লিওনেল মেসির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপ ২০২৬ অভিযানে দারুণ সূচনা করল আর্জেন্টিনা। আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী বার্তা দিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মতোই বিশ্বকাপ ২০২৬ অভিযান শুরু করল আর্জেন্টিনা। কানসাস সিটির গ্যালারি থেকে শুরু করে শহরের রাস্তাঘাট—সবখানেই ছিল নীল-সাদা উৎসবের আবহ। সেই উৎসবকে আরও স্মরণীয় করে তুললেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। দেশের জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি করলেন দুরন্ত হ্যাটট্রিক, আর তাঁর একার জাদুতেই আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী সূচনা করল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির এমন পারফরম্যান্স শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, এটি ছিল এক কিংবদন্তির আরও একবার নিজেকে ইতিহাসের পাতায় লিখে দেওয়ার রাত।
ভারতীয় সময় ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে কানসাস সিটির মাঠে শুরু হয় আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া ম্যাচ। ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়। দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাইছিল। তবে প্রথম কয়েক মিনিটে অফসাইডের ফাঁদে পড়ে দুই দলই গোলের সুযোগ হারায়। মেসি খুব দ্রুতই বল জালে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। কিছুক্ষণ পর একই কারণে আলজেরিয়ারও একটি সম্ভাব্য গোল বাতিল হওয়ায় ম্যাচের গতি আরও বাড়ে।
প্রথমদিকে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ খুব একটা স্বাভাবিক ছন্দে ছিল না। আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা শুরু থেকেই মেসিকে ঘিরে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। দুই-তিনজন ডিফেন্ডার বারবার তাঁর চারপাশে চাপ তৈরি করছিলেন। কিন্তু মেসিকে আটকানো শুধু পরিকল্পনার বিষয় নয়, সেটি কার্যকর করাই আসল চ্যালেঞ্জ। ম্যাচের ১৭ মিনিটে সেই চ্যালেঞ্জে প্রথম বড় ধাক্কা খায় আলজেরিয়া। মেসির নিখুঁত ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় প্রথম গোল। এই গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনার খেলার ধরনে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। মাঝমাঠে বল দখল বাড়ে, পাসিংয়ে গতি আসে এবং আক্রমণভাগ আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মেসি শুধু গোল করছিলেন না, তিনি পুরো ম্যাচের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। কখন বল ধরে রাখতে হবে, কখন সতীর্থকে এগিয়ে দিতে হবে, কখন ডিফেন্সের ফাঁক খুঁজে নিজে শট নিতে হবে—প্রতিটি সিদ্ধান্তেই ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ।
আলজেরিয়া প্রথমার্ধে বেশ কিছু সময় লড়াই করার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার সংগঠিত ফুটবলের সামনে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। বিশেষ করে মেসির গতিবিধি আটকাতে গিয়ে আলজেরিয়ার ডিফেন্সের মধ্যে ফাঁক তৈরি হচ্ছিল। সেই ফাঁক ব্যবহার করেই আর্জেন্টিনা বারবার আক্রমণে ওঠে। প্রথমার্ধের শেষের দিকে আলজেরিয়া কিছুটা বল দখল বাড়ালেও গোলের সামনে তারা তেমন বিপজ্জনক হতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে আরও আত্মবিশ্বাসী আর্জেন্টিনা। প্রথম গোলের পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার হাতে চলে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ার্ধে মেসির পারফরম্যান্স আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ম্যাচের ৬০ মিনিটে তিনি করেন দ্বিতীয় গোল। এই গোলের পর কানসাস সিটির গ্যালারিতে নীল-সাদা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা তখন বুঝে গিয়েছিলেন, দল শুধু জয়ের পথে নয়, অধিনায়কও হয়তো আজ বড় কিছু করতে চলেছেন।
