প্রতিযোগিতায় একটিও ম্যাচে জয় না পাওয়ার জেরে চরম সিদ্ধান্ত নিল সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। মাঠে লজ্জাজনক পারফরম্যান্স ও দলের সামগ্রিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে কোচ-অধিনায়কসহ পুরো ফুটবল দলকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য নিলম্বিত করা হয়েছে। এই ঘটনায় ক্রীড়ামহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস গ্যাবনের ফুটবলের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। গোটা প্রতিযোগিতা জুড়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর একটি ম্যাচেও জয় ছিনিয়ে নিতে না পারা গ্যাবন শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে শেষ করে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। মাঠে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পাশাপাশি মাঠের বাইরেও শৃঙ্খলাজনিত একাধিক সমস্যা সামনে আসায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশটির সরকার। এই ভরাডুবিকে শুধু ক্রীড়াগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে জাতীয় মর্যাদা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে প্রশাসন। তারই ফলস্বরূপ গ্যাবনের জাতীয় ফুটবল দলকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিলম্বিত করার চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই ম্যাচেই ক্যামেরন ও মোজ়াম্বিকের কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ ষোলোর স্বপ্ন কার্যত শেষ হয়ে যায় গ্যাবনের। এই দুই ম্যাচেই দলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং আক্রমণভাগের নিষ্প্রভতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রত্যাশিত লড়াই বা আত্মবিশ্বাস কোনওটাই দেখা যায়নি খেলোয়াড়দের মধ্যে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে সম্মানরক্ষার লড়াইয়ে নেমে শুরুতে ২-০ গোলে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় গ্যাবন। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও রক্ষণে ভেঙে পড়ার ফলে তিনটি গোল হজম করে পরাজয় বরণ করতে হয় তাদের। এই ম্যাচই গ্যাবনের টুর্নামেন্ট জুড়ে মানসিক দুর্বলতা ও শৃঙ্খলার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অধিনায়ক পিয়ের-এমেরিক অউবামেয়াং ও ডিফেন্ডার একুয়েলে মাঙ্গার অনুপস্থিতি বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তোলে। জানা যায়, ক্লাব ফুটবলের কারণে অউবামেয়াং দেশের শিবির ছেড়ে চলে যান, যা অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একইভাবে মাঙ্গার না খেলা নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়। জাতীয় দলের এমন সংকটময় সময়ে সিনিয়র ফুটবলারদের অনুপস্থিতি ড্রেসিংরুমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে গ্যাবনের ক্রীড়ামন্ত্রী সিম্পলিস-ডিজ়ায়ার মামবৌলা সাংবাদিক বৈঠক করে সরকারের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে দেশের জঘন্য পারফরম্যান্স ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় সরকার কোনও রকম আপস করবে না। সেই কারণে কোচ থিয়েরি মৌউয়োমাকে ছাঁটাই করা হয়েছে এবং অধিনায়ক অউবামেয়াং ও ডিফেন্ডার মাঙ্গাকে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনির্দিষ্টকালের জন্য পুরো ফুটবল দলকেই নিলম্বিত করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আফ্রিকার ফুটবল মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে সমর্থকদের একাংশ সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন, অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন এত বড় সিদ্ধান্ত গ্যাবনের ফুটবল ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এই নিলম্বনের উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং দলকে নতুন করে গড়ে তোলা, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে দেশের সম্মান রক্ষা করা। এখন সময়ই বলবে, এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্যাবন ফুটবলের পুনর্জাগরণের পথ খুলে দিতে পারে, নাকি তা আরও গভীর সংকটের সূচনা করবে।
প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই গ্যাবনের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচেই তারা হেরে যায় ক্যামেরনের কাছে। ম্যাচ জুড়ে সংগঠনের অভাব, রক্ষণে দুর্বলতা এবং আক্রমণে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্যামেরনের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা ও কৌশল—দুটোরই ঘাটতি ছিল গ্যাবনের খেলায়। সেই হারের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় ম্যাচে মোজ়াম্বিকের বিরুদ্ধে ফের হারতে হয় তাদের। এই ম্যাচে গ্যাবনের কাছ থেকে অন্তত লড়াই আশা করেছিলেন সমর্থকরা, কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। ফলস্বরূপ, দুটি ম্যাচ হারার পরই শেষ ষোলোর দৌড় থেকে ছিটকে যায় গ্যাবন।
গ্রুপের শেষ ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে মাঠে নামে গ্যাবন। সেই ম্যাচটি ছিল শুধুমাত্র সম্মানরক্ষার লড়াই। অন্তত একটি পয়েন্ট অর্জন করে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার আশা ছিল দল ও সমর্থকদের। ম্যাচের শুরুতে সেই আশা কিছুটা জাগিয়েছিল গ্যাবন। তারা একসময় ২-০ গোলে এগিয়ে যায়, যা দেখে মনে হচ্ছিল অবশেষে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে নিজেদের অস্তিত্বের ছাপ রাখতে পারবে দল। কিন্তু সেই মুহূর্তের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রক্ষণে চরম দুর্বলতা, মিডফিল্ডে নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং ম্যাচ পরিচালনায় ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে থাকে গ্যাবন। শেষ পর্যন্ত তিনটি গোল হজম করে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ হারতে হয় তাদের।
