৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ভারতীয় কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া। আজ সংসদে কৃষিমন্ত্রী ঘোষণা করলেন 'প্রধানমন্ত্রী কিষাণ ড্রোন যোজনা'-য় বড়সড় পরিবর্তনের কথা। কৃষকদের জন্য ড্রোনের ওপর ভর্তুকি ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৭৫% করা হলো। এখন থেকে সার ও কীটনাশক ছড়ানোর কাজ করবে ড্রোন, বাঁচবে সময় ও শরীর। স্মার্ট ফার্মিং-এর পথে ভারতের এই বিশাল পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
আকাশ থেকেই হবে চাষবাস: ড্রোনের ভর্তুকি বেড়ে ৭৫ শতাংশ এবং ভারতীয় কৃষিতে ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা
নয়া দিল্লি, ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ভারতের কৃষি ব্যবস্থা বা এগ্রিকালচার শব্দটা শুনলেই এতদিন আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত রোদে পোড়া এক কৃষকের ছবি, যিনি কাঁধে ভারী স্প্রে মেশিন নিয়ে মাইলের পর মাইল ক্ষেতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। রোদের তাপে গায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে, কীটনাশকের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে, তবুও ফসলের সুরক্ষায় তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই ছবিটা কয়েক দশক ধরে ভারতীয় কৃষির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই চিরচেনা ছবিটা আমূল বদলে যেতে চলেছে। লাঙল আর বলদ দিয়ে শুরু হওয়া ভারতীয় কৃষি আজ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর ড্রোনের যুগে প্রবেশ করল।
আজ, ৩রা ফেব্রুয়ারি, সংসদে বাজেট পরবর্তী অধিবেশনে ভারতের কৃষিমন্ত্রী যে ঘোষণাটি করলেন, তা ভারতের কৃষি ইতিহাসে এক গেম চেঞ্জার বা যুগান্তকারী মোড় হিসেবে গণ্য হতে পারে। সরকার প্রধানমন্ত্রী কিষাণ ড্রোন যোজনা বা পিএম-কেডিওয়াই এর আওতায় কৃষি ড্রোনের ওপর ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৭৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই একটি সিদ্ধান্ত ভারতের কোটি কোটি কৃষকের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এই ঘোষণার পর থেকেই দেশের কৃষি মহলে, কৃষক সংগঠনগুলোতে এবং এগ্রি-টেক স্টার্টআপগুলোর মধ্যে খুশির হাওয়া বইছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ভারত এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে আটকে থাকতে চায় না। বরং স্মার্ট ফার্মিং বা নির্ভুল কৃষিকাজ বা প্রিসিশন ফার্মিং এর দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। এটি কেবল একটি ভর্তুকি বৃদ্ধির ঘোষণা নয়, এটি কৃষি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
কেন এই হঠাৎ ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং এর প্রেক্ষাপট
গত দুই বছর ধরে ভারতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষি ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছিল। বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র এবং আইআইটিগুলোর উদ্যোগে ড্রোনের উপযোগিতা নিয়ে গবেষণা চলছিল। কিন্তু ড্রোনের উচ্চমূল্য সাধারণ বা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এক বিশাল বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রযুক্তির সুবিধা চোখের সামনে থাকলেও তা ছোঁয়ার সাধ্য ছিল না অধিকাংশের। একটি ভালো মানের, আধুনিক সেন্সরযুক্ত কৃষি ড্রোনের দাম বাজারে ৪ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সরকারের পূর্ববর্তী ৫০ শতাংশ ভর্তুকি স্কিম থাকার পরেও বাকি ২ থেকে ৫ লক্ষ টাকা জোগাড় করা অনেক কৃষকের পক্ষেই অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে যেখানে কৃষকদের গড় জমির পরিমাণ খুবই কম, সেখানে এককভাবে ড্রোন কেনা ছিল বিলাসিতার নামান্তর।
কৃষিমন্ত্রী তাঁর বাজেট পরবর্তী ভাষণে এই সমস্যাটির কথা স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা এবং কৃষিকাজকে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু পুরনো পদ্ধতিতে চাষ করে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব নয়। ড্রোন প্রযুক্তি সেই লক্ষ্যের চাবিকাঠি হতে পারে। আমরা চাই না অর্থের অভাবে কোনো কৃষক প্রযুক্তির সুফল থেকে বঞ্চিত হোন। প্রযুক্তি কেবল ধনীদের জন্য নয়, তা গ্রামের শেষ প্রান্তের কৃষকের জন্যও হতে হবে। তাই আমরা ভর্তুকি বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করলাম।
