Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোটির নিলামমূল্যেও ছন্দহীন বেঙ্কটেশ আরেক ম্যাচে ব্যর্থ প্রাক্তন কেকেআর তারকা

গত মরসুমে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায় বেঙ্কটেশ আইয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কলকাতা নাইট রাইডার্স। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার উপর ভরসা রেখে এ বারের আইপিএল নিলামে ৭ কোটি টাকায় তাঁকে দলে টেনেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।

দাম আছে, পরিচিত নামও আছে, কিন্তু ছন্দ যেন কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না বেঙ্কটেশ আইয়ারের ব্যাটে। এক সময় যাঁকে ঘিরে আইপিএলে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই বাঁহাতি ব্যাটার এখন ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিজের ছায়ার সঙ্গে লড়াই করছেন। বিজয় হজারে ট্রফি ছিল নিজের ফর্ম ফিরে পাওয়ার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ওঠা সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আদর্শ মঞ্চ। কিন্তু সেই সুযোগ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না মধ্যপ্রদেশের অধিনায়ক।

এক ম্যাচের পর এক ম্যাচে রান না আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে বেঙ্কটেশের বর্তমান ফর্ম এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কেরলের বিরুদ্ধে তাঁর সাম্প্রতিক ইনিংস সেই প্রশ্নগুলিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে দলের ভরসা হয়ে উঠতে পারেননি তিনি। ব্যাট হাতে শুরু থেকেই অস্বস্তিতে দেখা যায় তাঁকে। বল ঠিকঠাক ব্যাটে আসছিল না, ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে বার করতেও সমস্যা হচ্ছিল। বড় শট নেওয়ার চেষ্টা যেমন চোখে পড়েনি, তেমনই সহজ রান তুলতেও ছিল স্পষ্ট দ্বিধা।

অধিনায়ক হিসেবে তাঁর উপর দায়িত্ব ছিল দলের ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার। কিন্তু বাস্তবে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আরও চাপে পড়ে যান বেঙ্কটেশ। শেষ পর্যন্ত অল্প কয়েকটি বল খেলে সামান্য রান করেই ফিরে যেতে হয় তাঁকে। এই ব্যর্থতা আরও বেশি হতাশাজনক কারণ আগের দুই ম্যাচে অন্তত দুই অঙ্কের রান করেছিলেন তিনি। যদিও সেই ইনিংসগুলোও বড় স্কোরে পরিণত হয়নি, তবু কিছুটা ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত ছিল। কেরলের বিরুদ্ধে সেই ধারাবাহিকতাও ভেঙে পড়েছে।

তিন ম্যাচে মোট রান খুব একটা খারাপ না হলেও, একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার ও দলের অধিনায়কের কাছ থেকে যে প্রভাব আশা করা হয়, তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যখন একই দলে কিংবা প্রতিপক্ষ দলে তরুণ ক্রিকেটাররা নিয়মিত বড় ইনিংস খেলছেন, তখন বেঙ্কটেশের এই ব্যর্থতা আরও চোখে লাগছে। এক সময় জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা ক্রিকেটারের কাছ থেকে সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে বিজয় হজারে ট্রফিতে বেঙ্কটেশ আইয়ারের পারফরম্যান্স এখন তাঁর কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সুযোগ এখনও রয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে প্রশ্ন আরও বাড়বে। ছন্দে ফিরতে হলে শুধু রান নয়, ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাস এবং সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা দেখানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বাঁহাতি ব্যাটারের সামনে।

বিজয় হজারে ট্রফির এই ম্যাচে বেঙ্কটেশ আইয়ার নামেন মধ্যপ্রদেশের অধিনায়ক হিসেবে। দলের দায়িত্ব যেমন তাঁর কাঁধে, তেমনই ছিল নিজের ব্যাটে ছন্দে ফেরার চাপ। কিন্তু সেই চাপই যেন আরও ভারী হয়ে উঠল তাঁর জন্য। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে কেরলের বিরুদ্ধে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। মাত্র ১৬ বল খেলে ৮ রান করে রান আউট হয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। স্কোরবোর্ডে সংখ্যাটা যেমন ছোট, তেমনই ইনিংসের ধরনও ছিল হতাশাজনক।

মাঠে শুরু থেকেই অস্বস্তিতে দেখা যায় বেঙ্কটেশকে। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে বার করতে পারছিলেন না। কেরলের বোলাররা খুব বেশি ভয় দেখানোর মতো লাইন-লেন্থ না করলেও রান তুলতে সমস্যা হচ্ছিল তাঁর। বড় শট নেওয়ার চেষ্টা ছিল না বললেই চলে, আবার সিঙ্গলস-ডাবলসের জন্য দৌড়াতেও ধীরতা চোখে পড়ছিল। অধিনায়ক হিসেবে দলের রান এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে দায়িত্ব তাঁর ছিল, সেটাও ঠিকমতো পালন করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত ভুল বোঝাবুঝির জেরে রান আউট হয়ে ফিরে যেতে হল তাঁকে।

এই ব্যর্থতা আরও বেশি চোখে লাগছে কারণ আগের দুই ম্যাচে অন্তত দুই অঙ্কের রান করেছিলেন বেঙ্কটেশ। রাজস্থানের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে করেছিলেন ৩৪ রান। তার পর তামিলনাড়ুর বিরুদ্ধে করেছিলেন ৩২ রান। যদিও ওই দুই ম্যাচেও ইনিংসগুলো খুব প্রভাব ফেলেনি, কারণ শুরুটা বড় স্কোরে রূপ দিতে পারেননি তিনি। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচে এসে সেই ন্যূনতম ধারাবাহিকতাও ভেঙে পড়ল। দুই অঙ্কে পৌঁছতে না পারায় স্বাভাবিক ভাবেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

