বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও ট্রফি অধরা থাকায় রানার্স হয়েই অভিযান শেষ করেছেন লিয়োনেল মেসি। জাতীয় দলের দায়িত্ব শেষে এবার ইন্টার মায়ামির জার্সিতে ক্লাব ফুটবলে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
দেশের জার্সিতে আরও এক বার ইতিহাস গড়ার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন লিয়োনেল মেসি। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে অধিনায়ক হিসেবে টানা দ্বিতীয় বার বিশ্বসেরা হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ লড়াইয়ে স্পেনের কাছে হারতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। ফলে পর পর দু’বার অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের বিরল নজির গড়া হয়নি মেসির। ফাইনালে পৌঁছেও ট্রফি হাতে তুলতে না পারার হতাশা নিয়েই শেষ হয়েছে তাঁর এবারের আন্তর্জাতিক অভিযান।
তবে ফুটবল কখনও থেমে থাকে না। একটি প্রতিযোগিতার সমাপ্তির পরেই শুরু হয়ে যায় নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি। বিশ্বকাপের হতাশা পিছনে ফেলে এ বার আবার ক্লাব ফুটবলে মন দিয়েছেন আর্জেন্টিনার তারকা। ইন্টার মায়ামির জার্সিতে মাঠে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন তিনি। অল্প কয়েক দিনের বিশ্রামের পর মায়ামিতে ফিরে দলের অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন লিয়ো।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর প্রায় ১০ দিনের ছুটি নিয়েছিলেন মেসি। দীর্ঘ প্রতিযোগিতা, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, অধিনায়কত্বের চাপ এবং ফাইনালে হারের মানসিক ধাক্কার পর এই বিরতি তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। ছুটির সময় পরিবারের সঙ্গে নিজের জন্মস্থান রোসারিয়োতে সময় কাটান তিনি। ফুটবলের ব্যস্ততা থেকে কিছু দিনের জন্য দূরে থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছুটি কাটানোর বিভিন্ন ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছিল।
সেই সংক্ষিপ্ত বিশ্রামপর্ব শেষ। আবার পরিচিত ফুটবল মাঠে ফিরে এসেছেন মেসি। বুধবার মায়ামিতে পৌঁছন তিনি। দীর্ঘ সময় নষ্ট না করে পরের দিনই ইন্টার মায়ামির অনুশীলনে নেমে পড়েন। বিশ্বকাপ ফাইনালের হতাশা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। কিন্তু অনুশীলনের প্রকাশিত ভিডিয়োয় মেসিকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি আপাতত অতীতের ব্যর্থতা সরিয়ে রেখে নতুন দায়িত্বে মন দিতে প্রস্তুত।
বিশ্বকাপ চলাকালীন আর্জেন্টিনার সমস্ত আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মেসি। দলের অধিনায়ক হিসেবে মাঠের ভিতরে যেমন তাঁকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে, তেমনই মাঠের বাইরেও দলের আবেগ ও প্রত্যাশার ভার বহন করতে হয়েছে। প্রতিটি ম্যাচে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। ফাইনাল পর্যন্ত দলকে নিয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি আর্জেন্টিনা। সেই হার মেসির জন্য শুধুমাত্র একটি ম্যাচে পরাজয় নয়। এটি ছিল একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার মুহূর্ত। টানা দ্বিতীয় বার বিশ্বকাপ জয় করলে অধিনায়ক মেসির ফুটবলজীবনে আরও একটি অসাধারণ অধ্যায় যুক্ত হতে পারত। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসেও তৈরি হতে পারত নতুন নজির।
ফাইনালে পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও কঠিন লড়াইয়ের পর ট্রফির এত কাছে পৌঁছে হার মেনে নেওয়া কখনও সহজ নয়। তবে অভিজ্ঞ মেসি জানেন, পেশাদার ফুটবলে একটি ফলাফলকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় থেমে থাকা যায় না। জাতীয় দলের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর এখন তাঁর সামনে ইন্টার মায়ামির হয়ে নতুন লক্ষ্য।
ক্লাব ফুটবলে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশও বদলে গিয়েছে। জাতীয় দলের আবেগ, দেশের প্রত্যাশা এবং বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার চাপ থেকে বেরিয়ে মেসিকে এখন ক্লাবের পরিকল্পনা, সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতিতে মন দিতে হবে। তাঁর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারের পক্ষে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া নতুন নয়। দীর্ঘ ফুটবলজীবনে বহু বার জাতীয় দল ও ক্লাবের দায়িত্বের মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন করতে হয়েছে তাঁকে।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর মেসি প্রায় ১০ দিনের বিশ্রাম নেন। এই সময় তিনি পরিবারের সঙ্গে রোসারিয়োতে ছিলেন। রোসারিয়ো শুধু তাঁর জন্মস্থান নয়, মেসির ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি শহর। ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘ সময় কাটালেও অবসর পেলেই নিজের শিকড়ে ফিরে যেতে পছন্দ করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের চাপের পর পরিবারের সঙ্গে কাটানো এই সময় তাঁর শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফুটবলারদের শুধু মাঠে ৯০ মিনিট খেললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ম্যাচের আগে অনুশীলন, কৌশলগত বৈঠক, যাতায়াত, বিশ্রাম, সংবাদমাধ্যমের নজর এবং ফলাফল নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা—সব কিছু মিলিয়ে প্রবল চাপ তৈরি হয়।
