পশ্চিম বর্ধমানে খসড়া ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিতর্ক ঘিরে উত্তেজনা। অভিযোগ, নিজের নাম তালিকায় থাকা সত্ত্বেও এক যুবক বুথ লেভেল অফিসারের উপর চড়াও হয়ে মারধর করে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং অভিযুক্তের খোঁজ চলছে।
পশ্চিম বর্ধমান জেলায় খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তোলপাড় গোটা এলাকা। অভিযোগ, নিজের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও এক যুবক সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)-এর উপর চড়াও হয়ে মারধর করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল থেকে প্রশাসন—সব মহলেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন সরকারি কর্মীর উপর প্রকাশ্য হামলার অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক নিরাপত্তা, ভোটার সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
একজন বুথ লেভেল অফিসারের কাজ কেবলমাত্র কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নয়। দিনের পর দিন তাঁকে ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি যেতে হয়, কখনও রোদে, কখনও বৃষ্টিতে। অনেক সময় তাঁরা নাগরিকদের কাছ থেকে সহযোগিতার বদলে কটু কথা, সন্দেহ বা বিরূপ আচরণের সম্মুখীন হন। তবু দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যান।
এই ঘটনার পর বহু বিএলও প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় তাঁরা প্রায়ই অকারণ চাপের মুখে পড়েন। কেউ নাম বাদ পড়েছে ভেবে রাগ করেন, কেউ আবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়। নতুন ভোটার যুক্ত করা, মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, ঠিকানা সংশোধন—এই সমস্ত কাজের জন্য প্রথমে প্রকাশ করা হয় খসড়া ভোটার তালিকা। এই তালিকা চূড়ান্ত নয়। নাগরিকদের আপত্তি, সংশোধন ও দাবির সুযোগ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। এই পুরো প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও।
এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য নির্বাচন কমিশন প্রচার চালালেও, তা যে এখনও পর্যাপ্ত নয়, পশ্চিম বর্ধমানের ঘটনা তা স্পষ্ট করে দিল।
বিএলও হলেন নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি। প্রতিটি বুথ এলাকায় ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্ব তাঁর উপর বর্তায়। সাধারণত স্থানীয় স্কুল শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারীদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, ভোটারদের সচেতন করেন এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই পশ্চিম বর্ধমানে এক বিএলও-কে আক্রান্ত হতে হল বলে অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পশ্চিম বর্ধমান জেলার একটি এলাকায় খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। সেই তালিকা দেখে এক যুবক দাবি করেন, তাঁর নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে। অভিযোগ, সেই ক্ষোভ নিয়েই তিনি সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসারের সঙ্গে বচসায় জড়ান। কিন্তু পরে জানা যায়, বাস্তবে ওই যুবকের নাম খসড়া তালিকায় ছিলই।
এমন পরিস্থিতিতে অভিযোগ ওঠে, সত্য যাচাই না করেই ওই যুবক উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং বিএলও-র উপর আক্রমণ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, যুবকটি প্রথমে কথাকাটাকাটি শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি বিএলও-কে ধাক্কা মারেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেন।
এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিএলও শারীরিকভাবে আহত হন। পরে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি কর্মীর উপর এই ধরনের হামলা এলাকাবাসীর মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতেই পারে, কিন্তু তার জন্য কি সরকারি কর্মীকে মারধর করা যায়?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে যুক্ত কোনও সরকারি কর্মীর উপর হামলা দ্বিগুণ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এখানে শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের কাজ ব্যাহত করার বিষয়টি জড়িত।
ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় এই ধরনের ঘটনার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। পুলিশ যদি সঠিকভাবে তদন্ত করে এবং দ্রুত চার্জশিট জমা দেয়, তবে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত যুবকটি আগেও নানা বিষয় নিয়ে উত্তেজিত আচরণ করতেন। তবে এই ধরনের প্রকাশ্য হামলা কেউ কল্পনাও করেননি। অনেকেই বলছেন, যদি স্থানীয় মানুষ সময়মতো হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়,
“ভোটার তালিকা নিয়ে সমস্যা হলে অফিসে যাওয়ার রাস্তা আছে। মারধর কোনও সমাধান হতে পারে না।”
ঘটনার পরপরই বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের নজরে আসে। থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ আধিকারিকরা জানান, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে যুক্ত কোনও সরকারি কর্মীর উপর হামলা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তরফ থেকেও ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী বিএলও-দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে।
এক আধিকারিক বলেন, “ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যে কোনও আপত্তির জন্য নির্দিষ্ট আইনি পথ রয়েছে। তার পরিবর্তে হিংসার পথ বেছে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অগ্রহণযোগ্য।”
এই ঘটনা নির্বাচন কমিশনের কাছেও উদ্বেগের বিষয়। কমিশনের এক সূত্র জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রায়শই বিভ্রান্তি দেখা যায়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সচেতন করাই বিএলও-দের কাজ। তাঁদের উপর হামলা হলে গোটা ব্যবস্থাই ব্যাহত হয়।
নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে বিএলও-দের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কড়া নির্দেশিকা জারি করতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই ঘটনাকে সামনে রেখে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ কেউ বলেছেন, ভোটার তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবই এই ধরনের ঘটনার মূল কারণ।
অন্যদিকে, শাসক দলের তরফে দাবি করা হয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনওই গ্রহণযোগ্য নয় এবং দোষীর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকা, সংশোধন প্রক্রিয়া, সরকারি কর্মীদের সুরক্ষা—সব মিলিয়েই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
একজন বিএলও-র উপর হামলা মানে শুধু একজন ব্যক্তির উপর আক্রমণ নয়, বরং গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার উপর আঘাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ খসড়া ভোটার তালিকা ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকার পার্থক্য বুঝতে পারেন না। ফলে অকারণে উত্তেজনা তৈরি হয়। সচেতনতার অভাব থেকেই এই ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মত তাঁদের।
এই ঘটনার পর সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে—ভোটার তালিকা নিয়ে কোনও সমস্যা থাকলে শান্তিপূর্ণ ও আইনি পথে সমাধান খোঁজা উচিত। সরকারি কর্মীদের উপর হামলা কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
পশ্চিম বর্ধমানের এই ঘটনা প্রশাসন ও সমাজ—দু’পক্ষের কাছেই একটি বড় শিক্ষা। একদিকে যেমন প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর সচেতনতা কর্মসূচি নিতে হবে, অন্যদিকে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
খসড়া ভোটার তালিকা ঘিরে পশ্চিম বর্ধমানে বুথ লেভেল অফিসার নিগ্রহের অভিযোগ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে এক গুরুতর সতর্কবার্তা। ভোটাধিকার নিয়ে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সরকারি কর্মীদের সুরক্ষা ও আইনের শাসন বজায় রাখা।
এই ঘটনার তদন্ত শেষে দোষীর উপযুক্ত শাস্তি হলে তবেই ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোখা সম্ভব হবে—এমনটাই মনে করছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহল।