২০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নানা দামের তুলসী মালা সহজেই মিলছে মায়াপুরের নিত্যানন্দ মার্কেটে ভক্ত ও পর্যটকেরা বিশ্বাস ও ভক্তির টানে আনন্দের সঙ্গে সেগুলি ক্রয় করছেন
আসন্ন দোল উৎসব ও গৌড় পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে নদীয়ার মায়াপুর ইসকন মন্দির চত্বর এখন কার্যত উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে। বছরের এই বিশেষ সময়টায় দেশ বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্ত ও পর্যটকেরা এখানে সমবেত হন। তাঁদের আগমনেই মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত মুখর ও রঙিন। ভক্তির আবেশ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান কীর্তন নামসংকীর্তন আর নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মায়াপুরে তৈরি হয়েছে এক অনন্য পরিবেশ যা সারা বছরের অপেক্ষায় থাকেন বহু মানুষ।
গৌড় পূর্ণিমা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি হিসেবে বৈষ্ণব সমাজে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেই সঙ্গে দোল উৎসব যুক্ত হওয়ায় এই সময়টায় মায়াপুরে ভক্ত সমাগম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ইসকন মন্দির প্রাঙ্গণে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্তদের যাতায়াত লেগেই থাকে। কেউ আসছেন পূজা অর্চনা করতে কেউ কীর্তনে অংশ নিতে আবার কেউ শুধুই এই উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করতে। এই ভিড়কে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর মন্দির চত্বরে গড়ে ওঠে নিত্যানন্দ মার্কেট যা এখন মায়াপুরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
নিত্যানন্দ মার্কেট মূলত একটি অস্থায়ী বাজার হলেও এর ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য দেখে প্রথমবার আসা যে কোনও মানুষের বিস্ময় জাগে। মন্দির সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি ছোট ছোট স্টল বসিয়ে তৈরি হয় এই বিশাল বাজার। চলতি বছরে এই বাজার শুরু হয়েছে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এবং চলবে ৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই বাজার মায়াপুরে আসা ভক্ত ও পর্যটকদের প্রধান গন্তব্যগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।
এই বাজারে পাওয়া যায় নানা ধরনের ধর্মীয় সামগ্রী। তুলসী মালা জপমালা কাঁসার বাসন ধূপ ধুনো প্রদীপ মূর্তি ধর্মীয় বই পোশাক শাড়ি কুর্তা থেকে শুরু করে নানা স্মারক সামগ্রী। তবে অন্যান্য সবকিছুর মধ্যেও যে জিনিসটি এবার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে তা হল বৃন্দাবনের বিখ্যাত তুলসী মালা। সুদূর বৃন্দাবন থেকে আগত একাধিক বিক্রেতা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেছেন নিত্যানন্দ মার্কেটে।
বৃন্দাবনের তুলসী মালার প্রতি বৈষ্ণব ভক্তদের একটি আলাদা আবেগ রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় তুলসী গাছ অত্যন্ত পবিত্র এবং তুলসী কাঠের মালা ধারণ করলে ভক্তির সঙ্গে মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ হয়। সেই কারণেই এই মালার চাহিদা সবসময়ই থাকে তুঙ্গে। মায়াপুরের মতো আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্রে এই মালার আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়।
নিত্যানন্দ মার্কেটে বিক্রি হওয়া তুলসী মালাগুলির বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। ছোট বড় মাঝারি নানা মাপের মালা এখানে পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও খুব সাধারণ নকশার মালা আবার কোথাও অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্য করা মালা সাজানো রয়েছে। কিছু মালা দৈনন্দিন জপ করার জন্য আবার কিছু মালা বিশেষ পূজা অর্চনা কিংবা উপহার দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। মালার দানার আকার মসৃণতা কাঠের রং সবকিছুতেই দেখা যায় আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য।
দামের ক্ষেত্রেও এই বাজারে রয়েছে বিস্তর বৈচিত্র্য। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের তুলসী মালা মিলছে এখানে। সাধারণ ভক্তদের জন্য কম দামের মালাও রয়েছে আবার বিশেষ মান ও নকশার মালার জন্য উচ্চমূল্যও ধার্য করা হয়েছে। ফলে সব শ্রেণির মানুষই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের মালা কিনতে পারছেন।
বিক্রেতাদের দাবি অনুযায়ী এই মালাগুলি আসল বৃন্দাবনের তুলসী কাঠ দিয়ে তৈরি। স্থানীয়ভাবে তৈরি মালার তুলনায় এর গুণগত মান অনেকটাই উন্নত। কাঠ বেশি টেকসই দানা মসৃণ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরও সহজে নষ্ট হয় না। সেই কারণেই বহু ভক্ত দূরদূরান্ত থেকে এসেও এই মালা কিনে নিয়ে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বৃন্দাবন থেকে আগত বিক্রেতা পূর্ণেন্দু নস্কর জানান গৌড় পূর্ণিমা উপলক্ষে মায়াপুরে যে মেলা বসে তা কার্যত আন্তর্জাতিক মানের। দেশ বিদেশের ভক্তরা এখানে আসেন এবং তাঁদের অনেকেই বৃন্দাবনের তুলসী মালার খোঁজ করেন। সেই কারণেই প্রতি বছর তাঁরা এই সময়টায় মায়াপুরে আসেন। প্রায় এক মাস ধরে এখানে ব্যবসা করেন এবং উৎসব শেষ হলে পুনরায় বৃন্দাবনে ফিরে যান।
পূর্ণেন্দু নস্করের কথায় এই বছর বিক্রি বেশ ভালো হচ্ছে। উৎসব যত এগিয়ে আসছে ভিড় ততই বাড়ছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বাড়ছে। অনেক বিদেশি পর্যটকও এই মালা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন স্মারক হিসেবে। তাঁদের কাছে তুলসী মালা শুধু একটি ধর্মীয় বস্তু নয় বরং ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি অংশ।
