রবিবার চলতি মরসুমের শীতলতম দিন ছিল কলকাতায়। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ১৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বড়দিনের আগে রাজ্যে আরও পারদপতন হতে পারে এবং কলকাতার তাপমাত্রা ১২ ১৩ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছাতে পারে
কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাজ্য, আরও পারদপতনের ইঙ্গিত আলিপুর আবহাওয়া দফতরের
বছরের শেষ লগ্নে এসে অবশেষে শহর কলকাতা ও রাজ্যের জেলায় জেলায় শীতের আমেজ স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে। বড়দিন এখনও কয়েক দিন দূরে থাকলেও তার আগেই হিমের পরশ লেগেছে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জেলার মাঠঘাটে। উত্তুরে হাওয়ার দাপটে ঠান্ডায় রীতিমতো জবুথবু হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ দিন ধরে শীত যেন ঠিকমতো আসছিল না—ভোরে সামান্য ঠান্ডা, বেলা বাড়তেই তা উধাও হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শনিবারের পর থেকে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
রবিবার ছিল চলতি মরসুমে কলকাতার শীতলতম দিন। ওই দিন শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ১৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বড়দিনের আগে রাজ্যে শীত আরও জাঁকিয়ে বসতে পারে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, আগামী কয়েক দিনে পারদ আরও নামার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পার হয়ে গেলেও চলতি বছর শীতের দেখা মিলছিল না বললেই চলে। সাধারণত এই সময়ে কলকাতায় ভোরের তাপমাত্রা ১৩–১৪ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। দিনের শুরুতে ঠান্ডা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় প্রতিদিনই স্বাভাবিকের কাছাকাছি কিংবা তার থেকেও বেশি থাকছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পশ্চিমি ঝঞ্ঝা সক্রিয় থাকায় উত্তুরে হাওয়ার প্রবাহ ঠিকমতো দক্ষিণে নামতে পারছিল না। তার ফলেই বাংলায় শীতের দাপট কিছুটা দেরিতে এসেছে। তবে সেই পরিস্থিতি এখন বদলেছে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ায় উত্তুরে হাওয়ার প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে বাংলায়।
শনিবার থেকেই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় আবহাওয়ার চরিত্র বদলাতে শুরু করে। সকালের দিকে ঘন কুয়াশার দেখা মেলে শহর ও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। সঙ্গে বইতে থাকে ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়া। এর জেরে দিনের তাপমাত্রাও অনেকটাই কমে যায়।
রবিবার কলকাতায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে ৫.২ ডিগ্রি কম। দিনের বেলাতেও রোদের তেজ ছিল বেশ ম্লান। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঠান্ডার অনুভূতি বজায় ছিল। সন্ধ্যার পর ঠান্ডা আরও বাড়তে শুরু করে।
সোমবার ভোরে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে ০.৭ ডিগ্রি বেশি। তবে তাপমাত্রা সামান্য বেশি হলেও কুয়াশার দাপটে শীতের অনুভূতি কম ছিল না। ভোরের দিকে শহরের একাধিক এলাকায় দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমে যায়।
কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলাতেও কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় জনজীবন। হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলিতে ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা লক্ষ্য করা যায়। উত্তরবঙ্গে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও উত্তর দিনাজপুরের বিভিন্ন অংশেও কুয়াশার প্রভাব পড়ে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী দু’দিন রাজ্যের সর্বত্র কুয়াশার সতর্কতা জারি রয়েছে। বিশেষ করে ভোরের দিকে দৃশ্যমানতা ৯৯৯ মিটার থেকে কমে ২০০ মিটার পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে রেল ও সড়ক পরিবহণে।
ভোরের দিকে যাঁরা অফিস, স্কুল বা দূরপাল্লার যাত্রায় বের হন, তাঁদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চালকদের হেডলাইট ও ফগ লাইট ব্যবহার করার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি, বিমান পরিষেবাতেও কুয়াশার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দিনের বেলায় কুয়াশা কাটলে সূর্যের দেখা মিলতে পারে, যার ফলে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে এই বৃদ্ধি খুব বেশি হবে না। আগামী দু’-তিন দিনে তাপমাত্রায় বড়সড় কোনও হেরফেরের সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
অর্থাৎ, দিনের বেলায় সামান্য আরাম মিললেও সকাল ও রাতের ঠান্ডা বজায় থাকবে। শীতপ্রবণ মানুষদের জন্য এই সময়টা বেশ কষ্টকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বড়দিনের সময় দক্ষিণবঙ্গে ফের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৫ ডিসেম্বরের আশপাশে উত্তুরে হাওয়ার গতি আরও বাড়তে পারে। তার ফলেই কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও কিছুটা নামতে পারে।
অনেক আবহাওয়াবিদই মনে করছেন, বড়দিনের সময় কলকাতার তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে। যা চলতি মরসুমে এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন হতে পারে।
হাওয়া অফিসের মতে, বড়দিনের পর থেকে ধীরে ধীরে পারদপতন শুরু হবে। অর্থাৎ, ২৫ ডিসেম্বরের পর শীত আরও জাঁকিয়ে বসবে বাংলায়। বর্ষশেষ পর্যন্ত ভালমতোই শীতের আমেজ অনুভূত হবে বলে পূর্বাভাস।
নতুন বছর শুরুর সময়ও সকালের দিকে কুয়াশা ও ঠান্ডা বজায় থাকতে পারে। রাত ও ভোরের দিকে শীতের দাপট বেশি থাকবে। যদিও দিনের বেলায় রোদ উঠলে তাপমাত্রা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। আগামী সাত দিনে উত্তরবঙ্গে খুব বেশি পারদপতনের সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। তবে কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের প্রভাব সেখানে থাকবে।
দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের উঁচু এলাকাগুলিতে অবশ্য শীতের দাপট আরও বেশি অনুভূত হবে। পাহাড়ি এলাকায় রাতের তাপমাত্রা এক অঙ্কের ঘরে নেমে যেতে পারে। তবে সমতলের জেলাগুলিতে তাপমাত্রা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে।
হঠাৎ করে শীত বেড়ে যাওয়ায় শহরের জীবনযাত্রাতেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সকালবেলায় রাস্তাঘাটে দেখা যাচ্ছে সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল-কম্বলের ব্যবহার। ফুটপাথের ধারে গরম চা, কফি আর ভাপা পিঠের দোকানে ভিড় বাড়ছে। শীতের সকালে হাঁটতে বেরোনো মানুষের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো।
শহরের বিভিন্ন পার্ক ও ময়দানে সকালবেলার কুয়াশার মধ্যে প্রাতঃভ্রমণে বেরোনো মানুষদের দেখা যাচ্ছে। যদিও প্রবীণ ও শিশুদের ক্ষেত্রে শীতজনিত সমস্যা এড়াতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে শহরের দৈনন্দিন ছন্দও। ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়ার কারণে অনেকেই এখন আগের থেকে একটু দেরিতে ঘর ছাড়ছেন। অফিসযাত্রীদের হাতে দেখা যাচ্ছে গ্লাভস ও মাফলার, বাইকচালকদের মাথায় হেলমেটের ভিতর উলের ক্যাপ। সকালের ব্যস্ত রাস্তায় শীতের আলস্য আর তাড়াহুড়োর মিশেল স্পষ্ট। বাসস্টপেজ ও স্টেশন চত্বরে মানুষজন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা খোঁজার চেষ্টা করছেন।
শীতের প্রভাবে খাবারের অভ্যাসেও এসেছে পরিবর্তন। রাস্তার ধারে ভাজাভুজি, সিঙ্গারা, চপ-কাটলেটের দোকানে ভিড় বেড়েছে। অনেকেই সকালের জলখাবারে গরম খাবার বেছে নিচ্ছেন। বাড়িতেও রাতের খাবারে স্যুপ, খিচুড়ি কিংবা গরম দুধের চল বাড়ছে। শীতকালীন সবজি—ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, গাজরের চাহিদাও বাজারে বাড়তে শুরু করেছে।
অন্য দিকে, চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন শীতজনিত সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও গাঁটের ব্যথা নিয়ে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে গরম পোশাক ব্যবহারের পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যার ঠান্ডা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত উষ্ণতা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে এই শীতের মরসুম উপভোগ করাই এখন শহরবাসীর মূল লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বড়দিনের আগেই বাংলায় শীত তার উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দিতে শুরু করেছে। কুয়াশা, উত্তুরে হাওয়া এবং ধীরে ধীরে নামতে থাকা পারদ সব মিলিয়ে বছরের শেষটা যে বেশ ঠান্ডার মধ্যেই কাটতে চলেছে, তা এখনই স্পষ্ট। বড়দিন থেকে বর্ষশেষ পর্যন্ত শীতের আমেজ উপভোগ করতে প্রস্তুত শহর থেকে গ্রাম সমগ্র বাংলা।