অনীকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে গভীর শোকাহত অভিনেতা জীতু কমল। হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার পর থেকে গত দু’দিন ধরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি, চোখে নেই একফোঁটা ঘুমও।
কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হল পরিচালক অনীক দত্তের শেষকৃত্য। একের পর এক বিশিষ্ট মানুষের উপস্থিতিতে যেন আবেগে ভারী হয়ে উঠেছিল গোটা পরিবেশ। প্রথমে নন্দনে, পরে এনটিওয়ান স্টুডিয়োয় শায়িত রাখা হয়েছিল পরিচালকের মরদেহ। শেষবারের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের বহু পরিচিত মুখ। বর্ষীয়ান বাম নেতা বিমান বসু থেকে শুরু করে টলিউডের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক— সকলেই যেন স্তব্ধ হয়ে বিদায় জানালেন এক বিতর্কিত অথচ স্পষ্টভাষী চলচ্চিত্র নির্মাতাকে। তবে এই ভিড়ের মধ্যেই এক অনুপস্থিতি ঘিরে শুরু হয় জল্পনা। কোথাও দেখা যায়নি অভিনেতা জীতু কমলকে, যিনি অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে অভিনয় করে বিশেষ প্রশংসা পেয়েছিলেন। পরে জানা যায়, তিনি এনটিওয়ান স্টুডিয়োর বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন নিঃশব্দে।
কেন ভিতরে ঢোকেননি জীতু? কেন দূর থেকে বিদায় জানালেন তাঁর প্রিয় পরিচালককে? সেই উত্তর স্পষ্ট করে না দিলেও কেওড়াতলা শ্মশানে দাঁড়িয়ে নিজের মনের ক্ষোভ আর কষ্ট উজাড় করে দেন অভিনেতা। সংবাদমাধ্যমের সামনে জীতুর বক্তব্য যেন শুধু একজন পরিচালকের মৃত্যু নিয়ে নয়, বরং গোটা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের এক অন্ধকার বাস্তবকে সামনে এনে দেয়। তাঁর কথায়, “মানসিক ভাবে খুন করা হল মানুষটাকে। সামনে থেকে দেখেছি, কী ভাবে ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে। কী ভাবে মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে।”
অভিনেতার এই বিস্ফোরক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে টলিপাড়ায়। জীতুর দাবি, অনীক দত্তকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে। শুধু একটি ছবিকে ঘিরে বিতর্ক নয়, বরং তাঁকে কাজের ক্ষেত্র থেকেও দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে বলে অভিযোগ অভিনেতার। তিনি জানান, “কোনও প্রযোজক এলে তাঁকে বলে দেওয়া হত যেন ওঁর সঙ্গে কাজ না করেন। ইন্ডাস্ট্রির অনেক মানুষ তৎকালীন সরকারকে খুশি করতে গিয়ে অনীকদার বিরুদ্ধে কথা বলতেন।”
জীতুর কথায় স্পষ্ট ছিল ক্ষোভ, হতাশা এবং এক গভীর ব্যক্তিগত শোক। তিনি আরও বলেন, “সে অবশ্য আমার বিরুদ্ধেও বলে। তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।” অভিনেতার দাবি, অনীক দত্ত শুধু একজন পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক স্পষ্টভাষী মানুষ, যিনি কোনও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতেন না। আর সেই কারণেই তাঁকে একঘরে করার চেষ্টা হয়েছে বহুবার।
গত দু’দিন ধরে নাকি ঠিকমতো ঘুমোতেও পারেননি জীতু কমল। অনীকের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই তিনি হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে। কারও সঙ্গে কথা বলেননি, প্রকাশ্যে আসেননি। কেওড়াতলায় দাঁড়িয়ে সেই জমে থাকা আবেগই যেন বিস্ফোরিত হল তাঁর কথায়। অভিনেতা বলেন, “পাপ-পুণ্য সবকিছুর খতিয়ান দিয়ে শেষে এই শ্মশানেই সবাইকে আসতে হবে।”
