আইপিএলে প্রথম একাদশ নির্বাচন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন হায়দরাবাদের লিভিংস্টোন। তাঁর দাবি, অনেক সময় দলের মালিকদের পছন্দের ক্রিকেটাররা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলেও সুযোগ পেয়ে যান, অথচ পারফর্ম করা অন্য ক্রিকেটাররা বাদ পড়েন। এই মন্তব্য ঘিরে আইপিএলের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া ও মালিকপক্ষের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইপিএলের প্রথম একাদশ নির্বাচন নিয়ে এবার বড় বিতর্ক উস্কে দিলেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডার লিয়াম লিভিংস্টোন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ক্রিকেটমহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে আইপিএলে দল নির্বাচন কি সম্পূর্ণভাবে কোচ ও ক্রিকেটীয় যুক্তির উপর নির্ভর করে, নাকি সেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের পছন্দ-অপছন্দও বড় ভূমিকা নেয়? লিভিংস্টোনের দাবি অনুযায়ী, অনেক সময় মালিকদের পছন্দের ক্রিকেটাররা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলেও প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়ে যান, অথচ অন্য ক্রিকেটাররা সুযোগের অপেক্ষাতেই থেকে যান। এই মন্তব্য সামনে আসার পর থেকেই আইপিএলের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া, বিদেশি ক্রিকেটারদের ভূমিকা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। আনন্দবাজার ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিভিংস্টোন একটি পডকাস্টে এই মন্তব্য করেন এবং জানান, মালিকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকে কি না তিনি নিশ্চিত নন, তবে তাঁদের প্রভাব থাকে বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
আইপিএল শুধু একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়, এটি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া বাণিজ্যিক মঞ্চ। এখানে প্রতিটি দল কোটি কোটি টাকা খরচ করে ক্রিকেটার কেনে, ব্র্যান্ড তৈরি করে, সমর্থকদের আবেগ ধরে রাখে এবং মাঠের ফলাফলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সাফল্যও নিশ্চিত করতে চায়। ফলে দল নির্বাচন অনেক সময় শুধুমাত্র ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিংয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তা, নিলামে তাঁর দাম, ফ্র্যাঞ্চাইজির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্র্যান্ড ভ্যালু, বিদেশি কোটা, টিম কম্বিনেশন সব কিছুই একসঙ্গে কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সব কিছুর মাঝেও কি পারফরম্যান্সই শেষ কথা লিভিংস্টোনের মন্তব্য সেই জায়গাতেই আঘাত করেছে।
লিভিংস্টোনের বক্তব্য অনুযায়ী, আইপিএলে একজন ক্রিকেটার তিন ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে পারেন। কেউ কেউ এমন থাকেন যাঁদের জায়গা প্রায় নিশ্চিত। তাঁরা জানেন, তাঁরা খেলবেন এবং তাঁদের ভূমিকা কী হবে সেটাও আগে থেকেই পরিষ্কার থাকে। আবার কিছু ক্রিকেটার থাকেন দলে, কিন্তু তাঁদের খেলানো হবে কি না তা অনিশ্চিত। তাঁরা প্রস্তুত থাকেন, কিন্তু সুযোগ আসবে কি না জানেন না। তৃতীয় ধরনের ক্রিকেটারদের পরিস্থিতি আরও কঠিন—তাঁরা বুঝতে পারেন, চোট-আঘাত বা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হলে তাঁদের প্রথম একাদশে ঢোকার সম্ভাবনা খুবই কম। একজন পেশাদার ক্রিকেটারের জন্য এই মানসিক অবস্থাটা সহজ নয়। কারণ প্রতিদিন অনুশীলন করেও যদি তিনি জানেন যে মাঠে নামার সুযোগ প্রায় নেই, তবে তাঁর মনোভাব, প্রস্তুতি এবং আত্মবিশ্বাসে তার প্রভাব পড়তেই পারে।
সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে লিভিংস্টোনের অভিজ্ঞতাও ছিল তেমনই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আইপিএল ২০২৬-এ হায়দরাবাদের হয়ে মাত্র দু’টি ম্যাচ খেলেছিলেন। সেই দু’টি ম্যাচে তাঁর ব্যাট হাতে সাফল্য আসেনি—লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে ২০ বলে ১৪ রান এবং চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে ৫ বলে ১ রান করেছিলেন। তিনি ওই ম্যাচগুলিতে বলও করেননি। অর্থাৎ একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর পূর্ণ ভূমিকা ব্যবহার করার সুযোগও আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে লিভিংস্টোনের হতাশা অস্বাভাবিক নয়। কারণ একজন বিদেশি অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর মতো ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার অর্থ সাধারণত ব্যাটিং শক্তি, পাওয়ার হিটিং এবং প্রয়োজনে স্পিন বোলিং—এই তিন ধরনের সুবিধা পাওয়া। কিন্তু তিনি যদি নিয়মিত সুযোগ না পান, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাঁকে দলে নেওয়ার পরিকল্পনাটি আসলে কী ছিল? আইপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া সব সময়ই কঠিন। চার বিদেশির নিয়মের কারণে প্রতিটি ম্যাচে দলকে হিসাব করে নামতে হয়। কিন্তু লিভিংস্টোনের দাবি অনুযায়ী, এক সময় নাকি হায়দরাবাদ তিন বিদেশি নিয়েও খেলছিল, অথচ তাঁকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল না। এই জায়গাতেই তাঁর প্রশ্ন তৈরি হয়।
লিভিংস্টোন জানিয়েছেন, তিনি কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টরির কাছে জানতে চেয়েছিলেন কেন দল তিন বিদেশি নিয়ে খেলছে, অথচ তাঁকে নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তখন তাঁকে বোঝানো হয় যে মালিকপক্ষের পছন্দের একজন ক্রিকেটার দলে জায়গা পেয়ে গিয়েছেন এবং প্যাট কামিন্স ফিরে এলেও সেই পরিকল্পনা বদলানোর সম্ভাবনা কম। এই বক্তব্যের মধ্যেই বিতর্কের মূল জায়গা লুকিয়ে আছে। কারণ যদি সত্যিই কোনও ক্রিকেটার শুধু মালিকদের পছন্দের কারণে ধারাবাহিক সুযোগ পান, তবে তা দল নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, লিভিংস্টোন নিজেই বলেছেন যে মালিকরা সব সিদ্ধান্ত নেন কি না, তার প্রমাণ তিনি দিতে পারবেন না; তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ভিত্তিতেই কথা বলেছেন।
আইপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের ভূমিকা একেবারেই অস্বীকার করা যায় না। তাঁরা দল কেনেন, টাকা বিনিয়োগ করেন, নিলামে পরিকল্পনা তৈরি করেন, কোচিং স্টাফ নিয়োগ করেন এবং দলের বড় সিদ্ধান্তগুলিতে যুক্ত থাকেন। কিন্তু ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে ম্যাচের প্রথম একাদশ নির্বাচন, সাধারণত কোচ, অধিনায়ক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের বিষয় বলেই ধরা হয়। তবু বাস্তবতা অনেক সময় এত সহজ নয়। যেহেতু আইপিএল একটি বাণিজ্যিক লিগ, তাই মাঠের বাইরের অনেক বিবেচনাও মাঠের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনও ক্রিকেটারকে বড় দামে কিনলে তাকে সুযোগ দেওয়ার চাপ থাকে। কোনও ক্রিকেটারকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে খেলানো হতে পারে। আবার কোনও ক্রিকেটার ব্র্যান্ডের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলে তাঁকে বাদ দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন পারফরম্যান্সের চেয়ে পছন্দ, দাম বা প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায় বলে মনে হয়। ক্রিকেটে সুযোগ পাওয়া এবং সুযোগ ধরে রাখা দুটোই পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করা উচিত। একজন ক্রিকেটার ব্যর্থ হলে তাঁকে কিছুটা সময় দেওয়া যেতে পারে, কারণ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক দু’টি ম্যাচ দিয়ে কাউকে বিচার করা কঠিন। কিন্তু কেউ যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হন, আর অন্যদিকে বেঞ্চে বসে থাকা ক্রিকেটাররা সুযোগ না পান, তবে দলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে। লিভিংস্টোনের মন্তব্য সেই অসন্তোষেরই একটি প্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বিতর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে বিদেশি ক্রিকেটারদের মানসিক চাপ। আইপিএলে বিদেশি ক্রিকেটাররা সাধারণত বড় প্রত্যাশা নিয়ে আসেন। তাঁদের উপর চাপ থাকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার, কম সুযোগে প্রভাব ফেলার এবং দলের জন্য ম্যাচ জেতানোর। কিন্তু তাঁরা যদি স্পষ্ট ভূমিকা না পান, তবে তাঁদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়। কেউ জানেন না তিনি পরের ম্যাচে খেলবেন কি না, কেউ জানেন না তাঁকে ব্যাটিং অর্ডারে কোথায় পাঠানো হবে, আবার কেউ জানেন না তাঁকে বল করা হবে কি না। এই অনিশ্চয়তা একজন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
লিভিংস্টোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর, কারণ তিনি একজন অলরাউন্ডার। অলরাউন্ডারদের মূল্য তখনই বেশি, যখন তাঁদের দুই দিকের দক্ষতা ব্যবহার করা হয়। যদি কোনও অলরাউন্ডারকে শুধু ব্যাটার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাও আবার অল্প সুযোগে, তবে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে একজন ফিনিশার বা মিডল অর্ডার ব্যাটারের হাতে অনেক সময় মাত্র ১০-১৫ বল থাকে। সেখানে ব্যর্থ হলে তাঁকে সহজেই দায়ী করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, তাঁকে কি যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? তাঁকে কি তাঁর স্বাভাবিক ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল? তাঁর বোলিং কি পরিকল্পনায় ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া শুধু রান দেখে বিচার করলে পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না।
আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে দল নির্বাচন সব সময়ই জটিল। প্রতিটি ম্যাচে পিচ, প্রতিপক্ষ, মাঠের আকার, বোলিং বিকল্প, ব্যাটিং গভীরতা, ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার নিয়ম সব বিবেচনা করতে হয়। কখনও দল তিন বিদেশি নিয়েও খেলতে পারে, যদি ভারতীয় ক্রিকেটারদের উপর বেশি ভরসা থাকে বা ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার কৌশল আলাদা হয়। তাই শুধু তিন বিদেশি নিয়ে খেলা মানেই ভুল সিদ্ধান্ত, এমন বলা যায় না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দলের ভেতরে পরিষ্কার না হলে অসন্তোষ তৈরি হয়। লিভিংস্টোন বলেছেন, ড্যানিয়েল ভেট্টরি তাঁকে সরাসরি পরিস্থিতি জানিয়ে দিয়েছিলেন, এবং তিনি সেই স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই জায়গায় কোচের ভূমিকা ইতিবাচক বলেই ধরে নেওয়া যায়।