারিনি। তবে আমার বুক গর্বে পরিপূর্ণ। আমরা নিজেদের সেরাটা দিয়েছি এবং দেশকে শীর্ষাসনে পৌঁছে দিয়েছি।”
তাঁর এই বক্তব্যে দলের প্রচেষ্টা এবং দেশের প্রতি আবেগ স্পষ্ট। বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছনো যে সহজ ছিল না, সেটিও পরোক্ষভাবে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। গোটা প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেছেন পারেদেস।
ফাইনালে হারলেও আর্জেন্টিনা যে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, সেই বিষয়টিকেই বার্তায় গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সমর্থকদের ভালোবাসা, দেশবাসীর প্রত্যাশা এবং দলের প্রতি গর্ব—এসবই ছিল তাঁর লেখার মূল বিষয়।
কিন্তু সেই দীর্ঘ বার্তায় ফাইনালের পর স্পেনের ফুটবলারদের সঙ্গে সংঘর্ষের বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না। তিনি ঘটনার ব্যাখ্যা দেননি, দুঃখপ্রকাশও করেননি। এই কারণেই তাঁর বার্তা প্রকাশের পরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পারেদেস কেন সংঘর্ষের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাননি, তার কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা।
প্রথমত, বিষয়টি নিয়ে ফিফার তদন্ত চলায় তিনি হয়তো প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তদন্তাধীন বিষয়ে ফুটবলারের বক্তব্য পরবর্তী আইনি বা শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পারেদেস হয়তো মনে করেন, ঘটনার জন্য তিনি এককভাবে দায়ী নন। ম্যাচের পরে দুই দলের একাধিক ফুটবলার উত্তেজিত ছিলেন। সে ক্ষেত্রে শুধু নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া মানে সমস্ত দায় স্বীকার করে নেওয়া—এমন ধারণাও তাঁর মধ্যে থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, সমাজমাধ্যমের বার্তাটি হয়তো শুধুমাত্র আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল। সেখানে ফাইনালের পরের বিতর্ক নয়, বরং বিশ্বকাপ অভিযান এবং দলের আবেগকেই তিনি সামনে রাখতে চেয়েছেন।
তবে কারণ যাই হোক, তাঁর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন থামছে না। একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ফুটবলারের কাছ থেকে অনেকেই আরও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশা করেছিলেন।
পারেদেসের বার্তা প্রকাশিত হওয়ার পরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মতে, একজন ফুটবলারের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার যন্ত্রণা কতটা গভীর হতে পারে, তা বাইরে থেকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছে, পারেদেস এবং তাঁর সতীর্থেরা দেশের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত শিরোপা না এলেও তাঁদের লড়াইকে সম্মান জানানো উচিত। একটি উত্তপ্ত মুহূর্তের আচরণের জন্য গোটা বিশ্বকাপ অভিযানকে ছোট করে দেখা ঠিক নয়।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, দেশের জন্য লড়াই এবং মাঠের শৃঙ্খলা—দুটি আলাদা বিষয়। শিরোপা জেতার চেষ্টা করা কোনও ফুটবলারকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে মারামারি করার অধিকার দেয় না। ভুল হয়ে থাকলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই একজন বড় খেলোয়াড়ের পরিচয়।
কেউ কেউ আরও প্রশ্ন তুলেছেন, পারেদেস যদি মনে করেন তিনি কোনও ভুল করেননি, তা হলে ঘটনাটি নিয়ে স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানাতে পারতেন। সম্পূর্ণ নীরব থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
বিশ্বকাপের ফাইনাল ফুটবলারদের জন্য শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি বহু বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন এবং দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশার চূড়ান্ত পরীক্ষা। এক মুহূর্তের ভুলে শিরোপা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। আবার একটি গোল বা একটি সফল ট্যাকল একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় নায়ক করে তুলতে পারে।
এমন ম্যাচে ফুটবলারদের উপর অস্বাভাবিক মানসিক চাপ থাকে। খেলার সময় অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রতিপক্ষের ছোট একটি মন্তব্য, ফাউল অথবা উদ্যাপনও বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।