শীত মানেই চড়ুইভাতি আর হইহই করে ঘুরে বেড়ানো। এ বার কলকাতার আশপাশের জেলাগুলিতে পা রাখুন যেখানে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মন্দির ও সুপ্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন। নরম রোদে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে নিন অতীতের গল্প।
বছরভর সূর্যের চোখরাঙানি। রোদ যেন দম ফেলতে দেয় না। সকাল থেকে সন্ধে—ঘাম, ক্লান্তি আর অবসাদ। তার মধ্যেই ক’টা মাস আসে, যখন প্রকৃতি নিজেই যেন বলে এ বার একটু থামো, বেরিয়ে পড়ো, ঘুরে এসো। রোদের তেজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হিমেল পরশ ছুঁয়ে যায় শরীর। শীত মানেই নীল আকাশ, মিঠেকড়া রোদ্দুর, হালকা হাওয়া আর অবাধ স্বাধীনতা। শীত মানেই বনভোজন, দল বেঁধে ঘোরা, মিউজ়িয়ামে ঢুকে ইতিহাস দেখা, গ্রাম-ক্ষেতে চষে বেড়ানো, আর অজানা অতীতের গল্প খুঁজে পাওয়া।
শীত এসে গিয়েছে। ছুটির দিন মানেই কি ঘরে বসে মোবাইল স্ক্রল করা? নাকি একটু সময় বের করে অতীতের পথে হাঁটা? এ বার চলুন ইতিহাসের সন্ধানে। কলকাতার আশপাশেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে এক দিনে গিয়ে ফিরে আসা যায়, আবার মন ভরে যায় বহু শতাব্দীর গল্পে। মন্দির, দুর্গ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে শীতের ছুটিতে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য রইল কয়েকটি বিশেষ ঠিকানা।
হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার নাম শুনলেই প্রথমে যে বিষয়টি মনে আসে, তা হল রথযাত্রা। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই রথ আজও মানুষের আবেগ জড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু গুপ্তিপাড়া যে শুধু রথের শহর নয়, বরং প্রাচীন মন্দির ও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র—সে কথা অনেকেরই অজানা।
কলকাতা থেকে গুপ্তিপাড়া পৌঁছনো বেশ সহজ। হাওড়া-কাটোয়া লোকাল ট্রেনে চেপে পৌনে দু’ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। স্টেশন থেকে অটো, টোটো বা বাসে খুব সহজেই পৌঁছনো যায় দর্শনীয় স্থানগুলিতে।
গুপ্তিপাড়ার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল মঠ চত্বরের চারটি প্রাচীন মন্দির। পাঁচিলঘেরা এই বিশাল চত্বরের মধ্যেই রয়েছে বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, রামচন্দ্র মন্দির, কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির ও শ্রীচৈতন্য মন্দির। একলপ্তে চারটি মন্দির—বাংলার মন্দির স্থাপত্যে যা সত্যিই বিরল।
প্রবেশ করলেই প্রথম চোখে পড়ে বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির। মন্দিরের ভিতরের প্রবেশপথের দু’পাশে দেওয়াল ভাগ করা হয়েছে ছোট ছোট ব্লকে—প্রতিটি ব্লক প্রায় ১৬ ইঞ্চি লম্বা ও ১২ ইঞ্চি চওড়া। কোথাও ফুলের নকশা, কোথাও পৌরাণিক কাহিনি—টেরাকোটার কাজে ফুটে উঠেছে শিল্পীদের নিপুণতা। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ।
বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দিরের বাঁ দিকে রয়েছে রামচন্দ্র মন্দির এবং ডান দিকে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির ও শ্রীচৈতন্য মন্দির। শ্রীচৈতন্য মন্দিরটি এই চারটির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির তৈরি হয়েছিল নবাব আলিবর্দি খানের আমলে—যা বাংলার ইতিহাসে মুসলিম শাসন ও হিন্দু স্থাপত্যের সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
কথিত আছে, জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা হয়েছিল এই গুপ্তিপাড়াতেই। ইতিহাসের পাতায় গুপ্তিপাড়ার নাম জড়িয়ে রয়েছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনানায়ক মোহনলালের জন্মস্থান হিসেবেও। কবিয়াল ভোলা ময়রার শহর হিসেবেও গুপ্তিপাড়া এক বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
