Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুম্বইয়ে নিজের ঘরে বাবা–মায়ের প্রবেশ বন্ধ করার আবেদন খারিজ করল বম্বে হাই কোর্ট

মুম্বইয়ের এক ব্যক্তি নিজের বাবা–মাকে ঘরে ঢুকতে বাধা দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে বম্বে হাই কোর্ট তাঁর সেই দাবি খারিজ করে জানিয়ে দেয়, পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব এড়ানো যায় না এবং এমন আচরণ সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।

মুম্বই শহর বহুদিন ধরেই ভারতের আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত, যেখানে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, পরিবারের কাঠামো বদলেছে এবং পরিবর্তিত হয়েছে সম্পর্কের মানসিক জটিলতা। এই পরিবর্তনের মধ্যে মাঝেমাঝি সময়ে উঠে আসে এমন কিছু ঘটনা যা সমাজকে ভাবায়, পরিবার ও সম্পর্কের ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় এবং আইনের সামনে নতুন নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সম্প্রতি এমনই এক ঘটনা সামনে এসেছে যখন মুম্বইয়ের এক ব্যক্তি নিজের বাবা–মাকে তাঁর বাসায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার আবেদন নিয়ে আদালতে যান এবং বম্বে হাই কোর্টে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে তাঁর বাবা–মা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করছেন, তাঁকে অযথা মানসিক চাপ দিচ্ছেন এবং তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য বিচারালয়ের নির্দেশ প্রয়োজন। তবে আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন যে ভারতীয় সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে এমন আচরণ কোনওভাবেই মানানসই নয় এবং আইন পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বকে কখনও বাতিল করতে পারে না।

এই মামলার বিষয়টি শুধু আইনি বা পারিবারিক নয়, বরং সমাজের গভীরে থাকা মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারতীয় সংস্কৃতিতে পরিবার হল সবচেয়ে দৃঢ় জায়গা যেখানে সন্তানরা ছোটবেলা থেকে শিখে আসে শ্রদ্ধা, দায়িত্ব, কর্তব্য এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা। বাবা–মা তাঁদের সন্তানদের বেড়ে ওঠার সময় যে স্নেহ, সময়, পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগ করেন তা কোনও আইন দিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরিমাপ করা যায় না। সন্তানেরও সেই সম্পর্কের প্রতি নৈতিক দায় থাকে যা ভারতীয় সংস্কৃতিতে বহু যুগ ধরে অনুসরণ করা হয়েছে। সুতরাং যখন একটি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজস্ব বাবা–মাকে ঘরে ঢুকতে না দেওয়ার দাবি করে তখন বিষয়টি গুরুতর হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। আদালতও এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করে বলেন যে পিতামাতার অধিকার ও সন্তানের কর্তব্য কোনও আইনি চুক্তির মত সম্পর্ক নয় বরং এটি মানবিক সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত একটি নৈতিক নীতি।

মামলায় জানা যায়, ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন যে তাঁর বাবা–মা তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করলে তিনি অসুবিধার মুখে পড়েন এবং তাঁর শান্তি বিঘ্নিত হয়। তিনি আরও দাবি করেন যে তাঁরা নাকি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযাচিত সমস্যার সৃষ্টি করেন। তবে আদালত বলেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অস্বস্তির কারণ দেখিয়ে পিতামাতাকে বাড়ি থেকে দূরে রাখার মতো অনুমতি দেওয়া যায় না। বিচারপতি বলেন যে পিতামাতা কোনও অপরাধী নন যাঁদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে, বরং তাঁরা সেই মানুষ যারা সন্তানের জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছেন, তাঁর ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন এবং আজীবন সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। আদালত আরও বলেন, সন্তান যত বড়ই হোক বা জীবনে যতই উন্নতি করুক না কেন বাবা–মায়ের অবস্থান একই থাকে এবং সেই সম্পর্ক থেকে সম্মান সরিয়ে দেওয়া আইন অনুমোদন করতে পারে না।

ভারতীয় আইনে পিতামাতার সুরক্ষার বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশ রয়েছে। Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act বেআইনি বলে গণ্য করে যদি কোনও সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের বাবা–মাকে পরিত্যাগ করেন বা তাঁদের সঠিক যত্ন না নেন। সমাজে এখনো বহু বাবা–মা আছেন যারা সন্তানদের আশা করে বার্ধক্যে তাঁদের পাশে কাউকে পায় না। এই আইন তাঁদের জন্য একটি সুরক্ষার দেওয়াল হিসাবে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আদালতের এই রায় সমাজকে আবার স্মরণ করিয়ে দিল যে আইন কতটা সংবেদনশীল এবং মানবিক অবস্থান বজায় রেখে বিচার করে। আদালত বলেন যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, মতপার্থক্যও সম্ভব, কিন্তু সেই কারণে পরিবার বিচ্ছিন্ন করা যাবে না এবং সমাজে এমন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা যায় না যেখানে সন্তানরা নিজেরাই বাবা–মাকে বাইরে বের করে দিতে চায়।