এই ম্যাচে আরও বিতর্ক তৈরি হয় দলের অধিনায়ক পিয়ের-এমেরিক অউবামেয়াং ও ডিফেন্ডার একুয়েলে মাঙ্গার অনুপস্থিতিকে ঘিরে। আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই দুই অভিজ্ঞ ফুটবলার মাঠে নামেননি। জানা যায়, ফরাসি ক্লাব মার্সেইয়ের হয়ে খেলার জন্য অউবামেয়াং দেশের শিবির ছেড়ে চলে যান। অধিনায়ক হিসেবে দলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। একইভাবে ডিফেন্ডার মাঙ্গাও ওই ম্যাচে খেলেননি। জাতীয় দলের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুই সিনিয়র ফুটবলারের অনুপস্থিতি দলের ভেতরে শৃঙ্খলার অভাবকেই সামনে নিয়ে আসে।
এই ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে গ্যাবনের সরকার। দেশের ক্রীড়ামন্ত্রী সিম্পলিস-ডিজ়ায়ার মামবৌলা সাংবাদিক বৈঠক করে জাতীয় ফুটবল দল সংক্রান্ত সরকারের কঠোর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে গ্যাবনের জঘন্য পারফরম্যান্স সরকার কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তাঁর কথায়, দেশের প্রতিনিধিত্ব করা জাতীয় দল কেবল মাঠে ভালো খেলার জন্যই নয়, পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতার জন্যও দায়বদ্ধ। সেই জায়গায় গ্যাবন ফুটবল দল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সাংবাদিক বৈঠকে মামবৌলা বলেন, “আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে দেশের জঘন্য পারফরম্যান্সের পর সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোচিং স্টাফকে ছাঁটাই করা হচ্ছে। অধিনায়ক পিয়ের-এমেরিক অউবামেয়াং ও ডিফেন্ডার একুয়েলে মাঙ্গাকে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যাবনের জাতীয় ফুটবল দলকে নিলম্বিত করা হচ্ছে।” তাঁর এই ঘোষণার পরই গোটা আফ্রিকান ফুটবল মহলে তোলপাড় শুরু হয়।
গ্যাবনের ফুটবল ইতিহাসে এমন নজির খুব কমই রয়েছে, যেখানে পুরো দলকে নিলম্বিত করার মতো কড়া সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সরকারকে। সাধারণত কোচ বদল, কয়েকজন খেলোয়াড় বাদ দেওয়া বা ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পুরো দলকেই নিলম্বিত করেছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, গ্যাবন সরকারের কাছে এই ব্যর্থতা শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাবন ফুটবল ঐতিহ্যগতভাবে আফ্রিকার শক্তিশালী দলগুলির মধ্যে না থাকলেও, তারা কখনও পুরোপুরি দুর্বল দল হিসেবেও বিবেচিত হয়নি। পিয়ের-এমেরিক অউবামেয়াংয়ের মতো বিশ্বমানের ফুটবলার থাকায় বহু সময়েই গ্যাবনের প্রতি আলাদা নজর ছিল। ইউরোপের প্রথম সারির ক্লাবগুলিতে খেলা ফুটবলার থাকা সত্ত্বেও এমন ভরাডুবি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে দলের প্রস্তুতি, কোচিং এবং খেলোয়াড়দের মানসিকতার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যর্থতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, দলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভালো হলেও দল হিসেবে খেলতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোচ থিয়েরি মৌউয়োমার কৌশলগত দুর্বলতা। ম্যাচের মধ্যে পরিবর্তন আনতে তাঁর সিদ্ধান্তগুলি বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয়ত, খেলোয়াড়দের মনোভাব ও দায়বদ্ধতার অভাব। জাতীয় দলের হয়ে খেলাকে অনেকেই ব্যক্তিগত কেরিয়ারের সঙ্গে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যার চূড়ান্ত উদাহরণ অউবামেয়াংয়ের ক্লাবের জন্য জাতীয় শিবির ছেড়ে যাওয়া।
আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে ম্যাচে অধিনায়ক মাঠে না থাকায় ড্রেসিংরুমে নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যায়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কেউ সামনে এগিয়ে আসেননি। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে আইভরি কোস্টের হাতে চলে যায়। ২-০ থেকে ম্যাচ হারার ঘটনা গ্যাবনের মানসিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।
এই সবকিছুর পর গ্যাবন সরকার যে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ এতে খেলোয়াড় ও ফেডারেশনকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে জাতীয় দলের জার্সির মূল্য রয়েছে। অন্যদিকে, অনেকেই মনে করছেন পুরো দল নিলম্বিত করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এতে তরুণ ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়বে এবং গ্যাবনের ফুটবল কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নতুন কোচ নিয়োগ, দল পুনর্গঠন এবং শৃঙ্খলাবিধি আরও কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য একটাই—ভবিষ্যতে যাতে গ্যাবনের ফুটবল দল এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতির মুখে না পড়ে।
গ্যাবনের এই ঘটনার প্রভাব আফ্রিকান ফুটবলে সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এটি অন্য দেশগুলিকেও সতর্ক বার্তা দিচ্ছে যে, জাতীয় দলের ব্যর্থতা শুধু মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনের ভূমিকা—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের মতো বড় মঞ্চে ব্যর্থতা মানে শুধু ট্রফি হাতছাড়া হওয়া নয়, জাতীয় সম্মানেও আঘাত লাগা।
সব মিলিয়ে, আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে গ্যাবনের এই ভরাডুবি শুধুমাত্র একটি দলের ব্যর্থতার গল্প নয়, এটি একটি দেশের ফুটবল ব্যবস্থার আয়না। সরকার, ফেডারেশন, কোচ এবং খেলোয়াড়—সবাই এই ব্যর্থতার অংশীদার। এখন দেখার, এই কঠোর সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে গ্যাবন ফুটবল ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে কিনা, নাকি এই অধ্যায় আরও দীর্ঘ সংকটের সূচনা করে।