দ্বিতীয় গোলের পর আলজেরিয়া রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটাই তাদের জন্য আরও বিপদ ডেকে আনে। আর্জেন্টিনার দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক ও মেসির পজিশন নেওয়ার ক্ষমতা আলজেরিয়ার রক্ষণকে বারবার বিভ্রান্ত করে। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মেসি নিজের তৃতীয় গোলটি করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক হিসেবে এই পারফরম্যান্স ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে মেসি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোজের ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই দেখা যায়, যখন একজন খেলোয়াড় একই ম্যাচে দলকে জয় এনে দেন, ব্যক্তিগত মাইলস্টোন স্পর্শ করেন এবং একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক অনন্য রেকর্ডের দোরগোড়ায় পৌঁছে যান। ৩৮ বছর বয়সেও মেসির এমন ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, তিনি শুধু অতীতের কিংবদন্তি নন, বর্তমানেরও অন্যতম সেরা শক্তি।
মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ায় এই ম্যাচের আবেগ ছিল আরও আলাদা। আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ পথচলায় তিনি অসংখ্য সাফল্য, হতাশা, সমালোচনা ও গৌরবের সাক্ষী। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায় শেষ। কিন্তু কানসাস সিটির রাত দেখিয়ে দিল, মেসির গল্প এখনও শেষ হয়নি। বরং তিনি যেন আরও একবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দিলেন—বড় মঞ্চে বড় খেলোয়াড়রাই পার্থক্য গড়ে দেন।
আর্জেন্টিনার জন্য এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করার চাপ সবসময়ই বেশি থাকে। প্রতিটি প্রতিপক্ষ আলাদা উৎসাহ নিয়ে মাঠে নামে, কারণ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানো যে কোনও দলের জন্য বড় সাফল্য। সেই চাপ সামলে প্রথম ম্যাচেই ৩-০ গোলের জয় আর্জেন্টিনাকে মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখবে। বিশেষ করে মেসির ফর্ম দলের আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
আলজেরিয়ার জন্য ম্যাচটি হতাশাজনক হলেও তারা শুরুতে লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়েছিল। প্রথম কয়েক মিনিটে তাদের গতি ও প্রেসিং আর্জেন্টিনাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তবে বড় ম্যাচে ছোট ভুলের মূল্য যে কত বড় হতে পারে, সেটাই এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে। মেসির মতো খেলোয়াড়ের সামনে এক ইঞ্চি জায়গা দিলেও তা গোলের সুযোগে পরিণত হতে পারে। আলজেরিয়া সেই ভুলের শাস্তিই পেয়েছে।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগও এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আলজেরিয়া মাঝে মাঝে দ্রুত আক্রমণে উঠলেও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডাররা শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। গোলরক্ষকও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে এই ম্যাচের আলো নিঃসন্দেহে মেসির উপরেই ছিল। তাঁর পায়ে বল এলেই গ্যালারিতে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল। প্রতিটি টাচ, প্রতিটি পাস, প্রতিটি মুভ যেন দর্শকদের প্রত্যাশা বাড়াচ্ছিল।
মেসির খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর সরলতা। তিনি অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করেন না। খুব কম স্পর্শে বল এগিয়ে দেন, সঠিক সময়ে গতি বাড়ান এবং সুযোগ পেলে নিখুঁত শট নেন। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি গোলেই সেই পরিণত ফুটবলবোধের পরিচয় মিলেছে। বয়স বাড়লেও তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মাঠ পড়ার দক্ষতা এবং গোলের সামনে ঠান্ডা মাথা এখনও একই রকম ধারালো।
এই জয়ের পর গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা বাড়তি সুবিধা পাবে। প্রথম ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় মানে শুধু পয়েন্ট নয়, গোল পার্থক্যেও সুবিধা। বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে প্রতিটি গোলের গুরুত্ব থাকে। আর্জেন্টিনা সেই দিক থেকেও সফল শুরু করল। তবে সামনে আরও কঠিন ম্যাচ অপেক্ষা করছে। তাই কোচ লিওনেল স্কালোনির দলকে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না।