তিনি একটি তাত্ত্বিক উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলেন, ধরা যাক একটি ড্রোনের দাম ১ লক্ষ টাকা। আগে কৃষককে দিতে হতো ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন নতুন নিয়মে কৃষককে দিতে হবে মাত্র ২৫ হাজার টাকা। বাকি ৭৫ হাজার টাকা সরকার বহন করবে। এই সিদ্ধান্ত ড্রোনকে এখন একটি সাধারণ কৃষি যন্ত্রপাতির তালিকায় নিয়ে আসবে। মন্ত্রী আরও যোগ করেন, আগামী দিনে আকাশ থেকেই হবে চাষবাস। ড্রোন কেবল কীটনাশক ছড়াবে না, এটি ফসলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে, মাটির আর্দ্রতা মাপবে এবং ফলন বাড়াতে সাহায্য করবে।
কিষাণ ড্রোন আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করবে
অনেকেই ভাবেন ড্রোন মানেই হয়তো বাচ্চাদের খেলনা বা বিয়ের ভিডিও করার ছোট কোনো যন্ত্র। কিন্তু কৃষি কাজে ব্যবহৃত ড্রোন বা কিষাণ ড্রোন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তির। এগুলো একেকটি শক্তিশালী অক্টোকপ্টার (আটটি পাখা বিশিষ্ট) বা হেক্সাকপ্টার (ছয়টি পাখা বিশিষ্ট) এভিয়েশন ডিভাইস। এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী মোটরের সাহায্যে চলে এবং ১০ থেকে ১৫ লিটার পর্যন্ত তরল সার বা কীটনাশক বহন করতে সক্ষম। এর কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং নিখুঁত।
প্রথমত, এর স্বয়ংক্রিয় স্প্রে সিস্টেম বা অটোমেটেড স্প্রেয়িং মেকানিজম নিয়ে কথা বলা যাক। কৃষকরা তাদের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের মাধ্যমে ড্রোনের রুট ম্যাপ বা ওড়ার পথ ঠিক করে দেবেন। জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে ড্রোনটি জমির সীমানা চিনে নেবে। এরপর ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে ফসলের ওপর সুষমভাবে সার বা ন্যানো-ইউরিয়া স্প্রে করবে। মানুষের হাতে স্প্রে করলে কোথাও ওষুধ বেশি পড়ে, আবার কোথাও কম। কিন্তু ড্রোনের নজলগুলো এমনভাবে তৈরি যে এটি কুয়াশার মতো সুক্ষ্ম কণা স্প্রে করে, যা গাছের পাতার ওপর ও নিচে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, সময়ের সাশ্রয়। এটি ড্রোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা। একজন মানুষ যেখানে ১ একর জমিতে কীটনাশক স্প্রে করতে সারা দিন সময় নেন এবং একাধিক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, সেখানে একটি ড্রোন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সেই কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করতে পারে। এর ফলে কৃষকের সময় বাঁচে এবং সঠিক সময়ে রোগ বা পোকা দমন করা সম্ভব হয়।
তৃতীয়ত, সেন্সর প্রযুক্তি। এই ড্রোনগুলো কেবল মালবাহী যন্ত্র নয়, এগুলো একেকটি উড়ন্ত ল্যাবরেটরি। এতে অত্যাধুনিক মাল্টিস্পেকট্রাল ক্যামেরা এবং সেন্সর লাগানো থাকে। সাধারণ চোখে আমরা গাছের পাতা সবুজ দেখি, কিন্তু মাল্টিস্পেকট্রাল ক্যামেরা গাছের ক্লোরোফিলের মাত্রা, জলের উপস্থিতি এবং স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি ধরতে পারে। এই সেন্সরগুলো ফসলের কোন অংশে পোকার আক্রমণ হয়েছে বা কোথায় জলের অভাব রয়েছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারে। এর ফলে পুরো জমিতে অযথা ওষুধ না দিয়ে, শুধুমাত্র দরকারি জায়গাতেই ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয়। একেই বলা হয় প্রিসিশন ফার্মিং বা নির্ভুল চাষ। এতে সারের অপচয় কমে এবং পরিবেশ রক্ষা পায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শ্রমের সংকট থেকে মুক্তি
ভারতের কৃষকদের একটি দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা হলো কীটনাশক স্প্রে করার সময় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া। প্রখর রোদে মুখে কাপড় বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিষাক্ত রাসায়নিক স্প্রে করার ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, চর্মরোগ এবং এমনকি ক্যান্সারের মতো মারণ রোগে আক্রান্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে স্প্রে করার সময় অসাবধানতাবশত বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