চার মন্দির দর্শন করে চাইলে বলাগড় স্টেশন হয়ে শ্রীপুর ঘুরে নেওয়া যায়। সেখানে রয়েছে দোলমঞ্চ, রাসমঞ্চ, চণ্ডীমণ্ডপ-সহ আরও বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। শীতের নরম রোদে হেঁটে হেঁটে এই মন্দিরগুলি দেখা যেন এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা।
জনবহুল শহর, ঘিঞ্জি রাস্তা, যানজট—এই সবকিছুর মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলার এক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। উত্তর ২৪ পরগনার চন্দ্রকেতুগড় সেই জায়গারই নাম।
কলকাতা থেকে চন্দ্রকেতুগড় যেতে হলে দেগঙ্গার বেড়াচাঁপা মোড়ে নামতে হয়। সেখান থেকে হাড়োয়া হয়ে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরা এলাকা। চাইলে শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকাল ধরে হাড়োয়া রোড স্টেশনেও নামা যায়। সেখান থেকে টোটো বা অটোয় সহজেই পৌঁছনো যায় গন্তব্যে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে এই এলাকায় খননকার্য শুরু হলে মৌর্য যুগের মুদ্রা পাওয়া যায়। পরে আরও খননের ফলে উদ্ধার হয় প্রাচীন ইট, তামার মুদ্রা, মূর্তি, মৃৎপাত্রের নানা নমুনা। এই সব আবিষ্কার প্রমাণ করে, চন্দ্রকেতুগড় এক সময় ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ জনপদ।
পরবর্তীকালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এই এলাকাকে সংরক্ষিত স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। বেড়াচাঁপার মোড়ে ডান-বাঁ—দুই দিকেই ছড়িয়ে রয়েছে নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এখানেই রয়েছে খনা-মিহিরের ঢিবি, যাকে ঘিরে লোককথা ও কিংবদন্তির শেষ নেই।
কথিত আছে, রাজা চন্দ্রকেতুর নাম থেকেই এই অঞ্চলের নামকরণ। ইতিহাস আর কল্পকথা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে চন্দ্রকেতুগড়ে। শীতের দিনে এই জায়গায় হাঁটলে মনে হয়, আধুনিক শহরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের পুরনো অতীত।
কলকাতা থেকে একটু দূরে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুরের কাছে গগনেশ্বর গ্রামে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুরুমবেড়া দুর্গ। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জায়গাটি শীতের গন্তব্য হিসেবেও দারুণ আকর্ষণীয়।
দুর্গের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে ল্যাটেরাইট পাথরের তৈরি খিলানসমৃদ্ধ দীর্ঘ বারান্দা। তার পর বিশাল উঠোন। উঠোনের মাঝখানে তিনটি গোলাকার গম্বুজ ও একটি বেদি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দুর্গ, আবার কাছে গেলে মন্দির-মসজিদের স্থাপত্যের ছাপও চোখে পড়ে।
এই দুর্গের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ। কেউ বলেন, ওড়িশার রাজা গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের শাসনকালে (১৪৩৮-১৪৬৯) এই স্থাপনা তৈরি হয়েছিল। আবার অনেকের মতে, এটি তৈরি হয়েছিল আওরঙ্গজেবের আমলে। ওড়িশি স্থাপত্যের সঙ্গে কাঠামোর মিল থাকলেও, মুসলিম স্থাপত্যের প্রভাবও স্পষ্ট।
আয়তাকার এই সৌধটির চার দিকে প্রায় আট ফুট প্রশস্ত খোলা বারান্দা। এবড়ো-খেবড়ো ঝামা পাথরের উপর চুন-বালির পলেস্তারা আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি মুসলিম সৈনিকদের নমাজের জন্য তৈরি হয়েছিল। আবার কারও মতে, এটি ছিল এক ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ।
নীরবতা, শীতের হাওয়া আর ইতিহাসের ভার—সব মিলিয়ে কুরুমবেড়া দুর্গে দাঁড়িয়ে সময় যেন থমকে যায়।
কুরুমবেড়া দুর্গ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ বিহার। নালন্দার সমসাময়িক এই বৌদ্ধকেন্দ্র এক সময় জ্ঞানচর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছিল।