এই একটি বাক্য যেন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। অনেকেই মনে করছেন, জীতুর বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং বর্তমান সমাজ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিও এক তীব্র বার্তা। তিনি সরাসরি অনুরোধ করেন, “প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ হোক। নতুন সরকারের কাছে আর্জি, প্রতিহিংসা যেন বন্ধ হয়।”
অভিনেতার বক্তব্য অনুযায়ী, অনীক দত্তকে নিয়ে অনেকেই এখন প্রশংসা করছেন, কিন্তু অতীতে তাঁরাই সমালোচনায় মুখর ছিলেন। জীতুর কথায়, “অনেকে এখন অনীকদার প্রশংসা করছেন। কিন্তু তাঁরাই সমালোচনা করেছেন একদিন।” এই মন্তব্যে তিনি ইঙ্গিত করেছেন সেইসব মানুষের দিকে, যারা সময় বুঝে অবস্থান বদলান, অথচ কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান না।
টলিউডে অনীক দত্ত বরাবরই ছিলেন এক আলাদা ধরণের পরিচালক। তাঁর ছবিতে যেমন ব্যঙ্গ ছিল, তেমনই ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যের স্পষ্ট উপস্থিতি। তিনি কখনও জনপ্রিয়তার জন্য নিজের মত বদলাননি। বরং বারবার বিতর্কের মুখে পড়েও নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছেন। সেই কারণেই হয়তো তাঁকে নিয়ে মেরুকরণও ছিল প্রবল। কেউ তাঁকে অসাধারণ নির্মাতা বলতেন, কেউ আবার তাঁকে বিতর্কপ্রিয় বলে আক্রমণ করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর জীতু কমলের বক্তব্য যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল— একজন শিল্পীকে কি সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়?
জানা গিয়েছে, মৃত্যুর একদিন আগেও নাকি জীতুর সঙ্গে কথা হয়েছিল অনীক দত্তের। নতুন কাজ নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল বলেও জানান অভিনেতা। সেই স্মৃতি এখন আরও বেশি করে তাড়া করছে তাঁকে। জীতুর কথায়, “ভাবতেই পারছি না, যে মানুষটার সঙ্গে গতকালও কথা বললাম, তিনি আজ নেই।”
এই আবেগঘন পরিস্থিতির মধ্যেই অভিনেতা বিশেষ একটি অনুরোধও জানিয়েছেন। অগ্নিমিত্রা পাল ও রুদ্রনীল ঘোষের কাছে তিনি আবেদন করেছেন, অনীকের যে ছবিকে ঘিরে এত বিতর্ক তৈরি হয়েছিল এবং যে ছবি ঠিকমতো চলতে দেওয়া হয়নি, সেটি যেন আবার মানুষের সামনে আনা হয়। জীতুর মতে, এটাই হবে পরিচালকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
তিনি বলেন, “এমনটা হলে অন্তত ওপর থেকে দেখে উনি বলবেন, ‘বিপ্লবের জয় হল’। এই আশাতেই বুক বাঁধছি।” এই মন্তব্যে স্পষ্ট, অনীক দত্তকে তিনি শুধুমাত্র একজন পরিচালক হিসেবে নয়, বরং এক লড়াকু শিল্পী হিসেবেই দেখতেন।
কেওড়াতলা শ্মশানের পরিবেশ তখন ক্রমশ আরও ভারী হয়ে উঠছে। চারপাশে কান্না, নীরবতা আর স্মৃতির ভিড়। সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জীতুর বক্তব্য যেন একধরনের প্রতিবাদ হিসেবেও উঠে আসে। তিনি বলেন, “ছবি আটকে রাখা, মানুষের পিছনে নেতিবাচক মন্তব্য করা, প্রতিহিংসার রাজনীতি— এগুলো বন্ধ হোক।”
অভিনেতার দাবি, সরকার বদলের পরে নাকি অনেক প্রযোজক আবার যোগাযোগ করছিলেন অনীক দত্তের সঙ্গে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন পরে হয়তো নতুন করে কাজ শুরু করার আশাও তৈরি হয়েছিল পরিচালকের মনে। কিন্তু সেই সুযোগ আর পেলেন না তিনি। এই আক্ষেপই যেন আরও বেশি করে কষ্ট দিচ্ছে তাঁর ঘনিষ্ঠদের।