নিত্যানন্দ মার্কেট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয় এটি এক ধরনের সামাজিক মিলনক্ষেত্রও বটে। এখানে ঘুরতে ঘুরতে একদিকে যেমন মানুষ কেনাকাটা করেন তেমনই অন্যদিকে নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়। কোথাও শোনা যায় ভক্তিমূলক আলোচনা কোথাও কীর্তনের সুর আবার কোথাও বিদেশি পর্যটকদের কৌতূহলী প্রশ্ন। সব মিলিয়ে বাজারের প্রতিটি কোণেই এক আলাদা রকমের প্রাণচাঞ্চল্য।
মায়াপুর ইসকন মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফেও এই বাজার ঘিরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা পানীয় জল শৌচাগার সবকিছুর দিকেই নজর রাখা হয়েছে। ভক্ত ও পর্যটকদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় তার জন্য স্বেচ্ছাসেবকেরাও নিয়োজিত রয়েছেন।
দোল ও গৌড় পূর্ণিমা যত এগিয়ে আসছে মায়াপুরের ভিড় ততই বাড়ছে। রাস্তা ঘাট হোটেল আশ্রম সবকিছুতেই মানুষের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এই উৎসবমুখর পরিবেশে নিত্যানন্দ মার্কেট এখন মায়াপুর ইসকন মন্দিরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তুলসী মালা থেকে শুরু করে নানা ধর্মীয় সামগ্রী কেনার পাশাপাশি এই বাজার ঘুরে দেখাও বহু মানুষের কাছে উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায় আসন্ন দোল ও গৌড় পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে মায়াপুর শুধু একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয় বরং এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ভক্তি সংস্কৃতি ব্যবসা ও পর্যটনের এক সুন্দর সমন্বয় দেখা যাচ্ছে এখানে। নিত্যানন্দ মার্কেট তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ যেখানে বৃন্দাবনের তুলসী মালা ভক্তদের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই উৎসবকে আরও রঙিন করে তুলেছে।
এই উৎসবের আবহে মায়াপুরে এসে পৌঁছলে সহজেই বোঝা যায় যে এটি এখন আর শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দোল ও গৌড় পূর্ণিমাকে ঘিরে গোটা অঞ্চলজুড়ে যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে তা কার্যত এক সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মন্দির চত্বর মানুষের ভিড়ে মুখরিত। কীর্তনের সুর ভেসে আসছে চারদিক থেকে আর সেই সুরে মিশে যাচ্ছে মানুষের কথা হাসি আর পদচারণার শব্দ। এই মিলিত আবহই মায়াপুরকে করে তুলেছে এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
ভক্তদের কাছে এই সময়টি আত্মিক উন্নতির সুযোগ। তাঁরা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসেন শুধুমাত্র দর্শন বা পূজা দেওয়ার জন্য নয় বরং এই পবিত্র পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে আসছেন আবার অনেক বিদেশি ভক্তকে দেখা যাচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে। ভাষা দেশ সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও ভক্তির বন্ধনে সবাই যেন একসূত্রে গাঁথা।
এই ভক্তিস্রোতের পাশাপাশি সমানতালে চলছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। নিত্যানন্দ মার্কেট তারই বাস্তব উদাহরণ। এই বাজারে শুধু ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে এমন নয় বরং বহু মানুষের জীবিকা এই বাজারের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় কর্মী থেকে শুরু করে বৃন্দাবন কিংবা অন্য রাজ্য থেকে আসা বিক্রেতারা এই সময়ের উপর অনেকটাই নির্ভর করেন। এক মাসের এই ব্যবসা তাঁদের বছরের আয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে।
পর্যটনের দিক থেকেও এই সময়টা মায়াপুরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব উপলক্ষে হোটেল আশ্রম ধর্মশালা সবকিছুই ভরে উঠছে। স্থানীয় পরিবহন খাবারের দোকান গাইড পরিষেবা সব ক্ষেত্রেই ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। অনেক পর্যটকই প্রথমবার মায়াপুরে এসে এই উৎসবের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এর ফলে মায়াপুরের নাম ছড়িয়ে পড়ছে দেশ বিদেশে।
নিত্যানন্দ মার্কেটে বৃন্দাবনের তুলসী মালা যেন এই সমগ্র চিত্রের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই মালা শুধু একটি পণ্য নয় বরং বিশ্বাস আবেগ ও সংস্কৃতির বাহক। একজন ভক্ত যখন এই মালা কিনছেন তখন তার মধ্যে শুধু কেনাকাটার আনন্দ নয় বরং এক ধরনের আত্মিক তৃপ্তিও কাজ করছে। অনেকেই এই মালাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন স্মৃতি হিসেবে আবার কেউ উপহার দিচ্ছেন প্রিয়জনকে।
এই বাজারে ঘুরে বেড়ালে বোঝা যায় কিভাবে ভক্তি আর বাস্তব জীবনের প্রয়োজন একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। এখানে ধর্মীয় আবেশ আছে আবার হাসি গল্প দর কষাকষিও আছে। এই স্বাভাবিক সহাবস্থানই মায়াপুরের উৎসবকে করে তুলেছে আলাদা। এখানকার প্রতিটি কোণে যেন জীবনের নানা রং ছড়িয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায় দোল ও গৌড় পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে মায়াপুরে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয় বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। ভক্তি সংস্কৃতি ব্যবসা ও পর্যটন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। নিত্যানন্দ মার্কেট সেই সমন্বয়েরই এক জীবন্ত উদাহরণ যা মায়াপুরের উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত আরও স্মরণীয় করে তুলছে।