চিনা পর্যটক হিউ-এন-সাং তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘সি-ইউ-কি’-তে এই বিহারের উল্লেখ করেছেন। এখানেই তিনি বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ও শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
এখনও পর্যন্ত ন’দফায় এখানে খননকার্য চালিয়েছে পুরাতত্ত্ব বিভাগ। প্রতিটি খননেই মিলেছে নতুন নতুন তথ্য, নতুন নতুন নিদর্শন। বৌদ্ধ স্তূপ, বিহারের ধ্বংসাবশেষ, মূর্তি, ইটের কাঠামো—সব মিলিয়ে মোগলমারি এক বিস্ময়কর ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়।
শীতের বিকেলে মোগলমারির খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাংলার ইতিহাস শুধু মন্দির আর দুর্গেই সীমাবদ্ধ নয়। বৌদ্ধ ধর্ম, শিক্ষা আর দর্শনের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এই মাটি।
শীত মানেই শুধু পিকনিক বা চড়ুইভাতি নয়। শীত মানেই প্রকৃতির সঙ্গে একটু ধীর পায়ে হাঁটা, নিজের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অতীতকে ছুঁয়ে দেখার এক অনন্য সুযোগ। বছরের বেশির ভাগ সময় যে রোদ চোখ রাঙায়, শীতকালে সেই রোদই হয়ে ওঠে মিঠেকড়া ও স্নিগ্ধ। নীল আকাশের নিচে হিমেল হাওয়ার পরশে মন তখন নিজেই বলে ওঠে—এ বার বেরিয়ে পড়ি।
কলকাতার কাছাকাছি এমন বহু জায়গা রয়েছে, যেখানে এক দিনের ভ্রমণেই ইতিহাসের বহু অধ্যায় চোখের সামনে খুলে যায়। খুব দূরে যেতে হয় না, বড় খরচেরও দরকার নেই। একটু ইচ্ছে আর সামান্য পরিকল্পনাই যথেষ্ট। গুপ্তিপাড়ার প্রাচীন মন্দিরগুলি দেখলে বোঝা যায়, কী ভাবে ধর্ম, শিল্প ও ইতিহাস একসঙ্গে পথ চলেছে। টেরাকোটার দেওয়ালে খোদাই করা পৌরাণিক কাহিনি শুধু শিল্প নয়, সেই সময়ের সমাজ ও বিশ্বাসের কথাও বলে।
চন্দ্রকেতুগড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, আধুনিক শহরের ঠিক পাশেই ঘুমিয়ে আছে এক প্রাচীন সভ্যতা। ভাঙা ইট, মুদ্রা আর মৃৎপাত্রের টুকরোয় ধরা পড়ে মানুষের বসবাস, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির চিহ্ন। এখানে ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, মাটির গভীর থেকে উঠে আসা বাস্তব সাক্ষ্য।
কুরুমবেড়া দুর্গ আবার ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়। মন্দির না মসজিদ, দুর্গ না স্মৃতিস্তম্ভ—এই দ্বন্দ্বই জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ল্যাটেরাইট পাথরের গায়ে জমে থাকা সময়ের ক্ষতচিহ্ন দেখলে বোঝা যায়, কত শাসক, কত সংস্কৃতি এই বাংলার মাটির উপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে।
আর মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার বাংলার ইতিহাসে এক অন্য মাত্রা যোগ করে। বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা আর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সাক্ষ্য বহন করে এই স্থান। নালন্দার সমসাময়িক এই বিহার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এক সময় বাংলা ছিল জ্ঞান ও দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই সব জায়গায় ঘুরে দেখলে উপলব্ধি হয়, ইতিহাস কোনও দূরের বিষয় নয়। সে আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে—মন্দিরের দেওয়ালে, দুর্গের ধ্বংসাবশেষে, কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবির নীরবতায়। শীতের নরম রোদ্দুরে, হিমেল হাওয়ায় সেই ইতিহাস আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তাই এই শীতে ঘরে বসে না থেকে এক দিনের জন্য হলেও বেরিয়ে পড়ুন। ইতিহাসের পথে হাঁটুন, অতীতের গল্প শুনুন, আর বর্তমানের সঙ্গে তার যোগ খুঁজে নিন। নরম রোদ্দুর, শীতল বাতাস আর হাজার বছরের স্মৃতি—এর চেয়ে সুন্দর শীতের ভ্রমণ আর কী হতে পারে?
0+