তিন ম্যাচ মিলিয়ে বেঙ্কটেশ আইয়ারের মোট রান এখন ৭৪। যেখানে তাঁর দলেরই অন্য ক্রিকেটাররা নিয়মিত রান পাচ্ছেন, সেখানে অধিনায়কের এই পরিসংখ্যান মোটেই সন্তোষজনক নয়। ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা রিঙ্কু সিং, ধ্রুব জুরেলের মতো তরুণরা যখন ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেদের জায়গা শক্ত করছেন, তখন বেঙ্কটেশের এই ব্যর্থতা তাঁকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।

news image
আরও খবর

এই পরিস্থিতির পেছনে তাকালে দেখা যায়, বেঙ্কটেশ আইয়ারের কেরিয়ারের গ্রাফ গত কয়েক বছরে বেশ ওঠানামার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এক সময় কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সিতে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে দিয়েছিল। কেকেআরের হয়ে দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের সুবাদে ভারতের টি-টোয়েন্টি দলেও সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগ ধরে রাখতে পারেননি। কয়েকটি ম্যাচের মধ্যেই বাদ পড়ে যান জাতীয় দল থেকে। তারপর আর ভারতীয় দলে ফেরার ডাক আসেনি তাঁর কাছে।

আইপিএলের দিক থেকেও তাঁর কেরিয়ার বেশ নাটকীয়। বড় নিলামে এক সময় ২৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার বিশাল অঙ্কে বেঙ্কটেশকে কিনেছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। শুধু তাই নয়, তাঁকে সহ-অধিনায়কের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। আশা ছিল, তিনি দলের মাঝের ওভারের ভরসা হয়ে উঠবেন। কিন্তু বাস্তবে হল ঠিক উল্টোটা। ধারাবাহিক ব্যর্থতায় তাঁর উপর আস্থা হারাতে শুরু করে দল।

এতটাই খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, গ্রুপ পর্বের ১৪টি ম্যাচের সবগুলিতে তাঁকে খেলানো সম্ভব হয়নি। সহ-অধিনায়ক হয়েও তাঁকে একাধিক ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু তাঁর পারফরম্যান্স দেখে ম্যানেজমেন্টের অবস্থানও অনেকটা পরিষ্কার ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যর্থতার খেসারত দিতে হয়েছিল কেকেআরকেই। ২০২৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দল ২০২৫ সালে প্লে-অফে উঠতেই পারেনি।

এই ব্যর্থতার পরেই বেঙ্কটেশ আইয়ারকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নাইট ম্যানেজমেন্ট। নিলামের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন, এত খারাপ ফর্মের কারণে হয়তো এবার দলই পাবেন না তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। বিরাট কোহলিদের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু বেঙ্কটেশের প্রতি আগ্রহ দেখায়। কেকেআরও তাঁকে ফের দলে নেওয়ার জন্য লড়াই করেছিল। টানটান লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত ৭ কোটি টাকায় বেঙ্কটেশকে কিনে নেয় বেঙ্গালুরু।

এই নিলামমূল্যই প্রমাণ করে দেয়, ক্রিকেটবিশ্ব এখনও বেঙ্কটেশ আইয়ারের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সমস্যা হল, সম্ভাবনা আর বাস্তব পারফরম্যান্সের মধ্যে যে ফারাক, তা ক্রমশ বাড়ছে। বিজয় হজারে ট্রফিতে তাঁর বর্তমান ফর্ম দেখেই বেঙ্গালুরুর সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে নামার আগে যদি এই পরিস্থিতি থাকে, তা হলে প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অনিল কুম্বলে এবং সঞ্জয় বাঙ্গারের মন্তব্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের মতে, বর্তমান ফর্ম বিবেচনা করলে বেঙ্গালুরুর প্রথম একাদশে শুরুতেই জায়গা পাওয়া সহজ হবে না বেঙ্কটেশের জন্য। বরং তাঁকে বেঞ্চে বসেই মরসুম শুরু করতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্সই হতে পারত তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু বিজয় হজারেতে একের পর এক ব্যর্থতা সেই সম্ভাবনাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

একজন অধিনায়ক হিসেবে এই ব্যর্থতা আরও বেশি চিন্তার। কারণ দলের নেতা হিসেবে নিজের ব্যাটে অবদান রাখতে না পারলে, সেটার প্রভাব পড়ে গোটা দলের উপর। মধ্যপ্রদেশের মতো দলে বেঙ্কটেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি যখন নিজেই ছন্দে নেই, তখন সেই অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সব মিলিয়ে বেঙ্কটেশ আইয়ার এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি ইনিংসই তাঁর কেরিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দাম তিনি পেয়েছেন, সুযোগও পাচ্ছেন, কিন্তু মাঠে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিজয় হজারে ট্রফির বাকি ম্যাচগুলোই হয়তো ঠিক করে দেবে, আইপিএলের আগে তিনি কতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন। আপাতত ছন্দের খোঁজে থাকা এই বাঁহাতি ব্যাটারের দিকে তাকিয়ে গোটা ক্রিকেট মহল।

Preview image