ড্রোনের ব্যবহার এই ঝুঁকি পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনবে। কৃষক এখন আর বিষাক্ত ওষুধের সংস্পর্শে আসবেন না। তিনি ক্ষেতের আলে বা গাছের ছায়ায় আরামে দাঁড়িয়ে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে স্প্রে করবেন। এটি কৃষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
তাছাড়া, বর্তমানে গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিকদের স্থানান্তরের ফলে কৃষিকাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফসল বোনা বা কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া গেলেও, স্প্রে করার জন্য দক্ষ লোক পাওয়া কঠিন। ড্রোনের ব্যবহার এই শ্রমিকের অভাব পূরণ করবে এবং কৃষিকাজকে যান্ত্রিকীকরণের নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। প্রযুক্তি এখানে মানুষের শত্রু নয়, বরং মানুষের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।
ড্রোন দিদি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান
সরকারের এই প্রকল্পের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং নারীর ক্ষমতায়ন। এই ড্রোনগুলো চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত পাইলটের প্রয়োজন। সরকার ইতিমধ্যেই সারা দেশের কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলোতে বা কেভিকে-তে গ্রামীণ যুবক ও বিশেষ করে মহিলাদের ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ড্রোন দিদি উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রামীণ মহিলা এখন ড্রোন পাইলট হিসেবে স্বনির্ভর হচ্ছেন।
গ্রামের মহিলারা যারা এতদিন কেবল ঘরের কাজ বা সাধারণ কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন, তারা এখন প্রযুক্তির চালক। এটি তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন ড্রোন দিদি এখন মাসে ভালো রোজগার করতে পারছেন।
ভর্তুকি বাড়ার ফলে এখন গ্রাম পঞ্চায়েত বা কৃষক সমবায় সমিতিগুলো বা এফপিও সহজেই ড্রোন কিনতে পারবে। তারা গ্রামে গ্রামে কাস্টম হায়ারিং সেন্টার বা সিএইচসি তৈরি করবে। বিষয়টি অনেকটা ট্রাক্টর ভাড়ায় নেওয়ার মতো। এখন কৃষকরা ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় ড্রোন ভাড়া নিতে পারবেন। নিজের ড্রোন কেনার সামর্থ্য না থাকলেও, ভাড়ায় এনে তারা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারবেন। এতে গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলবে। তারা ড্রোন পাইলট, ড্রোন মেকানিক বা ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করতে পারবেন।
চ্যালেঞ্জ ও তার বাস্তবসম্মত সমাধান
অবশ্য যেকোনো বড় পরিবর্তনের পথেই কিছু বাধা বা চ্যালেঞ্জ থাকে। ড্রোনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রথমত, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা ডিজিটাল লিটারেসি। গ্রামের বয়স্ক কৃষকদের স্মার্টফোন বা ড্রোন কন্ট্রোলার ব্যবহারে অভ্যস্ত করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাদের কাছে এই প্রযুক্তি ভিনগ্রহের বস্তুর মতো মনে হতে পারে। তাই ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা শিবিরের প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ব্যাটারি লাইফ ও চার্জিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার। একটি কৃষি ড্রোন সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিট উড়তে পারে। বড় জমিতে কাজ করার সময় বারবার ব্যাটারি বদলানোর প্রয়োজন হয়। ক্ষেতের মাঝখানে বা প্রত্যন্ত গ্রামে ড্রোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে তা চার্জ করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বিদ্যুতের সমস্যা অনেক গ্রামে আজও বিদ্যমান।
তৃতীয়ত, আবহাওয়া। ড্রোন প্রযুক্তির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি খুব বেশি বাতাস বা বৃষ্টির সময় কাজ করতে পারে না। ঝড় বা বৃষ্টির সময় ড্রোন ওড়ানো সম্ভব নয়, যা বর্ষাকালের চাষাবাদে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
