Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

উৎসবের চাহিদায় সোনার দাম এক লাফে বেড়ে ১%–এর বেশি - বাজারে অস্থিরতা, ক্রেতাদের দুশ্চিন্তা

উৎসবের মরসুম ঘনিয়ে আসতেই দেশের সোনার বাজারে ফের দেখা দিল তীব্র চাঞ্চল্য। ধনতেরাস, দীপাবলি, লক্ষ্মী পূজা এবং পরপর বিয়ের মরসুমকে সামনে রেখে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় জমতে শুরু করেছে জুয়েলারি দোকানগুলোতে। আর সেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার জেরেই সোনার দাম একদিনেই ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরে ২৪ ক্যারেট সোনার মূল্য এখন প্রতি ১০ গ্রামে ₹১,১৫,০০০ থেকে ₹১,১৭,০০০ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।  

সোনার দাম এক লাফে ১%–এর বেশি: উৎসবের চাহিদায় বুম — ভারতীয় অর্থনীতি, গহনা বাজার, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব 

সোনা—ভারতের মানুষের কাছে শুধু একটি ধাতু নয়; এটি আবেগ, ঐতিহ্য, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, শুভ-সৌভাগ্যের প্রতীক। আর সেই সোনার দাম যখন এক লাফে ১ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় উৎসবের মরসুমের আগমুহূর্তে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি সেদিকে চলে যায়। দেশের সর্বত্র এখন সোনার দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে, ক্রেতাদের কণ্ঠে প্রশ্ন—“দাম আর কত বাড়বে?”, আবার ব্যবসায়ীদের উত্তরে শোনা যাচ্ছে—“উৎসবের চাহিদা এত বেশি যে দাম নিচে আসার সম্ভাবনা কম।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাম বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে উৎসবের ঐতিহ্যবাহী চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আস্থা, রুপির পতন এবং গোল্ড ETF-এ বড় অঙ্কের ইনফ্লো। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বল পরিস্থিতির কারণে সোনা আবার ‘সেফ হেভেন অ্যাসেট’ হয়ে উঠছে। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়ছে, এবং ভারতের আমদানিনির্ভর সোনার বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

জুয়েলারি দোকানগুলোর চিত্র বলছে—

  • ক্রেতারা আগেভাগেই সোনা কিনছেন

  • লাইটওয়েট জুয়েলারির বিক্রি বেড়েছে

  • মেকিং চার্জ নিয়ে তুলনা করে কেনাকাটা হচ্ছে

  • অনলাইন ক্রয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ
    বিয়ের মৌসুমের অর্ডার বুকিং কিছু দোকানে আগের বছরের তুলনায় ২০–৩০% বেশি। তবে দাম অত্যধিক হওয়ায় ছোট বাজেটের ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন, যাঁরা এখন লাইটওয়েট ডিজাইন বা ১৮ ক্যারেট বিকল্প খুঁজছেন।

এদিকে, গ্রামীণ ভারতে সোনা এখনও গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চয় সম্পদ। বিয়ের সময় কিলো হিসাবে সোনা কেনার রীতি এখনও বজায় আছে। তাই দাম বাড়লেও গ্রামীণ ক্রেতাদের উপর তেমন প্রভাব পড়েনি; বরং অনেক কৃষক পরিবার সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান দামের ধারা দেখে মনে হচ্ছে — সোনার মূল্য আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও বাড়তে পারে। ডলারের বিনিময় মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং ভারতের উৎসব–বিয়ের মৌসুম—সব মিলিয়ে দাম আরও উপরে যেতে পারে। ভবিষ্যতে ১০ গ্রাম সোনার দাম ₹১,২৫,০০০–₹১,৩০,০০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ—

  • বিভিন্ন দোকানের দাম ও মেকিং চার্জ তুলনা করুন

  • হলমার্ক ও ক্যারেট ভ্যারিফাই করুন

  • প্রয়োজন না হলে তাড়াহুড়ো না করে বাজার পর্যবেক্ষণ করুন
    বিনিয়োগকারীদের জন্য, দীর্ঘমেয়াদে সোনা এখনও নিরাপদ সম্পদ। Gold ETF, SGB বা ডিজিটাল সোনা—সবই নিরাপদ বিকল্প।

সব মিলিয়ে, উৎসবের মৌসুমে সোনার দাম বাড়া যেমন পরিচিত দৃশ্য, তেমনই এবার পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রুপির পতন মিলিয়ে বাজার এক তুলনাহীন ঊর্ধ্বগতির সাক্ষী হচ্ছে। তবে ভিড় আর আলোয় মাখা ঋতুতে সোনা কেনার উৎসাহ কমছে না; বরং ভারতীয়রা আবারো প্রমাণ করলেন—সোনা শুধু ধাতু নয়, এটি আবেগ ও ঐতিহ্য।

এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছি—

  • সোনার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কারণ

  • ভারতের গহনা শিল্পে এর প্রভাব

  • উৎসবের চাহিদা কীভাবে সোনার দামে ভূমিকা রাখে

  • ক্রেতাদের আচরণ

  • বিনিয়োগকারীদের মনোভাব

  • আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি

  • রুপির মান

  • ভবিষ্যতে সোনার দামের সম্ভাব্য পথ
    এবং আরও অনেক কিছু।

এই ৪০০০ শব্দের বিশ্লেষণ আপনাকে সোনার বাজারের গভীরতম চিত্র তুলে দেবে।


১. উৎসবের মরসুমে সোনার দাম বাড়া—এটা আসলে কতটা স্বাভাবিক?

ভারতের মতো দেশে ধনতেরাস, দীপাবলি, লক্ষ্মী পূজা, দিওয়ালি, তারপর পরপর বিয়ে-শাদি—এগুলো সোনার চাহিদার সর্বোচ্চ সময়। ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারগুলো এই সময়ে সোনা কেনাকে শুভ মনে করে।

পরিসংখ্যান বলছে—

  • ভারতের মোট সোনার বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৩০–৩৫% উৎসব ও বিয়ের মরসুমে খরচ হয়।

  • ধনতেরাসের দিনে একেক জুয়েলারিতে বিক্রি সাধারণ দিনের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেড়ে যায়।

  • দীপাবলির আগে ভারতীয়রা প্রতি বছর গড়ে ১০০–১২০ টন সোনা কেনে।

তাই উৎসবের আগের সপ্তাহে সোনার দাম বাড়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।
তবে এবারের দাম বৃদ্ধির বিশেষত্ব হলো—
এটি শুধু উৎসবের চাহিদায় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা + রুপির পতন + বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক — সব মিলিয়ে যৌথভাবে ঘটছে।


২. ১%–এর বেশি বৃদ্ধি: সোনার দাম কি খুব বেশি?

বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন শহরে ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ₹১,১৫,০০০ – ₹১,১৭,০০০ এর মধ্যে রয়েছে।
এই বৃদ্ধি মাত্র ২৪ ঘণ্টায়ই ১%–এর বেশি।

ক্রেতাদের একাংশের কাছে এটি “বেশি”, তবে আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে—

  • এটি সোনার দীর্ঘমেয়াদি ট্রেন্ডের অংশ

  • গত ৫ বছরে সোনার মূল্য ৬০%–এর বেশি বেড়েছে

  • বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যতেও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে

অর্থাৎ, দাম বেশি হলেও এটি কোনো “বেলুন” নয়, বরং প্রাকৃতিক বাজার প্রতিক্রিয়া।


৩. কেন সোনার দাম হঠাৎ এত বেশি বাড়লো? — প্রধান ৭টি কারণ

 উৎসবের চাহিদা বৃদ্ধি

এটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত।
দোকানগুলোতে অর্ডার বুকিং শুরু হয়েছে আগেই।
বিয়ে-শাদির পরিবারগুলি আগে থেকে সোনা জমাতে শুরু করেছে।

 আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি

মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়া, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের বদলে সোনায় ঝুঁকছেন।
ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে, যা ভারতের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

 রুপির পতন

ডলারের তুলনায় রুপি দুর্বল হলে আমদানি করা সোনা আরও দামি হয়।
বর্তমানে রুপি প্রায় ৮৪–৮৬ প্রতি ডলার—
এটি সোনার আমদানীকে ব্যয়বহুল করছে।

 গোল্ড ETF-এ ইনফ্লো বৃদ্ধি

ডিজিটাল সোনায় বিনিয়োগ বাড়ছে।
শেষ তিন মাসে ভারতীয় ETF-এ রেকর্ড বিনিয়োগ এসেছে।

 স্থানীয় প্রিমিয়ামের বৃদ্ধি

উৎসবের সময় ভারতে সোনার প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় সাধারণত $৫–১০ বাড়ে।
এবার তা প্রায় $১৮–২২ হয়েছে।

 জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের স্টক সংগ্রহ

বড় জুয়েলারি কোম্পানিগুলো উৎসবের জন্য সোনার স্টক জোগাড় করছে।
চাহিদা বাড়ার আগেই তারা বেশি করে সোনা কিনছে → ফলে বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে।

 বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা

বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতি মন্দার মুখে।
এই সময় নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনা আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


৪. সোনার দোকানগুলোর বর্তমান চিত্র—ক্রেতা ও চাপ দুটোই বাড়ছে

দেশের প্রতিটি শহর—দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই—সব জায়গায় জুয়েলারি শোরুমগুলোতে ভিড় বেড়েছে।
দোকানিরা বলছেন—

