ম্যাচের শুরু থেকেই দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই, কিন্তু শেফালি ভার্মার ব্যাটিং সেই প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যায় বহু গুণ। ব্যাট হাতে যেন আগুন ঝরালেন তিনি। ২০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে খেলা তার অপরাজিত ৬৯ রানের ইনিংস শুধু ম্যাচের গতিপথই বদলায়নি, বরং প্রতিপক্ষ দলকে কার্যত ম্যাচের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ইনিংসের শুরুতেই শেফালি বুঝিয়ে দেন, আজ তিনি থামার মুডে নেই। প্রথম কয়েক বলেই বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন আগ্রাসী মানসিকতা দিয়ে। নিখুঁত টাইমিং, দ্রুত পায়ের কাজ এবং আত্মবিশ্বাসী শট নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই প্রতিপক্ষের বোলারদের লাইন লেন্থ ভেঙে পড়ে, যার পুরো সুবিধা নেন শেফালি। তার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় দিক ছিল ধারাবাহিক আক্রমণ। তিনি শুধু বড় শটের ওপর নির্ভর করেননি; বরং ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে স্মার্ট ক্রিকেট খেলেছেন। কাভার ড্রাইভ, পুল শট কিংবা লং অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারা ছক্কা সব শটেই ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। বিশেষ করে স্পিন বোলারদের বিপক্ষে তার আগ্রাসী মনোভাব ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেট ধরে রেখে এতটা পরিণত ইনিংস খেলা সহজ কাজ নয়, কিন্তু শেফালি সেটাই করে দেখালেন। উইকেট পড়লেও তিনি চাপ নেননি। বরং অপর প্রান্তের ব্যাটারদের সঙ্গে দ্রুত রান নেওয়ার মাধ্যমে দলের রানরেট সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তার অপরাজিত থাকা ইনিংসের শেষ পর্যন্ত দলের জন্য ছিল বিশাল প্রাপ্তি।
আধুনিক ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এখন আর শুধু একটি কৌশল নয়, বরং ম্যাচ জয়ের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। সেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন শেফালি ভার্মা। তার ব্যাটিং মানেই প্রতিপক্ষ বোলারদের জন্য আতঙ্ক, দর্শকদের জন্য বিনোদন আর নিজের দলের জন্য আত্মবিশ্বাসের এক অদম্য উৎস। সাম্প্রতিক ম্যাচে ২০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে খেলা তার অপরাজিত ৬৯ রানের ইনিংসটি সেই সত্যকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ইনিংসটি শুধু একটি ভালো পারফরম্যান্স নয়, বরং আধুনিক নারী ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের ধরণ কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তার একটি জীবন্ত উদাহরণ।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট ছিল যথেষ্ট চাপের। প্রতিপক্ষ দল শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ নিয়ে মাঠে নেমেছিল এবং শুরু থেকেই তারা উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেফালি শুরু থেকেই ভিন্ন বার্তা দেন। প্রথম কয়েক বল দেখেই বোঝা যায়, তিনি আজ রক্ষণাত্মক ক্রিকেট খেলতে নামেননি। তার চোখে মুখে ছিল আত্মবিশ্বাস, শরীরী ভাষায় ছিল দৃঢ়তা। বোলারদের এক মুহূর্তের ভুলও যে তিনি ছাড়বেন না, সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে খুব দ্রুতই।
শেফালির শটের বৈচিত্র্য দর্শকদের মুগ্ধ করেছে বারবার। কখনো অফ সাইডে ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে চমৎকার কাট, কখনো আবার অন সাইডে শক্তিশালী ফ্লিক কিংবা পুল শট। ছক্কাগুলো ছিল নিখুঁত টাইমিংয়ের ফল, যেখানে বল যেন ব্যাটে লেগে নিজেই গ্যালারির দিকে ছুটে গেছে। বিশেষ করে মিড উইকেট ও লং অন অঞ্চলে তার শটগুলো প্রতিপক্ষ বোলারদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানে।
ইনিংস যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে শেফালি আজ ভিন্ন কিছু করতে যাচ্ছেন। দলের অন্য প্রান্তে ব্যাটাররা আসা যাওয়া করলেও তিনি ছিলেন অবিচল। উইকেট হারানোর পরেও তার ব্যাটিংয়ে কোনো তাড়াহুড়ো দেখা যায়নি। বরং তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের খেলাকে সামঞ্জস্য করেছেন। কখনো বড় শট, কখনো স্ট্রাইক রোটেশন সবকিছুর মধ্যেই ছিল পরিণতির ছাপ।
এই ইনিংস শুধু পরিসংখ্যানের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার মতো নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। শেফালি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর ওপেনার হিসেবে ধরা হয়। তার ব্যাটিংয়ে যেমন ছিল শক্তি, তেমনি ছিল বুদ্ধিমত্তা ও ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা।
ম্যাচ শেষে ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও প্রশংসায় ভাসান এই ইনিংসকে। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের বিধ্বংসী ব্যাটিংই বড় ম্যাচে দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগায়। দর্শকদের জন্য এটি ছিল এক দারুণ উপভোগ্য অভিজ্ঞতা, আর দলের জন্য ছিল জয়ের পথে এক শক্ত ভিত।
শেফালির অপরাজিত ৬৯ রানের ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন গেঁথে থাকার মতোই। ব্যাট হাতে আগুন ঝরিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন, আক্রমণাত্মক ক্রিকেট কীভাবে ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দিতে পারে।
ইনিংসের শুরুতে শেফালির ব্যাটিং ছিল নিখুঁত আগ্রাসনের মিশেল। তিনি অযথা ঝুঁকি নেননি, আবার অহেতুক সময়ও নষ্ট করেননি। যেসব বল মারার মতো, সেগুলো তিনি নির্দ্বিধায় বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছেন। আর যেসব বল তুলনামূলক ভালো ছিল, সেগুলোতে দ্রুত সিঙ্গেল কিংবা ডাবল নিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করেছেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ আক্রমণই তার ইনিংসকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই রানরেট বেড়ে যায় এবং প্রতিপক্ষ বোলারদের পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যেতে শুরু করে।
শেফালির ব্যাটিংয়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার অসাধারণ টাইমিং। তিনি জোর করে মারার চেষ্টা করেন না, বরং ব্যাটের মাঝখানে বল লাগিয়ে সেটাকে সীমানার বাইরে পাঠান। এর ফলে তার শটগুলো দেখতে যেমন সুন্দর লাগে, তেমনি কার্যকরও হয়। কাভার অঞ্চলের ওপর দিয়ে তার ড্রাইভ, মিড উইকেটে তার শক্তিশালী পুল শট কিংবা লং অন দিয়ে মারা ছক্কা প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস আর দক্ষতার ছাপ। বিশেষ করে স্পিন বোলারদের বিপক্ষে তিনি যে সাবলীলতা দেখিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।
২০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেট ধরে রেখে ব্যাটিং করা মানে প্রতি বলে চাপ তৈরি করা। এই চাপ শুধু বোলারদের ওপর নয়, ফিল্ডিং দলের ওপরও পড়ে। শেফালি সেটাই করেছেন। তার দ্রুত রান তোলার ফলে ফিল্ডারদের অবস্থান বদলাতে হয়েছে বারবার, বোলারদের লাইন লেন্থে এসেছে অনিশ্চয়তা। কখনো শর্ট বল, কখনো ফুল লেংথ, কখনো আবার ওয়াইড লাইনে বল করতে গিয়ে তারা ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। এর পুরো সুযোগ কাজে লাগান শেফালি।
ইনিংসের মাঝপথে দলের কয়েকটি উইকেট পড়লেও শেফালি নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকেন। তিনি জানতেন, উইকেটে শেষ পর্যন্ত থাকাই দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আক্রমণাত্মক হলেও তার ব্যাটিংয়ে ছিল পরিণত মানসিকতা। তিনি অপর প্রান্তের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেছেন, পরিস্থিতি বুঝে শট খেলেছেন এবং প্রয়োজনে নিজে দায়িত্ব নিয়ে বড় শট মেরেছেন। এই নেতৃত্বগুণই তাকে শুধু একজন বিধ্বংসী ব্যাটার নয়, বরং দলের জন্য একজন ভরসার নাম করে তুলেছে।
তার অপরাজিত ৬৯ রানের ইনিংসটি পরিসংখ্যানের দিক থেকেও দারুণ। অল্প বল খেলে এই রান করা মানেই দলের স্কোরবোর্ডে বিশাল প্রভাব ফেলা। কিন্তু সংখ্যার বাইরে গিয়েও এই ইনিংসের গুরুত্ব অনেক। এটি ম্যাচের গতি সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। যেখানে একসময় ম্যাচটি হাড্ডাহাড্ডি মনে হচ্ছিল, সেখানে শেফালির ব্যাটিংয়ের পরই পাল্লা ঝুঁকে যায় তার দলের দিকে। প্রতিপক্ষ দল মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়।
আধুনিক নারী ক্রিকেটে শেফালি ভার্মা একটি বড় নাম। খুব অল্প বয়সেই তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জাত চিনিয়েছেন। তার ব্যাটিংয়ে যে নির্ভীকতা দেখা যায়, তা অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের মধ্যেও বিরল। তিনি প্রতিপক্ষের নাম বা পরিস্থিতি দেখে ভয় পান না। বরং বড় মঞ্চেই নিজেকে আরও ভালোভাবে মেলে ধরেন। এই মানসিক দৃঢ়তাই তাকে আলাদা করে তোলে।
এই ইনিংসটি তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে যারা ওপেনিং ব্যাটার হিসেবে খেলতে চায়, তাদের জন্য শেফালির ব্যাটিং একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। কীভাবে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায়, কীভাবে ঝুঁকি আর নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়, এবং কীভাবে চাপের মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে যাওয়া যায় সবকিছুরই বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে এই ইনিংসে।
ম্যাচ শেষে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা এই ইনিংসকে আধুনিক টি টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের এক নিখুঁত নমুনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, এই ধরনের ব্যাটিংই নারী ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। দর্শকরাও দারুণভাবে উপভোগ করেছেন শেফালির ব্যাটিং। গ্যালারিতে প্রতিটি বাউন্ডারি আর ছক্কার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
দলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই অপরাজিত ৬৯ রান শুধু একটি ইনিংস নয়, বরং পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেওয়া এক শক্ত ভিত্তি। যখন একজন ব্যাটার এভাবে দায়িত্ব নিয়ে খেলেন, তখন পুরো দলই স্বস্তিতে থাকে। বোলাররা জানে তাদের রক্ষা করার মতো রান আছে, ফিল্ডাররা আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এই ইতিবাচক প্রভাবই একটি দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, শেফালি ভার্মার এই ইনিংসটি দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে থেকে যাবে। ব্যাট হাতে আগুন ঝরিয়ে, ২০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে খেলা তার অপরাজিত ৬৯ রান শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, বরং সাহসী ও আধুনিক ক্রিকেটের এক অনবদ্য উদাহরণ। এই ধরনের ইনিংসই প্রমাণ করে, ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, মানসিক শক্তি আর সঠিক মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিল্প। শেফালি সেই শিল্পে যে কতটা দক্ষ, তা তিনি আবারও প্রমাণ করে দিলেন।