সেরা ফুটবলারকে একাদশে না রাখায় তীব্র সমালোচনার মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ। অন্যদিকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ল দক্ষিণ আফ্রিকা যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনও কখনও একটি সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের গল্প। দক্ষিণ কোরিয়া বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচেও ঠিক তেমনই এক নাটকীয় পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল ফুটবলবিশ্ব। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা ও অধিনায়ক সন হিউং-মিনকে শুরু থেকে একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়লেন কোচ হং মিউং-বো। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের সেরা ফুটবলারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, বরং দক্ষিণ কোরিয়া ১-০ গোলে হেরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে জয়সূচক গোল করেন থাপেলো মাসেকো। এই জয়ের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়।
ম্যাচের আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে ছিল বড় সুযোগ। গ্রুপ পর্বে ভালো অবস্থানে থাকতে হলে এই ম্যাচে তাদের পয়েন্ট পাওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই দলকে ছন্দহীন দেখায়। মাঝমাঠে বল দখল থাকলেও আক্রমণে ধার ছিল না। ফাইনাল থার্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলাররা বারবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সন হিউং-মিনের মতো অভিজ্ঞ ও বিশ্বমানের ফুটবলারকে একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে। কোচের যুক্তি ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলাররা ক্লান্ত হলে সনকে নামিয়ে আক্রমণে গতি বাড়ানো যাবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা মাঠে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে শুরু থেকেই পরিকল্পিত ফুটবল খেলে। তারা জানত, দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে অযথা খোলা ফুটবল খেললে বিপদ বাড়তে পারে। তাই রক্ষণকে শক্ত রেখে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের কৌশল নেয় তারা। প্রথমার্ধে দুই দলই গোলের সুযোগ তৈরি করলেও কেউ জালের দেখা পায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি বদলে যায়। ৬৩ মিনিটে থাপেলো মাসেকোর দুর্দান্ত ফিনিশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে এগিয়ে দেয়। সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া চাপ বাড়ালেও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ দৃঢ়ভাবে ম্যাচ ধরে রাখে।
এই জয়ের গুরুত্ব দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে অনেক বড়। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তারা আগে কখনও নকআউট পর্বে পৌঁছতে পারেনি। এবার গ্রুপ পর্বে কঠিন লড়াইয়ের পর তারা সেই স্বপ্ন পূরণ করল। মেক্সিকোর কাছে হার দিয়ে শুরু করলেও, চেকিয়ার সঙ্গে ড্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে জয় এই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ আফ্রিকা প্রমাণ করল যে তারা শুধু অংশগ্রহণ করতে আসেনি, লড়াই করতেও এসেছে। কোচ হুগো ব্রোসের কৌশল, ফুটবলারদের মানসিক দৃঢ়তা এবং দলগত শৃঙ্খলাই তাদের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এই হার বড় ধাক্কা। দলের সমর্থকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সনকে শুরু থেকে কেন খেলানো হল না সন শুধু দলের তারকা নন, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তাঁর অভিজ্ঞতা, গতি, গোল করার ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব বড় ম্যাচে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু তাঁকে বেঞ্চে রেখে শুরু করায় দক্ষিণ কোরিয়ার আক্রমণ অনেকটাই প্রাণহীন দেখায়। পরে তিনি মাঠে নামলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে চলে গিয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের কারণে কোচ হং মিউং-বোকে ঘিরে সমালোচনা আরও বাড়তে পারে। ফুটবলবিশ্বে কৌশলগত সিদ্ধান্ত সব সময় ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। যদি সনকে দ্বিতীয়ার্ধে নামিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচ জিতত, তাহলে এই পরিকল্পনাকে মাস্টারস্ট্রোক বলা হত। কিন্তু দল হেরে যাওয়ায় একই সিদ্ধান্ত এখন ভুল কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের বাস্তব পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষের শক্তি এবং ম্যাচের গুরুত্ব বিচার করা খুব জরুরি। দক্ষিণ আফ্রিকার জয় শুধু তাদের সমর্থকদের আনন্দই দেয়নি, বিশ্বকাপের গল্পেও নতুন রোমাঞ্চ যোগ করেছে। অনেকেই ম্যাচের আগে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্ডারডগ ভাবছিলেন। কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে কাগজে-কলমে শক্তিশালী দল সব সময় জেতে না। মাঠে যারা পরিকল্পনা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করে, মানসিকভাবে দৃঢ় থাকে এবং সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তারাই শেষ পর্যন্ত সাফল্য পায়। দক্ষিণ আফ্রিকা এই ম্যাচে সেটাই করে দেখিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া এখন কঠিন অপেক্ষার সামনে। তারা এখনও সেরা তৃতীয় স্থানের দল হিসেবে পরের রাউন্ডে যাওয়ার আশা রাখতে পারে, কিন্তু সেটি নির্ভর করবে অন্য গ্রুপের ফলাফলের ওপর। অর্থাৎ নিজেদের ভাগ্য এখন আর পুরোপুরি তাদের হাতে নেই। এই অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের হতাশা স্বাভাবিক। কারণ এমন একটি ম্যাচে তারা অন্তত ড্র আশা করেছিল, যা তাদের নকআউটের রাস্তা অনেকটা সহজ করে দিত। সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ম্যাচ হয়ে থাকবে। একদিকে কোচের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে আন্ডারডগ দলের ঐতিহাসিক জয় দুই মিলিয়ে এই ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখল, আর দক্ষিণ কোরিয়া পেল কঠিন শিক্ষা বিশ্বকাপে বড় ম্যাচে সেরা অস্ত্রকে লুকিয়ে রাখা সব সময় সফল কৌশল হয় না।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হারের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এখন কঠিন অপেক্ষা। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তারা, যেখানে নিজেদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অন্য দলগুলোর ফলাফলের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ম্যাচটি তাদের জন্য শুধু একটি সাধারণ গ্রুপ ম্যাচ ছিল না, বরং নকআউট পর্বে ওঠার রাস্তা সহজ করার বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি কোরিয়ান দল।
ম্যাচের আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত একটি ড্র। কারণ এক পয়েন্ট পেলেও তারা নকআউটের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকতে পারত। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে পরাজয়ের ফলে হিসেব জটিল হয়ে গেল। এখন সেরা তৃতীয় স্থানের দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও সেটি আর পুরোপুরি তাদের নিজেদের হাতে নেই। অন্য গ্রুপের ম্যাচ, গোল পার্থক্য, পয়েন্ট টেবিল সবকিছুর ওপর নির্ভর করতে হবে দক্ষিণ কোরিয়াকে। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে এই ধরনের পরিস্থিতি যে কোনও দলের জন্য মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোচের সিদ্ধান্ত। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্রকে শুরু থেকে একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই বিস্ময়কর লেগেছে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে যেখানে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দলের সেরা ফুটবলারকে বেঞ্চে রেখে শুরু করা বড় ঝুঁকির সিদ্ধান্ত। কোচ হয়তো পরিকল্পনা করেছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষ ক্লান্ত হলে তাঁকে নামিয়ে ম্যাচের গতি বদলে দেবেন। কিন্তু ফুটবলে সব পরিকল্পনা মাঠে সফল হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের রক্ষণ সুসংগঠিত রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং সুযোগ পেয়ে গোল করে নেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার আক্রমণে শুরু থেকেই ধার কম দেখা যায়। বলের দখল থাকলেও বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি করতে তারা বারবার ব্যর্থ হয়। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে গতি আনতে পারেনি দল। এমন অবস্থায় সমর্থকদের মনে বারবার প্রশ্ন উঠেছে সেরা ফুটবলার যদি শুরু থেকেই মাঠে থাকতেন, তাহলে কি ম্যাচের ছবি অন্যরকম হতে পারত এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, হারের পর কোচের সিদ্ধান্ত ঘিরে সমালোচনা বাড়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই ম্যাচ ছিল ইতিহাস গড়ার রাত। আন্ডারডগ হিসেবে মাঠে নেমেও তারা দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবল শুধু নাম বা তারকার ওপর নির্ভর করে না। সঠিক পরিকল্পনা, দলগত শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতাই বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা সেই কাজটাই করেছে। তারা ধৈর্য ধরে খেলেছে, রক্ষণে দৃঢ় থেকেছে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে গোল করে ম্যাচ নিজেদের করে নিয়েছে।
এই জয় দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখল। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে হারানো কোনও ছোট ঘটনা নয়। এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট এনে দেয়নি, বরং দলের আত্মবিশ্বাস, সমর্থকদের আবেগ এবং দেশের ফুটবল সংস্কৃতির জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেছে, বড় মঞ্চে ভয় না পেয়ে পরিকল্পনা মেনে খেললে যে কোনও প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এই হার একটি কঠিন শিক্ষা। বিশ্বকাপের ম্যাচে অতিরিক্ত কৌশল কখনও কখনও দলের স্বাভাবিক শক্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। বড় ম্যাচে সেরা অস্ত্রকে লুকিয়ে রাখার পরিকল্পনা সব সময় সফল হয় না। বিশেষ করে যখন ম্যাচের ফল সরাসরি নকআউটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, তখন শুরু থেকেই সেরা একাদশ নামানো অনেক সময় বেশি কার্যকর হতে পারত।