Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভাঙড়ের বন্ধ গ্রন্থাগার ফের চালুর দাবি, বিধানসভায় বিষয়টি তুললেন নওসাদ সিদ্দিকী

ভাঙড়ের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা গ্রন্থাগার পুনরায় চালুর দাবি বিধানসভায় তুললেন বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী। শিক্ষার্থী, পাঠক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে দ্রুত গ্রন্থাগারটি খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

ভাঙড়ের বন্ধ গ্রন্থাগার দ্রুত চালুর দাবি, বিধানসভায় সরব নওসাদ সিদ্দিকী

ভাঙড়ের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার পুনরায় চালু করার দাবি এবার উঠল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। এলাকার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, বইপ্রেমী পাঠক, প্রবীণ নাগরিক এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা তুলে ধরে ভাঙড়ের বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা গ্রন্থাগারটি দ্রুত খুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত পরিষেবা, পর্যাপ্ত বই, সংবাদপত্র, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সহায়ক সামগ্রী এবং উপযুক্ত পাঠের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

গ্রন্থাগার শুধু বই রাখার একটি ভবন নয়। একটি এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক সচেতনতা এবং বৌদ্ধিক বিকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গ্রন্থাগারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ভাঙড়ের মতো বিস্তীর্ণ এবং বহু মানুষের বসবাসপূর্ণ অঞ্চলে একটি কার্যকর গ্রন্থাগার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই গ্রন্থাগার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এলাকার বহু মানুষ শিক্ষা ও তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিধানসভায় বিষয়টি উত্থাপন করে নওসাদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, গ্রন্থাগারটি বন্ধ থাকার ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন এলাকার শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীরা। অনেক পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সব ধরনের বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন অথবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির বই কেনা সম্ভব হয় না। সেই ক্ষেত্রে একটি সরকারি বা জনসাধারণের গ্রন্থাগার তাঁদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই প্রশাসনিক জটিলতা অথবা রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কারণে কোনো গ্রন্থাগার দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা উচিত নয় বলে তিনি মনে করিয়ে দেন।

শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগারের গুরুত্ব

বর্তমান সময়ে শিক্ষার পরিধি শুধু স্কুল বা কলেজের পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা, প্রবেশিকা পরীক্ষা, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, কম্পিউটার শিক্ষা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে জানার জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অতিরিক্ত বই পড়তে হয়। অনলাইনে বহু তথ্য পাওয়া গেলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা দ্রুতগতির ইন্টারনেট পরিষেবা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি সুপরিচালিত গ্রন্থাগার সেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করতে পারে। সেখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের রেফারেন্স বই, অভিধান, বিশ্বকোষ, দৈনিক সংবাদপত্র, কর্মসংস্থান সংক্রান্ত পত্রিকা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই রাখা যায়। শিক্ষার্থীরা নিরিবিলি পরিবেশে বসে পড়াশোনা করতে পারে। একই সঙ্গে গ্রন্থাগারিকের সাহায্যে প্রয়োজনীয় বই খুঁজে পাওয়া এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশও পাওয়া সম্ভব।

ভাঙড়ের বহু ছাত্রছাত্রী কলকাতা অথবা দূরের শহরে গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পান না। তাঁদের জন্য স্থানীয় গ্রন্থাগারই হতে পারে জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে সহজ এবং সাশ্রয়ী মাধ্যম। সেই কারণে গ্রন্থাগার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শুধু একটি পরিষেবা বন্ধ থাকার বিষয় নয়; এটি বহু শিক্ষার্থীর পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

চাকরিপ্রার্থীদের সমস্যার কথা

রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা, পুলিশ, রেল, ব্যাংক, শিক্ষক নিয়োগ, ক্লার্কশিপ, সিভিল সার্ভিস এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত সংবাদপত্র ও সহায়ক বই পড়া প্রয়োজন। শহরাঞ্চলে অনেক বেসরকারি পাঠাগার বা কোচিং সেন্টারের সুবিধা থাকলেও গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় এই ধরনের সুযোগ অনেক কম।

একটি সরকারি গ্রন্থাগারে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির বই রাখা হলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা যুবক-যুবতীরা বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারেন। গ্রন্থাগারে যদি নির্দিষ্ট একটি কর্মসংস্থান বিভাগ তৈরি করা যায়, তাহলে সেখানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি, আবেদন করার নিয়ম, পরীক্ষার পাঠক্রম, পুরোনো প্রশ্নপত্র এবং প্রস্তুতির বই রাখা সম্ভব। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট পরিষেবা চালু থাকলে অনলাইনে আবেদন করতেও চাকরিপ্রার্থীদের সাহায্য করা যেতে পারে।

ভাঙড়ের বন্ধ গ্রন্থাগার পুনরায় চালু হলে এলাকার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এমন একটি শিক্ষামূলক কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু ভবনের তালা খুলে দিলেই অবশ্য উদ্দেশ্য সফল হবে না। গ্রন্থাগারটিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে এবং বর্তমান সময়ের প্রয়োজন অনুসারে পরিষেবাগুলিকে আধুনিক করতে হবে।

পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে গ্রন্থাগার

বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমশ কমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা মনোযোগ ও গভীরভাবে পড়ার ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় গ্রন্থাগার শিশু-কিশোরদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

news image
আরও খবর

গ্রন্থাগারে শিশুদের জন্য আলাদা বিভাগ, গল্পের বই, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, ছবি-সহ ইতিহাসের বই, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি এবং সহজ ভাষায় সাধারণ জ্ঞানের বই রাখা যেতে পারে। সপ্তাহে বা মাসে একদিন গল্পপাঠ, বই আলোচনা, আবৃত্তি, হাতের লেখা, প্রবন্ধ রচনা এবং কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে শিশুদের আগ্রহ আরও বাড়বে।

অভিভাবকেরাও তাঁদের সন্তানদের গ্রন্থাগারে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত হবেন, যদি সেখানে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যায়। গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে এলাকার শিশু ও তরুণদের মধ্যে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা তৈরি হতে পারে। অপরাধ, নেশা অথবা অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখতেও এই ধরনের সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতার কেন্দ্র

গ্রন্থাগারের পরিষেবা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহবধূ, প্রবীণ নাগরিক এবং সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষের কাছেও গ্রন্থাগারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, সরকারি প্রকল্প, আইন, নাগরিক অধিকার, পরিবেশ, ব্যবসা এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে সহজ ভাষায় বই ও তথ্যপত্র রাখা হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারেন।

অনেক সময় সরকারি প্রকল্পের তথ্য যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী নথি লাগবে অথবা কারা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য—এই বিষয়ে বিভ্রান্তি থাকে। গ্রন্থাগারে সরকারি প্রকল্প ও নাগরিক পরিষেবা সংক্রান্ত একটি তথ্যকেন্দ্র চালু করা গেলে মানুষ সঠিক তথ্য পেতে পারেন।

নারীদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, আইনি অধিকার এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বই ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রবীণ নাগরিকেরা সংবাদপত্র পড়া, বই নেওয়া এবং সামাজিক আলোচনার মাধ্যমে সময় কাটানোর একটি ইতিবাচক জায়গা পেতে পারেন। ফলে একটি সক্রিয় গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে গোটা এলাকার সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণ জানতে চায় মানুষ

ভাঙড়ের বাসিন্দাদের একাংশের প্রশ্ন, জনসাধারণের জন্য তৈরি একটি গ্রন্থাগার কেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকবে? ভবন সংস্কার, কর্মীর অভাব, বইয়ের ঘাটতি, প্রশাসনিক সমস্যা নাকি অন্য কোনো কারণে গ্রন্থাগারটি বন্ধ—তা স্পষ্টভাবে সাধারণ মানুষকে জানানো উচিত বলে তাঁদের মত।

কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে সেই বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। সমস্যাটি সাময়িক হলে কবে পরিষেবা স্বাভাবিক হবে, সেই সময়সীমা জানানো দরকার। ভবন বিপজ্জনক হলে দ্রুত মেরামত অথবা বিকল্প ভবনে পরিষেবা চালুর ব্যবস্থা করা উচিত। কর্মীর অভাব থাকলে অস্থায়ীভাবে হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নিয়োগ করে গ্রন্থাগারের দরজা খুলে দেওয়া যেতে পারে।

দীর্ঘদিন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। ভবন, আসবাবপত্র এবং বই যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পড়ে থাকলে সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই গ্রন্থাগারটি কী অবস্থায় রয়েছে, কত বই সংরক্ষিত আছে এবং পুনরায় চালু করতে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন—তা খতিয়ে দেখার জন্য দ্রুত প্রশাসনিক পরিদর্শনের দাবি উঠছে।

বিধানসভায় বিষয়টি ওঠার তাৎপর্য

স্থানীয় সমস্যা বিধানসভায় উত্থাপিত হলে তা বৃহত্তর প্রশাসনিক গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আসে এবং সরকারের কাছ থেকে উত্তর বা পদক্ষেপের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ভাঙড়ের গ্রন্থাগার পুনরায় চালুর দাবি বিধানসভায় তোলার ফলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাটি রাজ্যস্তরে আলোচনার সুযোগ পেয়েছে।

জনপ্রতিনিধির অন্যতম দায়িত্ব হলো এলাকার মানুষের সমস্যা যথাযথ মঞ্চে তুলে ধরা। রাস্তা, পানীয় জল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, কলেজ, পরিবহণের পাশাপাশি গ্রন্থাগারের মতো শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও সরকারকে সচেতন করা জরুরি। কারণ শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিকাঠামো কোনো এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।

Preview image