অভিনেত্রী সোহিনী সরকার বিতর্কের জবাব দিয়ে জানালেন, মাতৃত্ব তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তবে সময় ও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।সোহিনী সরকার স্পষ্ট করলেন, দেশের প্রেক্ষাপটে মন্তব্যটি বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে।তিনি আরও জানিয়েছেন, ইচ্ছে থাকলেও সময়ের উপর নির্ভর করে মাতৃত্ব, প্রয়োজনে দত্তক নিতেও প্রস্তুত।সোহিনী বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল মন্তব্যের মূল বিষয়।
২০২৪ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সোহিনী সরকার এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন। ‘আরজি কর কাণ্ড’-এর সময় তিনি দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার সদ্য বিয়ে হয়েছে। আমি বললাম, মা হব? কোন দেশে মা হব? আমি চাই না আমার সন্তানকে এ রকম দেশে রেখে যেতে।”
এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যকেই ঘিরে শুরু হয় সামাজিক মিডিয়ায় এবং সংবাদমাধ্যমে ঝড়। অনেকেই বিকৃতভাবে প্রচার করেন যে, সোহিনী সরকার বলেছেন, “এই রাজ্যে মা হব না।” এর ফলে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে, এবং বিষয়টি রাজনৈতিক রঙও নিতে থাকে। বিভিন্ন মহল থেকে অভিনেত্রীর প্রতি কটাক্ষ এবং সমালোচনা ছুটে আসে
সোহিনী সরকারের মন্তব্য মূলত দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রতি একটি উদ্বেগ প্রকাশ। তিনি সরাসরি কোন রাজ্য বা রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করেননি, বরং এক গভীর চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন—যেখানে তিনি নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন। তবে মিডিয়া এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাঁর কথাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। “এই রাজ্যে মা হব না”—এ ধরনের শিরোনামে সংবাদ এবং পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা মূল বক্তব্যকে ভিন্নভাবে তুলে ধরে।
সম্প্রতি আবারও বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছেন তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, “যাঁরা সারাক্ষণ শাসকদলকে কটাক্ষ করেন, দেব তাঁদের মধ্যেই প্রতিভা খুঁজে পাচ্ছেন! সোহিনী বলেছিলেন, এই রাজ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার উপযুক্ত নয়—পরবর্তীতে দেব ওঁকে ছবিতে নিলেন।” এই মন্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সোহিনী সরকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “আমি কি পাগল যে এমন কথা বলব? আমি বলেছিলাম দুর্নীতি, অনিশ্চয়তা আর রাজনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শুধু বাংলা নয়, গোটা দেশের প্রেক্ষাপটেই বলেছিলাম। বিকৃতভাবে লিখে ছড়িয়ে দেওয়া হল আমার কথা।”
তিনি আরও যোগ করেন, মাতৃত্ব তাঁর কাছে এক “বোধ”—যা শুধুই ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়, বরং সমাজ ও দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। “আমার বয়সে আজ চাইলেই কাল মা হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে আমি অবশ্যই মা হতে চাই। সময় জানি না, কিন্তু ইচ্ছে আছে। প্রয়োজনে দত্তক নিতেও প্রস্তুত।”
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সোহিনী সরকার মাতৃত্বকে ব্যক্তিগত ইচ্ছার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাঁর বক্তব্যকে শুধুমাত্র রাজ্যের সমালোচনা হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের জন্ম নেওয়া মানেই বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। সোহিনী সরকার এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান অবস্থায় সন্তান জন্ম দেওয়া মানে তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া।
সোহিনী বলেন, “আমি চাই না আমার সন্তানকে এমন দেশে রেখে যেতে যেখানে দুর্নীতি, অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে নতুন প্রজন্মের সুযোগ সীমিত।” এটি শুধু মাতৃত্বের প্রসঙ্গ নয়, বরং সমাজ ও দেশের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সোহিনী সরকারের মন্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কুণাল ঘোষের মন্তব্য সেই প্রেক্ষাপটেরই উদাহরণ। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ব্যক্তিগত বক্তব্যকে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরিত করা সহজ। সোহিনী নিজেও এই বিষয়টি বুঝে গেছেন এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ।
অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মাতৃত্বের প্রতি তাঁর ইচ্ছে রয়েছে। যদিও তিনি জানান যে, বয়স এবং সময়ের কারণে এখনই তা সম্ভব নয়, কিন্তু তিনি মা হওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং প্রয়োজনে দত্তকও নিতে প্রস্তুত। এটি দেখায় যে, মাতৃত্ব কেবল শারীরিক বিষয় নয়, বরং মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রস্তুতির সমন্বয়।
এই বিতর্ক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে নিয়ে আসে—মিডিয়ার দায়িত্ব। একটি বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলে তা সহজেই সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সোহিনী সরকারের ক্ষেত্রে, মূল বক্তব্যের গভীরতা এবং প্রেক্ষাপট হারিয়ে গেছে। এর ফলে একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত মতামতকে জনসমক্ষে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
সোহিনী সরকারের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা এবং সমর্থন দুই-ই হয়েছে। কিছু মানুষ মনে করেছেন যে, তিনি দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যধিক নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। আবার অনেকেই দেখেছেন যে, তিনি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছার জায়গা স্পষ্ট রেখেছেন।
এই বিতর্ক আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দেয়। একজন সাধারণ ব্যক্তি বা অভিনেত্রী যখন সমাজের সমস্যার প্রতি সচেতনতা প্রকাশ করেন, তখন সেটি বিকৃতভাবে প্রচার করা হলে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক মানসিকতা প্রভাবিত হতে পারে। সোহিনী সরকারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সামাজিক দায়বোধ এবং দেশের পরিস্থিতি—এই তিনটি উপাদানই কখনো কখনো সংঘর্ষে আসে।
সোহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মাতৃত্ব তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মা হওয়ার জন্য সময় এবং সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। প্রয়োজনে দত্তক নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন, যা দেখায় যে, তিনি মাতৃত্বকে কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিক এবং সামাজিক দিক থেকেও বিবেচনা করছেন। এটি নতুন প্রজন্ম এবং সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধকেও প্রতিফলিত করে।
সোহিনী সরকারের বিতর্ক আমাদের শেখায় যে, একজন ব্যক্তি কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার ভিত্তিতে মন্তব্য করলে তা বিকৃতভাবে বোঝা যেতে পারে। সোহিনী স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর বক্তব্য দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে। মাতৃত্বের ইচ্ছা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই ইচ্ছা সমাজ ও দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।
এই বিতর্ক শুধু সোহিনী সরকারকে নয়, বরং পুরো সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—মিডিয়া এবং জনমত কখনো কখনো বক্তব্যের প্রেক্ষাপটকে বিকৃত করে উপস্থাপন করতে পারে। তাই আমাদের উচিত মন্তব্যের পেছনের মূল বিষয়টি বোঝা এবং ব্যক্তির বক্তব্যকে সঠিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা।
সোহিনী সরকার স্পষ্ট করেছেন যে, মাতৃত্ব তাঁর কাছে একটি বোধ, যা সময়, পরিস্থিতি এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এই অবস্থান আমাদের শেখায় যে, ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং সামাজিক দায়বোধের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।