বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের গতিবিধি বদলাবে, ২০২০ সালের একটি সমীক্ষাতেই সেই পূর্বাভাস করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তরঙ্গের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।শান্ত, ধীর, স্থির সমুদ্র। ছোট ছোট ঢেউ খেলে বেড়াচ্ছে তার বুকে। আচমকা ছন্দপতন! আচমকা সেই শান্ত সমুদ্রের গর্ভ ঠেলে উথলে উঠল রাক্ষুসে ঢেউ। জল উঠে গেল ৫৮ ফুট পর্যন্ত!
বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ধরনের ঢেউকে বলা হয় ‘রোগ (রাক্ষুসে) ওয়েভ’। সাধারণত, সমুদ্রের কোনও ঢেউ আপাত কারণ ছাড়া হঠাৎ করে আশপাশের ঢেউগুলির চেয়ে দ্বিগুণ বা তার বেশি উচ্চতায় উঠে গেলে তাকে রাক্ষুসে ঢেউয়ের তকমা দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম এই ধরনের ঢেউ চোখে পড়েছিল। ২০২০ সালে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উপকূলে ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের কাছে ৫৮ ফুটের রাক্ষুসে ঢেউ বিজ্ঞানীদের খাতায় নথিভুক্ত হয়। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর সম্প্রতি একেই সবচেয়ে শক্তিশালী রাক্ষুসে ঢেউ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চার তলা বাড়ির সমান উচ্চতায় উঠেছিল ওই ঢেউ। এটা সর্বোচ্চ না হলেও সবচেয়ে শক্তিশালী।
ব্রিটিশ কলম্বিয়া উপকূলের ঘটনাকে বিজ্ঞানীদের একাংশ ‘অসামান্য’ এবং ‘অত্যন্ত বিস্ময়কর’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, রাক্ষুসে ঢেউ অনেক আসে। তবে এই ধরনের ঢেউ ১৩০০ বছরে এক বার দেখা যায়। তাই ৫৮ ফুটের ঢেউটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সমুদ্রের পারের দিকে সাধারণত ঢেউয়ের লম্ফঝম্ফ বেশি থাকে। মাঝ-সমুদ্র থাকে শান্ত। প্রাকৃতিক কোনও দুর্যোগ, ঝড়বৃষ্টি, সাইক্লোন না এলে দূরের সমুদ্র অস্থির হয় না। বহু বছর ধরে তাই রাক্ষুসে ঢেউয়ের তত্ত্ব বিশ্বাসই করত না মানুষ। এই ধরনের ঢেউকে নাবিকদের কল্পনামিশ্রিত কাহিনি বলে অবজ্ঞা করা হয়েছে বার বার। ১৯৯৫ সালে সেই ভুল ভাঙে। প্রথম বার এমন একটি আকস্মিক রাক্ষুসে ঢেউ নরওয়ের কাছে সমুদ্রে তৈল খনন প্ল্যাটফর্মে ধাক্কা মেরেছিল। উপকূল থেকে তার দূরত্ব ছিল ১৬০ কিলোমিটার। জল উঠেছিল ৮৫ ফুট পর্যন্ত। বিজ্ঞানীদের ঢেউ সংক্রান্ত সমস্ত ধারণা খান খান হয়ে গিয়েছিল সে দিন। ঢেউয়ের এই চরিত্র আগে জানা যায়নি। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ডজনখানেক রাক্ষুসে ঢেউ নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু সমুদ্রে নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে হ্রদের জলেও ঢেউয়ের এই চরিত্রের প্রমাণ মিলেছে। তবে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার মতো ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
নরওয়ের ঢেউয়ের উচ্চতা বেশি হলেও ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ৫৮ ফুটের ঢেউটিকে কেন সবচেয়ে শক্তিশালী বলা হচ্ছে? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, সর্বোচ্চ না হলেও আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় ব্রিটিশ কলম্বিয়া সংলগ্ন সমুদ্রের ওই রাক্ষুসে ঢেউয়ের আপেক্ষিক আকার ছিল অভূতপূর্ব। অন্যান্য ঢেউয়ের চেয়ে প্রায় তিন গুণ উঁচুতে উঠে গিয়েছিল নির্দিষ্ট ওই তরঙ্গের জল। সেই কারণে তাকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমুদ্রের বুকে কী ভাবে কখন রাক্ষুসে ঢেউ তৈরি হয়, বিজ্ঞানীদের কাছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তাঁরা আশাবাদী, আগামী দিনে এই রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। আগে থেকেই এই ধরনের ঢেউয়ের পূর্বাভাস সম্ভব হবে। তা যদি হয়, তবে সরাসরি ঘটনার সময়েই ঢেউয়ের উচ্চতা মাপা যাবে। আরও স্পষ্ট হবে ধারণা। তা ছাড়া, ঢেউয়ের পূর্বাভাস পেলে নাবিকদেরও সুবিধা হবে। মেরিনল্যাব্সের সিইও তথা সমুদ্র বিশেষজ্ঞ স্কট বিটি বলেন, ‘‘রাক্ষুসে ঢেউয়ের আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত চরিত্র, জলের তীব্র শক্তি যে কোনও সামুদ্রিক অভিযানের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। সাধারণ মানুষের বিপদও ডেকে আনতে পারে।’’