স্কালোনির পরিকল্পনাতেও এই ম্যাচে পরিণত ভাবনা দেখা গেছে। তিনি জানতেন, মেসিকে কেন্দ্র করে আক্রমণ সাজাতে হবে, কিন্তু পুরো দলকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে। মাঝমাঠে ধৈর্য, উইং দিয়ে গতি এবং সামনে মেসির স্বাধীনতা—এই তিনের সমন্বয়েই আর্জেন্টিনা ম্যাচটি নিজেদের দিকে টেনে নেয়। প্রথম ১৫ মিনিটের চাপ কাটিয়ে ওঠার পর দল ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।
সমর্থকদের কাছে এই ম্যাচ ছিল আবেগের। মেসির ২০০তম ম্যাচ, বিশ্বকাপের শুরু, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের চাপ—সব মিলিয়ে এটি সাধারণ গ্রুপ ম্যাচ ছিল না। কানসাস সিটির গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার পতাকা, মেসির জার্সি এবং সমর্থকদের গান পুরো পরিবেশকে উৎসবে পরিণত করেছিল। মাঠের বাইরে শহরের রাস্তাতেও সেই উৎসবের রেশ ছিল। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে এই জয় অনেক দিন মনে থাকবে।
মেসির ক্যারিয়ারে এমন অনেক রাত এসেছে, যেখানে তিনি একাই ম্যাচের গল্প লিখেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শুরুতেই এমন হ্যাটট্রিক তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে প্রথম গোল করা তরুণ মেসি থেকে ২০২৬ সালে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা অভিজ্ঞ অধিনায়ক—এই যাত্রা ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য গল্প।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে বয়স, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার এমন মিশ্রণ খুব কম দেখা যায়। মেসি দেখালেন, গতি কমলেও ফুটবল মস্তিষ্ক কখনও পুরনো হয় না। তিনি এখন আগের মতো প্রতিটি মুহূর্তে দৌড়ে ম্যাচ জেতান না, বরং সঠিক মুহূর্তে সঠিক জায়গায় থেকে প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেন। এটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
এই জয়ের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই আরও বেড়ে যাবে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার লক্ষ্য শিরোপা ধরে রাখা। বিশ্বকাপে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু প্রথম ম্যাচে এমন পারফরম্যান্স দেখিয়ে আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিল, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি, ট্রফির লড়াইয়ে আবারও বড় দাবিদার।
তবে দীর্ঘ টুর্নামেন্টে শুধু মেসির উপর নির্ভর করলে চলবে না। অন্য খেলোয়াড়দেরও ধারাবাহিকভাবে অবদান রাখতে হবে। মাঝমাঠকে আরও স্থির হতে হবে, রক্ষণকে একই মনোযোগ ধরে রাখতে হবে এবং আক্রমণভাগে মেসির সঙ্গে বাকিদেরও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। প্রথম ম্যাচে মেসি সব আলো কেড়ে নিলেও দলীয় ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বড় শক্তি হতে পারে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের এই জয় আর্জেন্টিনার জন্য নিখুঁত সূচনা। ম্যাচের ফল, মেসির হ্যাটট্রিক, ২০০তম ম্যাচের আবেগ এবং বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড স্পর্শ—সব মিলিয়ে এটি ছিল ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক ঐতিহাসিক রাত। মেসি আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে তাঁর নামের পাশে এখনও বিস্ময়চিহ্ন বসে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শুরুতেই আর্জেন্টিনা এবং মেসি ফুটবল দুনিয়াকে বড় বার্তা দিল। চ্যাম্পিয়নরা এখনও ক্ষুধার্ত, অধিনায়ক এখনও জাদুকর, আর নীল-সাদা স্বপ্ন এখনও জীবন্ত। কানসাস সিটির রাত তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয়ের রাত নয়, এটি ছিল মেসির মহাকাব্যের আরও এক সোনালি অধ্যায়।