Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নতুন রূপে দুই প্রধান, শনিবার মহারণ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের—বিশ্বকাপের পর বাঙালির ফুটবল-মন ভরবে তো?

ডুরান্ড কাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই মুখোমুখি ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। দুই দলেই এসেছে একাধিক নতুন মুখ, নতুন কোচিং পরিকল্পনা ও বদলে যাওয়া স্কোয়াড। সদ্য শেষ হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনার পর এবার নজর কলকাতা ডার্বিতে। বিশ্বমানের উত্তেজনার ছোঁয়া কি পাওয়া যাবে এই ঐতিহ্যবাহী লড়াইয়ে? সেই উত্তর মিলবে শনিবারের মহারণে।

ডুরান্ড কাপ ২০২৬: নতুন রূপে দুই প্রধান, বিশ্বকাপের পর কলকাতা ডার্বিতে ফিরবে কি সেই পুরনো উন্মাদনা?

ভারতীয় ফুটবলের নতুন মরসুম শুরু হতে চলেছে এক ঐতিহাসিক লড়াই দিয়ে। শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে উদ্বোধন হচ্ছে ডুরান্ড কাপ ২০২৬। ভারতের প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতার প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। কলকাতা ডার্বি মানেই আবেগ, ইতিহাস, গৌরব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কোটি সমর্থকের হৃদস্পন্দনের লড়াই। কিন্তু এবারের ডার্বিকে ঘিরে যেন কোথাও একটা নিরুত্তাপ পরিবেশ। প্রশ্ন উঠছে—ফুটবল বিশ্বকাপের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতীয় ফুটবলের এই বড় ম্যাচ কি আগের মতো সমর্থকদের মন জয় করতে পারবে?

বিশ্বকাপের এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের লড়াই দেখেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। উচ্চগতির খেলা, আধুনিক কৌশল, দুর্দান্ত গোল এবং নাটকীয় ম্যাচের পর ভারতীয় ফুটবলের বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। ফলে সমর্থকদের প্রত্যাশাও বদলেছে। সেই কারণেই এবারের কলকাতা ডার্বিকে ঘিরে আগের মতো উন্মাদনা চোখে পড়ছে না। টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন নেই, সামাজিক মাধ্যমেও আগের মতো উত্তেজনা নেই। অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বকাপ-পরবর্তী মানসিক তুলনার কারণেই এই পরিস্থিতি।

নতুন রূপে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান

দুই দলই নতুন মরসুমে বড় পরিবর্তন করেছে। তবে পরিবর্তনের ধরন এক নয়।

গত মরসুমের শক্তিশালী দলটির বেশিরভাগ ফুটবলারকে ধরে রাখতে পেরেছে মোহনবাগান। পাশাপাশি কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নতুন খেলোয়াড়ও যোগ দিয়েছেন। ফলে দলের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। কোচিং স্টাফও স্থিতিশীল। সেই কারণেই কাগজে-কলমে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে সবুজ-মেরুন শিবির।

অন্যদিকে, ইস্টবেঙ্গলের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। আইএসএল জয়ের পরও ক্লাবে বড়সড় রদবদল হয়েছে। নতুন কোচ, নতুন বিদেশি, নতুন পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে কার্যত নতুন দল গড়ছে লাল-হলুদ শিবির। গত মরসুমে যাঁদের হাত ধরে ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছিল, তাঁদের অনেকেই আর দলে নেই।

আইএসএল জয়ের পরও কেন এত পরিবর্তন?

মাত্র কয়েক মাস আগেই ইস্টবেঙ্গল দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আইএসএল শিরোপা জিতেছিল। সেটি ছিল ক্লাবের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্যের স্থপতি কোচ অস্কার ব্রুজোকে আর রাখা যায়নি।

ভারতীয় ফুটবলের অনিশ্চয়তা এবং ক্লাব পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তিনি আর থাকতে চাননি বলে জানা যায়। পাশাপাশি ক্লাবের বিনিয়োগকারী ইমামিও নীরবে সরে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রশাসনিক এবং আর্থিক দিক থেকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইস্টবেঙ্গল।

এই পরিস্থিতিতে নতুন কোচের অধীনে দল গড়তে সময় লাগবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মোহনবাগানের ধারাবাহিকতাই বড় শক্তি

মোহনবাগান গত কয়েক মরসুম ধরেই ভারতের অন্যতম সফল ক্লাব। তাদের স্কোয়াডে ভারতীয় এবং বিদেশি ফুটবলারদের ভারসাম্য রয়েছে। দলগত বোঝাপড়াও অনেক বেশি।

নতুন মরসুমেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইছে সবুজ-মেরুন শিবির। যেহেতু গত মরসুমের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তাই প্রথম ম্যাচ থেকেই তাদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেশি।

প্রস্তুতি কতটা?

দুই দলই মাত্র দু'সপ্তাহ আগে প্রাক-মরসুম অনুশীলন শুরু করেছে। ফলে ফুটবলারদের ম্যাচ ফিটনেস এখনও শতভাগ নয়।

ফিটনেসের ঘাটতি থাকলে ম্যাচের গতি কিছুটা কম হতে পারে। দ্বিতীয়ার্ধে ক্লান্তির প্রভাবও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন ফুটবলারদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব প্রথম ম্যাচে স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বকাপের পর ভারতীয় ফুটবলের কঠিন পরীক্ষা

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ভারতীয় ফুটবলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দর্শকদের আবার মাঠে ফিরিয়ে আনা।

ভারতের ফুটবল এখনও উন্নয়নের পথে। অবকাঠামো, প্রতিভা বিকাশ, লিগের স্থায়িত্ব, আর্থিক বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। সমর্থকদের প্রত্যাশাও এখন অনেক বেশি।

ডুরান্ড কাপ সেই প্রত্যাশা পূরণ করার একটি বড় সুযোগ।

কলকাতা ডার্বির ইতিহাস

কলকাতা ডার্বি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ম্যাচ ঘিরে আবেগ তৈরি হয়েছে। দুই ক্লাবের সমর্থকদের কাছে জয়-পরাজয় শুধুমাত্র তিন পয়েন্টের বিষয় নয়, এটি সম্মান এবং গর্বের লড়াই।

অতীতে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ, নাটকীয় গোল, লাল কার্ড এবং শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা এই ডার্বিকে বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক ক্লাব প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত করেছে।

news image
আরও খবর

এবার কেন কম উত্তেজনা?

কয়েকটি কারণ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে—

  • বিশ্বকাপের আবেশ এখনও কাটেনি।
  • আইএসএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
  • দুই দলেরই নতুন স্কোয়াড।
  • মাত্র দু'সপ্তাহের প্রস্তুতি।
  • ম্যাচ ফিটনেসের অভাব।
  • সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে।

সব মিলিয়ে আগের মতো আবেগ তৈরি হতে সময় লাগছে।

কাদের দিকে নজর থাকবে?

এই ম্যাচে নতুন বিদেশিদের পারফরম্যান্স বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি দুই দলের ভারতীয় তরুণ ফুটবলাররাও নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন।

যে দল মাঝমাঠে বলের দখল বেশি রাখবে এবং সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।

কৌশলগত লড়াই

মোহনবাগান সম্ভবত বল দখল রেখে আক্রমণ গড়তে চাইবে। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর জোর দিতে পারে।

প্রথম ২০ মিনিট ম্যাচের গতি নির্ধারণ করতে পারে। যদি কোনও দল দ্রুত গোল পেয়ে যায়, তাহলে ম্যাচ অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

সমর্থকদের ভূমিকা

যদিও টিকিট বিক্রিতে আগের মতো উন্মাদনা দেখা যায়নি, তবুও কলকাতা ডার্বি এমন একটি ম্যাচ যেখানে মাঠ ভর্তি হয়ে গেলে পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে।

যুবভারতীর গ্যালারি যদি লাল-হলুদ এবং সবুজ-মেরুন সমর্থকদের স্লোগানে মুখরিত হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।

ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ

ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য শুধু বড় ক্লাব নয়, গোটা কাঠামোর উন্নতি জরুরি।

  • যুব উন্নয়ন কর্মসূচি
  • আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা
  • দীর্ঘমেয়াদি লিগ পরিকল্পনা
  • আর্থিক স্থায়িত্ব
  • দর্শক আকর্ষণের নতুন উদ্যোগ

এই বিষয়গুলিতে ধারাবাহিক উন্নতি হলে ভারতীয় ফুটবল আরও এগিয়ে যেতে পারবে।

ম্যাচের সম্ভাব্য চিত্র

কাগজে-কলমে মোহনবাগান কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ডার্বিতে অতীতের পরিসংখ্যান অনেক সময় গুরুত্ব হারায়।

ইস্টবেঙ্গল নতুন দল হলেও তাদের মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করার প্রবল তাগিদ থাকবে। অন্যদিকে মোহনবাগান নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইবে।

ফলে ম্যাচটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

উপসংহার

ডুরান্ড কাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হিসেবে কলকাতা ডার্বির গুরুত্ব সবসময়ই আলাদা। যদিও এবারের পরিবেশ আগের মতো উত্তপ্ত নয়, তবুও মাঠে নামার পর ৯০ মিনিটেই বদলে যেতে পারে সমস্ত সমীকরণ। নতুন মরসুমে দুই ক্লাবই নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে মরিয়া। বিশ্বকাপের ঝলকানি থেকে বেরিয়ে ভারতীয় ফুটবল কি আবার সমর্থকদের মন জয় করতে পারবে? সেই উত্তর লুকিয়ে রয়েছে যুবভারতীর সবুজ ঘাসে।

ডার্বির ফলাফল যাই হোক, এই ম্যাচই নির্ধারণ করতে পারে নতুন মরসুমে দুই প্রধানের আত্মবিশ্বাস, সমর্থকদের প্রত্যাশা এবং ভারতীয় ফুটবলের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

ডুরান্ড কাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হওয়ায় এই কলকাতা ডার্বির দিকে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের ফুটবলপ্রেমীদের নজর থাকবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতীয় ফুটবলের জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনই সমর্থকদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। ফলে মাঠে দুই দলের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে নতুন মরসুমের প্রথম ছাপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ম্যাচে নিখুঁত ফুটবল দেখা না গেলেও লড়াইয়ের মানসিকতা এবং দলগত সমন্বয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। নতুন ফুটবলারদের সঙ্গে পুরনোদের বোঝাপড়া কতটা গড়ে উঠেছে, সেটিও এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, কোচদের কাছেও এই ম্যাচ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নতুন কৌশল, নতুন ফর্মেশন এবং পরিবর্তিত স্কোয়াড কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার প্রথম বাস্তব মূল্যায়ন হবে ডার্বির মঞ্চে। সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও দৃঢ়তা দেখাতে হবে দুই দলকেই। একটি ছোট ভুল কিংবা মুহূর্তের অসাবধানতাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ-পরবর্তী আবহে ভারতীয় ফুটবলের সামনে এটি একটি বড় পরীক্ষা। কলকাতা ডার্বি যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, দ্রুতগতির এবং রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপহার দিতে পারে, তবে সমর্থকদের আগ্রহ আবারও ফিরতে পারে। সেই লক্ষ্যেই নতুন মরসুমের প্রথম দিন থেকেই নিজেদের সেরাটা দিতে মরিয়া থাকবে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান।

Preview image