ঢেউ সংক্রান্ত বহু বছরের ‘মিথ’ ভেঙে যাওয়ায় অতীতে সমুদ্রে একাধিক অঘটনের ব্যাখ্যা মিলতে পারে, মত বিজ্ঞানীদের একাংশের। মনে করা হচ্ছে, সত্তরের দশকে হারিয়ে যাওয়া জাহাজ কিংবা মৎস্যজীবীদের নৌকা, যে সমস্ত অন্তর্ধানের কোনও ব্যাখ্যা বা প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি, সেগুলি সমুদ্রের মাঝে এই ধরনের রাক্ষুসে ঢেউয়ের কবলে পড়ে থাকতে পারে। বিজ্ঞানের নজরদারি (ট্র্যাকিং) না-থাকায় তার কোনও রেকর্ড নেই।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের গতিবিধি বদলাবে, ২০২০ সালের একটি সমীক্ষাতেই সেই পূর্বাভাস করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তরঙ্গের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে ব্রিটিশ কলম্বিয়া বা নরওয়ের রাক্ষুসে ঢেউয়ের রেকর্ডও ভেঙে যাবে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দাবি, এত দিন যা ভাবা হত, ভবিষ্যতে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা তার চেয়ে চার গুণ বেশি হতে পারে।
সমুদ্র বরাবরই মানুষের কাছে রহস্যে মোড়া। তার গভীরতা, তার স্রোত, আর ঢেউয়ের আচরণ—সব মিলিয়ে সমুদ্র যেন এক অদৃশ্য শক্তির আধার। সেই রহস্যেরই অন্যতম ভয়ংকর ও বিস্ময়কর প্রকাশ হল রাক্ষুসে ঢেউ বা বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় রোগ ওয়েভ (Rogue Wave)। এই ঢেউ কোনও ঝড়, সাইক্লোন বা ভূমিকম্প ছাড়াই হঠাৎ জন্ম নেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের স্বাভাবিক ঢেউগুলিকে ছাপিয়ে দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ উচ্চতায় উঠে ভয়াবহ আঘাত হানতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের ঢেউকে নাবিকদের কল্পকাহিনি বলেই মনে করা হত। সমুদ্রযাত্রার সময় বহু নাবিক দাবি করতেন, মাঝ-সমুদ্রে আচমকা পাহাড়ের মতো জল উঠে এসে জাহাজে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে সেই সব গল্পের কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছিল না। কারণ, প্রচলিত তরঙ্গতত্ত্ব অনুযায়ী মাঝ-সমুদ্রে এত বড় ঢেউ তৈরি হওয়ার কথা নয়। ফলে নাবিকদের বর্ণনাকে অতিরঞ্জন বা ভ্রম বলেই ধরে নেওয়া হত।
এই ধারণায় আমূল পরিবর্তন আসে ১৯৯৫ সালে। নরওয়ের উপকূল থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে উত্তর সাগরে অবস্থিত একটি তৈলখনন প্ল্যাটফর্মে আচমকা প্রায় ৮৫ ফুট উচ্চতার এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে। এই ঢেউয়ের বিশেষত্ব ছিল, এর আগে সেখানে কোনও ঝড় বা অশান্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছিল না। সেই ঘটনার সময় প্ল্যাটফর্মে থাকা উন্নত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ঢেউটির উচ্চতা ও শক্তি পরিমাপ করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে দেয়—রাক্ষুসে ঢেউ সত্যিই অস্তিত্বশীল।
এর পরবর্তী বছরগুলিতে বিশ্বের নানা প্রান্তে আরও কয়েকটি রাক্ষুসে ঢেউ নথিভুক্ত হয়েছে। তবে ২০২০ সালে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উপকূলে ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের কাছে ৫৮ ফুট উচ্চতার যে রাক্ষুসে ঢেউ ধরা পড়ে, তা বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তোলে। উচ্চতার নিরিখে এটি সর্বোচ্চ না হলেও, আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় এর আপেক্ষিক আকার ছিল প্রায় তিন গুণ। অর্থাৎ, স্বাভাবিক ঢেউ যেখানে ২০ ফুটের কাছাকাছি, সেখানে একটিমাত্র ঢেউ হঠাৎ করে প্রায় চার তলা বাড়ির সমান উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল। এই কারণেই একে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী রাক্ষুসে ঢেউ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এমন ঢেউ ১৩০০ বছরে এক বার দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ঘটনাকে তাঁরা ‘অসামান্য’ ও ‘অত্যন্ত বিস্ময়কর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের ঢেউ কী ভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা, একাধিক তরঙ্গের গতিপথ ও ফেজ একসঙ্গে মিলে গেলে হঠাৎ করে শক্তির সঞ্চয় ঘটে এবং তৈরি হয় রাক্ষুসে ঢেউ। আবার কারও মতে, সমুদ্রস্রোত, তলদেশের গঠন এবং বাতাসের গতিবিধির জটিল মিথস্ক্রিয়াই এর জন্য দায়ী।
শুধু সমুদ্র নয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে—কিছু কিছু ক্ষেত্রে হ্রদেও রাক্ষুসে ঢেউয়ের মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। যদিও সেগুলির উচ্চতা তুলনামূলক কম, তবু নৌকা বা ছোট জাহাজের পক্ষে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রাক্ষুসে ঢেউয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হল এর আকস্মিকতা। কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই এটি তৈরি হয় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। ফলে জাহাজ, তেলখনন প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামুদ্রিক গবেষণার কাজে যুক্ত মানুষদের পক্ষে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে না। মেরিনল্যাব্সের সিইও ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞ স্কট বিটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই ধরনের ঢেউ যে কোনও সামুদ্রিক অভিযানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনও বিপন্ন হতে পারে।
এই আবিষ্কার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে। অতীতে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বহু জাহাজ ও মৎস্যজীবীদের নৌকার কোনও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, সত্তরের দশক বা তার আগের অনেক দুর্ঘটনার নেপথ্যে হয়তো এই রাক্ষুসে ঢেউই দায়ী ছিল। তখন উন্নত নজরদারি বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলির কোনও রেকর্ড রাখা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এই প্রসঙ্গে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে তরঙ্গের উচ্চতা ভবিষ্যতে বাড়বে। সাম্প্রতিক, অর্থাৎ ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে—আগামী দিনে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর অর্থ, রাক্ষুসে ঢেউয়ের সংখ্যা ও শক্তি দু’টিই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা এখন জোর দিচ্ছেন উন্নত সেন্সর, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার উপর। লক্ষ্য একটাই—রাক্ষুসে ঢেউ কখন এবং কোথায় তৈরি হতে পারে, তার আগাম সংকেত পাওয়া। যদি তা সম্ভব হয়, তবে নাবিক, জাহাজ সংস্থা এবং উপকূলবর্তী মানুষের প্রাণরক্ষা অনেকটাই নিশ্চিত করা যাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাক্ষুসে ঢেউ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং মানবসভ্যতার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। সমুদ্র যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়ংকর। আর তার এই ভয়ংকর রূপকে বোঝা ও মোকাবিলা করাই আগামী দিনের সমুদ্রবিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।