অধিনায়ক হওয়ার কারণে মেসির উপর সেই চাপ আরও বেশি ছিল। দলের প্রতিটি সাফল্যে যেমন তাঁকে সামনে রাখা হয়েছে, তেমনই ব্যর্থতার পরও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তাই বিশ্বকাপ শেষে ফুটবল থেকে সাময়িক দূরত্ব তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় ছিল।
সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে দেখা গিয়েছিল মেসিকে। সেখানে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকার পরিবর্তে তিনি ছিলেন পরিবারের একজন সাধারণ সদস্য। মাঠের উত্তেজনা ও কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা থেকে দূরে এই সময়টুকু সম্ভবত তাঁকে আবার নতুন করে প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছে।
তবে ছুটি দীর্ঘ করেননি মেসি। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার পর অনেক ফুটবলারই দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নিতে পারেন। কিন্তু ইন্টার মায়ামির হয়ে দায়িত্বের কথা মাথায় রেখে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়েছেন তিনি। মায়ামিতে পৌঁছানোর পরের দিনই অনুশীলনে যোগ দেওয়ার ঘটনা তাঁর পেশাদার মানসিকতার পরিচয় দেয়।
মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামি মেসিদের অনুশীলনের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেছে। সেই ভিডিয়ো সামনে আসার পর সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপের পর মেসি কবে ক্লাবের অনুশীলনে ফিরবেন, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল। প্রকাশিত ভিডিয়োর মাধ্যমে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
ভিডিয়োয় দেখা যায়, দলের অন্য ফুটবলারদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই অনুশীলন করছেন মেসি। তাঁর শরীরী ভাষায় বাড়তি চাপ বা অস্বস্তির ছাপ চোখে পড়েনি। বরং বেশ খোশমেজাজে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সতীর্থদের সঙ্গে কথাবার্তা, হালকা মুহূর্ত এবং বল নিয়ে অনুশীলনের দৃশ্য বুঝিয়ে দিয়েছে, তিনি আবার ক্লাবের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর মেসির মানসিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অনুশীলনে তাঁর উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, পেশাদার দায়িত্ব পালনে তিনি প্রস্তুত। ব্যক্তিগত হতাশা থাকলেও সেটিকে মাঠের প্রস্তুতির পথে বাধা হতে দিচ্ছেন না।
ক্লাবের পক্ষ থেকেও মেসির ফেরার মুহূর্তটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ ইন্টার মায়ামির কাছে মেসি শুধুমাত্র একজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার নন। দলের খেলার ধরন, আক্রমণভাগের পরিকল্পনা, সমর্থকদের আগ্রহ এবং সামগ্রিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি গভীরভাবে যুক্ত।
মেসি অনুশীলনে ফেরার অর্থ দলের প্রস্তুতিতে নতুন গতি আসা। তাঁর সঙ্গে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেলে অন্য ফুটবলারদেরও নিজেদের বোঝাপড়া আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে আক্রমণভাগে তাঁর পাস, জায়গা তৈরি করার দক্ষতা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইন্টার মায়ামির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত ভিডিয়োর অন্যতম আকর্ষণ ছিল লুই সুয়ারেসের সঙ্গে মেসির অনুশীলন। দুই ফুটবলারের সম্পর্ক শুধু মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব রয়েছে। সেই বন্ধুত্ব খেলার মাঠে বোঝাপড়াকে আরও শক্তিশালী করেছে।
মেসি এবং সুয়ারেস একে অপরের খেলার ধরন খুব ভালভাবে বোঝেন। কোন পরিস্থিতিতে কে কোন জায়গায় দৌড়বেন, কখন পাস দেওয়া প্রয়োজন, কখন সরাসরি আক্রমণে যেতে হবে—এই বিষয়গুলিতে তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক সমন্বয় দেখা যায়। ইন্টার মায়ামির আক্রমণভাগে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশ্বকাপের ব্যস্ততা শেষ করে মেসি যখন ক্লাবে ফিরেছেন, তখন পরিচিত বন্ধু ও সতীর্থ সুয়ারেসের উপস্থিতি তাঁকে দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে সাহায্য করবে। অনুশীলনের ভিডিয়োয় দু’জনকে বেশ স্বচ্ছন্দ দেখিয়েছে। তাঁদের খোশমেজাজ প্রমাণ করে, বিশ্বকাপের হতাশা সরিয়ে আবার ক্লাবের লক্ষ্য নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন মেসি।
সুয়ারেস নিজেও অত্যন্ত অভিজ্ঞ ফুটবলার। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার দক্ষতা, বক্সের ভিতরে জায়গা তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখার ক্ষমতা তাঁকে বিপজ্জনক করে তোলে। মেসির সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সুয়ারেসের গোল করার ক্ষমতা যুক্ত হলে ইন্টার মায়ামির আক্রমণ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে শুধু পুরনো বন্ধুত্বের উপর নির্ভর করলেই হবে না। আধুনিক ফুটবলে নিয়মিত অনুশীলন, শারীরিক প্রস্তুতি এবং দলের সামগ্রিক কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই বিশ্বকাপ থেকে ফিরে মেসির দ্রুত অনুশীলনে যোগ দেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ।