আমরা শুধু পড়াশোনা করি না, রান্না ও হাতের কাজও পারি এই বার্তাকেই বাস্তবে রূপ দিল গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। পড়ুয়াদের উদ্যোগে আয়োজিত খাদ্য ও হস্তশিল্প মেলায় বিক্রি হল ফুচকা থেকে ভেজিটেবল চপ। পড়ুয়াদের সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ শিক্ষক অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়, বরং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তাই বারবার তুলে ধরছেন শিক্ষাবিদরা। সেই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল পূর্ব বর্ধমান জেলার গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের কচিকাঁচাদের উদ্যোগে আয়োজিত হল খাদ্য ও হস্তশিল্প মেলা, যেখানে পড়ুয়ারা প্রমাণ করল—পড়াশোনার পাশাপাশি রান্না, সৃজনশীল কাজ এবং আত্মনির্ভরতার পাঠও তারা রপ্ত করতে পারে।
“আমরা শুধু পড়াশোনা করি তাই নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি রান্না ও হাতের কাজও করতে পারি”—এই আত্মবিশ্বাসী বার্তাকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হয় এই মেলা। চলতি বছরে এই মেলা দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করায় উৎসাহ আরও বেড়েছে পড়ুয়া, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হয় এই অভিনব মেলা। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের সক্রিয় সহযোগিতায় পড়ুয়ারা নিজেরাই বিভিন্ন খাবার তৈরি করে স্টল সাজায়। ফুচকা, ঘুগনি, চাউমিন, পকোড়া, পাঁপড়ি চাট, ভেজিটেবল চপ—এমন নানা মুখরোচক খাবারের সম্ভার ছিল মেলায়।
খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রীও প্রদর্শিত ও বিক্রি করা হয়। কাগজের কাজ, রঙিন কারুশিল্প, ছোটখাটো হাতে তৈরি সামগ্রী—সব মিলিয়ে মেলাটি হয়ে ওঠে কচিকাঁচাদের প্রতিভা প্রদর্শনের এক উজ্জ্বল মঞ্চ।
এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল—সব খাবারই তৈরি করেছে পড়ুয়ারাই। অবশ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধির দিকে বিশেষ নজর রেখেছেন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকেরা। কোথাও কোনও ত্রুটি যাতে না থাকে, সে জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পড়ুয়াদের হাতে তৈরি ফুচকা বা চাউমিন খেতে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকেই জানান, ছোট ছোট পড়ুয়াদের এমন আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। মেলার প্রতিটি স্টলে পড়ুয়ারা নিজেরাই ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছে, হিসাব করছে এবং বিক্রির অভিজ্ঞতা নিচ্ছে—যা তাদের বাস্তব জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
এই মেলার মাধ্যমে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, দলগত কাজের মানসিকতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাওয়ায় পড়ুয়ারা আরও উৎসাহী হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন,
“এই মেলার উদ্দেশ্য শুধুই আনন্দ নয়। আমরা চাই পড়ুয়ারা বাস্তব জীবনের দক্ষতাগুলিও শিখুক। রান্না, হাতের কাজ, হিসাব রাখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা—এই সবই ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”
এই মেলার সাফল্যের পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছেন অভিভাবকেরাও। রান্নার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে উপকরণ জোগাড়, স্টল সাজানো—সব ক্ষেত্রেই তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। অনেক অভিভাবক জানান, এই ধরনের উদ্যোগ তাঁদের সন্তানদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছে।
এক অভিভাবক বলেন,
“আমাদের সময় এমন সুযোগ ছিল না। এখন বাচ্চারা ছোট থেকেই অনেক কিছু শিখছে। স্কুলের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”
কচিকাঁচাদের এই মেলা দেখতে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারাও। অনেকেই জানান, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন উদ্যোগ এলাকায় বিরল। পড়ুয়াদের প্রতিভা, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ দেখে তাঁরা মুগ্ধ।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,
“এই বাচ্চারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ছোটবেলা থেকেই যদি এমন শিক্ষা পায়, তাহলে তারা অনেক দূর যাবে।”
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের কার্যক্রম পড়ুয়াদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে সহায়ক। শুধুমাত্র পরীক্ষার নম্বর নয়, বরং জীবনের জন্য প্রস্তুত করাই বিদ্যালয়ের লক্ষ্য।
বিদ্যালয়ের এক কর্তা জানান,
“এই মেলা আমাদের কাছে একটা শিক্ষামূলক প্রকল্প। পড়ুয়ারা এখানে যা শিখছে, তা বইয়ে শেখানো সম্ভব নয়।”
গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত খাদ্য ও হস্তশিল্প মেলা ইতিমধ্যেই এলাকার শিক্ষামহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। এই মেলা শুধু একটি অনুষ্ঠান বা উৎসব নয়, বরং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখানো উদ্যোগ বলেই মনে করছেন অনেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনদক্ষতা, আত্মনির্ভরতা ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা আজ বারবার উঠে আসছে, এই মেলার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেল।
অনেক শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য বিদ্যালয়ের জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে। কারণ এখানে শুধুমাত্র পাঠ্যসূচির বাইরে গিয়ে কিছু শেখানো হয়নি, বরং শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।
আজকের দিনে শিশুদের জীবন ক্রমশ মোবাইল ফোন, ট্যাব, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পর্দার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাবও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা কমছে, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা সীমিত হয়ে পড়ছে এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জনের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খাদ্য ও হস্তশিল্প মেলা এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানে শিশুদের পর্দার বাইরে এনে হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়েছে। রান্না করা, হস্তশিল্প তৈরি, স্টল সাজানো, ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা, হিসাব রাখা—এই সমস্ত কাজের মধ্য দিয়ে পড়ুয়ারা বাস্তব জীবনের নানা দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
এই মেলার সবচেয়ে বড় সাফল্য হল পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার বীজ বপন করা। ছোট ছোট পড়ুয়ারা যখন নিজের হাতে খাবার তৈরি করে তা বিক্রি করছে, তখন তারা শুধু আনন্দই পাচ্ছে না, বরং নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে যে তারা নিজেরা কিছু তৈরি করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং দায়িত্ব নিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। এই মেলা সেই শিক্ষারই বাস্তব রূপ।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যেমন পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনই অভিভাবকেরাও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। এই সমন্বয়ই মেলাটিকে সফল করে তুলেছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে এই ধরনের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগ সেই আদর্শ সম্পর্কের একটি সুন্দর উদাহরণ।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও পরীক্ষার নম্বর ও ফলাফলের উপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে শুধু নম্বর দিয়ে কোনও শিশুর মেধা বা সক্ষমতা বিচার করা যায় না—এই উপলব্ধি ধীরে ধীরে জোরদার হচ্ছে।
এই মেলার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, কীভাবে পাঠ্যসূচির বাইরেও শিক্ষাকে অর্থবহ করে তোলা যায়। এখানে কোনও প্রতিযোগিতা বা প্রথম-দ্বিতীয় হওয়ার চাপ ছিল না। বরং সবাই মিলেমিশে কাজ করেছে, শিখেছে এবং আনন্দ পেয়েছে। এই সহযোগিতামূলক শিক্ষাই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এলাকাবাসী ও শিক্ষামহলের একাংশ মনে করছেন, এই ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি অন্যান্য বিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়ে, তবে প্রাথমিক শিক্ষার চেহারাই বদলে যেতে পারে। অল্প খরচে, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার করে এই ধরনের মেলা বা কার্যক্রম আয়োজন করা সম্ভব।
এর ফলে শিশুদের মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়বে, তেমনই তাদের মধ্যে সামাজিকতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধও গড়ে উঠবে। এই দিক থেকে গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগ এক বাস্তবসম্মত ও কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনদক্ষতার শিক্ষা—এই বার্তাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এক প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা মানে শুধু বইয়ের পাতা নয়; শিক্ষা মানে জীবনকে বোঝা, নিজেকে গড়ে তোলা এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
আজকের দিনে যখন শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা উদ্বেগ ও প্রশ্ন উঠে আসছে, তখন এই ধরনের বাস্তবমুখী শিক্ষার উদ্যোগ আশার আলো দেখায়। গলসি দয়ালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।