অনেক দোকানে আবার দেখা যাচ্ছে—

দাম বেশি হওয়ার কারণে ছোট ক্রেতারা অপেক্ষা করছেন
হালকা ওজনের ডিজাইনের বিক্রি বাড়ছে
প্রি-বুকিং আগের বছরের তুলনায় ২০–৩০% বেশি


৫. শহর–গ্রামের বাজারে চাহিদার পার্থক্য

শহরাঞ্চল

  • ক্রেতারা ডিজাইনের দিকে বেশি ঝোঁকেন

  • উচ্চ-মানের ২২–২৪ ক্যারেটের চাহিদা বেশি

  • অনলাইন কেনাকাটা বেড়েছে

  • ব্যাংকের গোল্ড লোন পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে

গ্রামাঞ্চল

  • সোনা এখনও “সেভিংস অ্যাসেট”

  • বিয়ের জন্য কিলো হিসাবে কেনা হয়

  • দাম বাড়লেও সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে কিনছে

  • গ্রামীণ আয় বাড়ার সঙ্গে সোনা কেনা বেড়েছে


৬. বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে এখন সোনা কেনার সঠিক সময় কি?

বিনিয়োগকারীদের মত—

 দীর্ঘমেয়াদের জন্য সোনা কিনতে গেলে এটাই ভালো সময়, কারণ

  • ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে

  • অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সোনা নিরাপদ

 স্বল্প-মেয়াদি ট্রেডারদের ক্ষেত্রে

  • দাম বেশি হওয়ায় ঝুঁকি বাড়বে

  • ওঠা–নামা দ্রুত হতে পারে

বিশেষজ্ঞের মতে—
Gold ETF এবং Sovereign Gold Bond (SGB) সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।


৭. সোনার দামে বাড়তি মেকিং চার্জ—ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় ফ্যাক্টর

বড় দোকানগুলোতে মেকিং চার্জ ৮%–২০% পর্যন্ত।
দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেকিং চার্জও বাড়ছে।
ক্রেতারা এখন তুলনা করে সোনা কিনছেন—

  • কোন দোকানে কম মেকিং চার্জ

  • কোন ডিজাইন লাইটওয়েট

  • কোন দোকানে ডিসকাউন্ট চলছে

  • কোন দোকানে হলমার্কিং ঠিক আছে


৮. ২০২৫ সালে সোনার দামের ভবিষ্যদ্বাণী

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বলছে—

 আগামী ১২ মাসে সোনা ₹১,২৫,০০০ – ₹১,৩০,০০০ প্রতি ১০ গ্রাম হতে পারে
 বৈশ্বিক মন্দা বাড়লে সোনা আরও দ্রুত বাড়তে পারে
 ডলার দুর্বল হলে সোনা কমবে, কিন্তু রুপির প্রভাবে দাম উঁচু থাকবে
 বিয়ের মৌসুম শেষ হলেও তেমন কমার সম্ভাবনা নেই

অন্যদিকে,
কিছু বিশ্লেষকদের মতে যদি

  • মার্কিন সুদের হার কমে

  • আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হয়

তাহলে সোনা কিছুটা কমতেও পারে।


৯. সাধারণ মানুষের জন্য এই দাম বৃদ্ধির অর্থ কী?

  • বিয়ের খরচ অনেক বাড়বে

  • মধ্যবিত্ত সোনা কম কিনবে

  • গৃহিণীরা লাইটওয়েট জুয়েলারির দিকে যাবেন

  • সঞ্চয় হিসাবে সোনা কেনায় চাপ বাড়বে

  • গোল্ড লোন আরও বাড়বে

এছাড়া—

গ্রামীণ ভারতে সোনা কৃষকের অর্থনীতির অংশ।
দাম বাড়লে তারা লাভবানও হতে পারেন, কারণ বহু পরিবার সোনা বিক্রি করে খরচ চালান।


১০. উপসংহার: সোনার দামের বৃদ্ধি উৎসবের আনন্দ নাকি উদ্বেগ?

সোনার দাম বাড়া মানে—

 দেশের অর্থনীতিতে চাহিদা শক্তিশালী
 মানুষ উৎসবমুখর
 বিনিয়োগকারীরা সোনায় আস্থা রাখছেন

কিন্তু—

 মধ্যবিত্তের জন্য এটি চ্যালেঞ্জ
 বিয়ের খরচ বেড়ে যাবে
 ছোট ক্রেতারা সমস্যায় পড়বেন

তবে মোটের ওপর—
ভারতীয় বাজারে সোনার অবস্থান এখনও অটুট।
আর উৎসবের মরসুমে দাম বাড়া যেন দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিত্রেরই প্রতিফলন।

সোনা শুধু গয়না নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক শক্তি।
তাই দাম বাড়লেও এর প্রতি ভারতীয়দের ভালোবাসা কমবে না।

Preview image