মুম্বইয়ের এই মামলাটি সমাজের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সময় এবং ব্যক্তিগত পরিসরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় পরিবার বা সম্পর্কের আবেগিক দায়িত্বকে ছোট করে দেখার প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে। বাবা–মা যখন সন্তানদের ছোটবেলায় বড় করে তোলেন, তখন কি তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ছিল না? তাঁরা কি কখনও সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে নিজেদের সময়, স্বপ্ন এবং পরিশ্রমকে ত্যাগ করেননি? তাহলে বড় হয়ে সন্তান একই স্থানে দাঁড়ালে কেন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়? এই প্রশ্নগুলি শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং গোটা সমাজের সামনে আজ একটি সতর্কবার্তা হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে।

আদালত এই মামলা খারিজ করলেও স্পষ্ট করে দেন যে তাঁরা কোনও পক্ষের ব্যক্তিগত জীবনে জবরদস্তি হস্তক্ষেপ করতে চান না। বরং তাঁরা শুধু এতটাই বলতে চান যে পরিবারিক সম্পর্কের জটিলতা মিটিয়ে ফেলতে সমাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি মনে করেন যে বাবা–মা তাঁর জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন তাহলে সেই সমস্যা আদালতের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়, বরং কথোপকথন, পারস্পরিক সমঝোতা, এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। আদালত বলেন যে আইনের কাজ পরিবার ভাঙা নয়, বরং সমাজের মৌলিক কাঠামোকে সুসংহত রাখা।

news image
আরও খবর

এই রায়ের মাধ্যমে আদালত একটি বৃহত্তর বার্তা দিয়েছে যে ভারতীয় সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন তার ভিত্তি আজও পরিবার এবং সেই পরিবার তখনই সম্পূর্ণ যখন সন্তানরা বাবা–মায়ের প্রতি সম্মান দেখায়, দায়িত্ব পালন করে এবং সম্পর্ককে মর্যাদা দেয়। এই রায় সমাজে সেই মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ঘটাতে সাহায্য করবে। কারণ যখন আদালত এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে তখন তা শুধু মামলার পক্ষগুলির জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য একটি দিশানির্দেশক হিসাবে কাজ করে।

আজকের প্রজন্ম দ্রুতগতির জীবনে চলতে চলতে অনেক সময়ে সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলি ভুলে যায়। মানসিক চাপ, কাজের চাপ, জীবনের দৌড় প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই মনে করেন যে পিতামাতার উপস্থিতি তাঁদের জন্য বোঝা। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে পিতামাতা কোনও বোঝা নন, বরং তাঁরা সেই সুরক্ষা ছাতা যাঁরা প্রথম থেকেই সন্তানকে রক্ষা করেছেন, শিখিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন এবং বারবার সন্তানকে সামলে নিয়েছেন। তাই তাঁদের ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার মতো মানসিকতা সমাজকে কোথায় নিয়ে যাবে তা ভাবলেও আতঙ্ক হয়।

এই মামলা মানুষকে আরও একটি বিষয়ে সচেতন করে—পরিবারে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সমাধান করার পথ কখনোই বিচ্ছিন্নতা বা অসম্মান নয়। বরং পারস্পরিক কথা বলা, সম্মান করা এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়। বাবা–মা যতই কঠোর হোন বা মতবিরোধ থাকুক না কেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত সন্তানেরই মঙ্গল চান। সন্তানের দায়িত্বও সেই সম্পর্ককে মূল্য দেওয়া এবং মমত্ববোধ বজায় রাখা।

এই রায় ভবিষ্যতে অনেক অনুরূপ মামলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। অনেকেই হয়তো ব্যক্তিগত বিরক্তি বা মানসিক অশান্তির কারণে বাবা–মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাইবেন, কিন্তু আদালত এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে এমন সম্পর্ককে আইনি বচসার পর্যায়ে না নিয়ে গিয়ে বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাধান করাই উত্তম। সমাজে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রথম হয়ে উঠছে এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই রায় খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।

শেষমেশ বলা যায়, আদালত যেমন আইন অনুযায়ী বিচার করেছে, তেমনই সমাজকে একটি সুন্দর বার্তা দিয়েছে যে বাবা–মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা কোনও বাধ্যবাধকতা নয় বরং নৈতিক দায়িত্ব। মুম্বইয়ের এই ঘটনাটি শুধু একটি মামলা নয়, বরং সমাজে মানুষের দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। আদালতের ভাষায়, পিতামাতা কোনও অপরাধী নন, তাঁরা আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম রক্ষাকর্তা এবং প্রথম আশ্রয়। তাঁদের ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা শুধু আইন বিরুদ্ধ নয়, মানবিকতার বিরুদ্ধও। সমাজ যতই আধুনিক হোক, পরিবারের এই মৌলিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে রাখা

Preview image