টলিউডের অনেকেই মনে করছেন, জীতু কমলের এই মন্তব্য আগামী দিনে বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কারণ তিনি যে অভিযোগ তুলেছেন, তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং গোটা ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। শিল্পের জগতে কি সত্যিই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে? কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করলে কি একজন শিল্পীকে কাজ হারাতে হয়? এই প্রশ্নগুলো এখন নতুন করে উঠে আসছে।
অনীক দত্তের মৃত্যু তাই শুধু একজন পরিচালকের প্রয়াণ নয়, বরং একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্নেরও জন্ম দিল। তাঁর কাজ, তাঁর বক্তব্য, তাঁর লড়াই— সবকিছু নিয়েই আবার আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন করে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে এখন জীতু কমলের বিস্ফোরক মন্তব্য।
একসময় ‘অপরাজিত’ ছবির মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের জীবনকে বড়পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন অনীক দত্ত। সেই ছবিতে জীতু কমলের অভিনয় প্রশংসা পেয়েছিল সর্বত্র। পরিচালক ও অভিনেতার মধ্যে তৈরি হয়েছিল গভীর সম্পর্ক। তাই হয়তো অনীকের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না জীতু। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল সেই শোক, সেই রাগ, সেই অসহায়তা।
শেষকৃত্যের আগুন যখন ধীরে ধীরে নিভে আসছে, তখনও কেওড়াতলায় দাঁড়িয়ে একটাই কথা বারবার বলছিলেন অভিনেতা— “একজন শিল্পীকে এভাবে শেষ করে দেওয়া উচিত নয়।” তাঁর কথায় ছিল না কোনও রাজনৈতিক স্লোগান, ছিল না কোনও নাটকীয়তা। ছিল শুধু একজন কাছের মানুষকে হারানোর কষ্ট আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
অনীক দত্ত আজ আর নেই। কিন্তু তাঁকে ঘিরে বিতর্ক, তাঁর কাজ, তাঁর লড়াই এবং তাঁকে নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো হয়তো আগামী দিনেও টলিউডে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। আর সেই আলোচনার অন্যতম মুখ হয়ে থাকবেন জীতু কমল, যিনি শ্মশানের নীরবতার মধ্যেও সাহস করে বলে ফেললেন বহু অস্বস্তিকর সত্যের কথা।
জীতু কমলের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। কেউ অভিনেতার সাহসী মন্তব্যকে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ মনে করছেন শোকের মুহূর্তে এমন রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে অনীক দত্তকে কাছ থেকে যারা চিনতেন, তাঁদের অনেকেরই দাবি— পরিচালক দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক চাপে ভুগছিলেন। কাজের ক্ষেত্রে একাধিক বাধা, ছবিকে ঘিরে বিতর্ক এবং বিভিন্ন মহলের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। যদিও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলতেন তিনি।
টলিউডের একাংশের মতে, অনীক দত্ত ছিলেন এমন একজন নির্মাতা যিনি আপস করতে জানতেন না। তাঁর ছবিতে সমাজ ও রাজনীতির নানা দিক উঠে আসত স্পষ্ট ভাষায়। সেই কারণেই কখনও প্রশংসা, কখনও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। মৃত্যুর পরেও সেই বিতর্ক যেন থামল না। বরং জীতু কমলের মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এল শিল্পী স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের সম্পর্কের সমীকরণকে।
অনেকেই মনে করছেন, অনীক দত্তের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও থেমে যাওয়া কাজগুলোকে সামনে নিয়ে আসাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। আর সেই দায়িত্ব এখন হয়তো তাঁর ঘনিষ্ঠ মানুষদের কাঁধেই এসে পড়েছে।