সরকার এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিটি ব্লকে ড্রোন সার্ভিস সেন্টার খোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে ড্রোন মেরামত ও ব্যাটারি সোয়াপিং বা ব্যাটারি অদলবদল করার সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ চার্জ শেষ হলে চালক সাথে সাথে একটি ফুল চার্জ ব্যাটারি নিতে পারবেন। এছাড়া আইআইটি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সহজ, হালকা ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারিযুক্ত ড্রোন তৈরির জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে জোর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোলার চার্জিং স্টেশন তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে।
ন্যানো ইউরিয়া ও ড্রোনের যুগলবন্দি
ভারতের ইফকো বা আইএফএফসিও আবিষ্কৃত তরল ন্যানো ইউরিয়া এবং ন্যানো ডিএপি বা ডি-অ্যামোনিয়াম ফসফেট ড্রোনের ব্যবহারের জন্য আদর্শ। এটি ভারতীয় কৃষি গবেষণার এক অনন্য সাফল্য। আগে এক একর জমিতে এক বস্তা বা ৪৫ কেজি ইউরিয়া লাগত। সেই বস্তা বহন করা এবং ছড়ানো ছিল কষ্টসাধ্য। কিন্তু এখন মাত্র ৫০০ মিলিলিটারের এক বোতল ন্যানো ইউরিয়া সেই একই কাজ করে।
বস্তাভর্তি ইউরিয়া ছড়াতে অনেক শ্রম ও পরিবহন খরচ লাগে। কিন্তু এক বোতল ন্যানো ইউরিয়া ড্রোন দিয়ে নিমেষেই ছড়ানো যায়। এই যুগলবন্দি ভারতের সারের আমদানি খরচ বা ইমপোর্ট কস্ট কমাবে এবং মাটির উর্বরতা রক্ষা করবে। মাটিতে সরাসরি রাসায়নিক সার পড়লে মাটির গঠন নষ্ট হয়, কিন্তু ড্রোনের মাধ্যমে পাতায় স্প্রে করলে (ফোলিয়ার স্প্রে) গাছ তা দ্রুত শোষণ করে এবং মাটির ক্ষতি হয় না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারত
কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহারে চীন, আমেরিকা, ব্রাজিল এবং ইসরায়েল এতদিন এগিয়ে ছিল। তারা অনেক আগে থেকেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু আজকের এই ঘোষণার পর ভারত এগ্রি-টেক দুনিয়ায় এক বড় শক্তি হিসেবে উঠে এল। ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিতে হয়, সেখানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বকে নতুন পথ দেখাবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ভারতের মতো বিশাল কৃষিনির্ভর দেশে যদি প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হয়, তবে তা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে। ভারত যদি ড্রোন প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভারত ড্রোন ও প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারবে। এটি ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগকেও শক্তিশালী করবে।
উপসংহার: আগামীর স্বপ্ন
৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দিনটি ভারতের কৃষকদের জন্য এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এল। এটি কেবল একটি যন্ত্রের ব্যবহার নয়, এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তন। ৭৫ শতাংশ ভর্তুকি কেবল একটি আর্থিক সাহায্য নয়, এটি কৃষকদের প্রতি সরকারের আস্থার প্রতীক। এটি এই বার্তা দেয় যে, সরকার কৃষকদের পাশে আছে এবং তাদের আধুনিক করে তুলতে বদ্ধপরিকর।
গ্রামের আকাশ এখন আর কেবল মেঘ বা পাখির ওড়াউড়ি দেখবে না, দেখবে গুঞ্জন তুলে উড়ে যাওয়া আধুনিক ড্রোন, যা নিচে সবুজ ফসলের ওপর ছিটিয়ে দেবে সমৃদ্ধির আশ্বাস। কৃষি এখন আর কেবল চাষবাস বা জীবনধারণের উপায় নয়, কৃষি এখন স্মার্ট বিজনেস। এক সময় যে তরুণ প্রজন্ম কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে শহরে চলে যাচ্ছিল, এই প্রযুক্তি হয়তো তাদের আবার গ্রামের দিকে, মাটির দিকে ফিরিয়ে আনবে। একজন স্মার্ট কৃষক এখন ল্যাপটপ আর ড্রোন হাতে নিয়েই তার সোনালী ফসল ফলাবেন। ভারতের কৃষি ব্যবস্থা আজ এক নতুন দিগন্তে পা রাখল, যার সুফল আগামী প্রজন্ম ভোগ করবে।
এই পরিবর্তনের ঢেউ কেবল ক্ষেতের ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা গ্রামের অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রযুক্তির হাত ধরে ভারত গড়বে এক নতুন ইতিহাস, যেখানে কৃষক হবেন স্বাবলম্বী, কৃষি হবে লাভজনক এবং দেশ হবে খাদ্যে আরও বেশি সুরক্ষিত।