Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

উচ্চ মাধ্যমিক নিয়ে ভীষণ ভয় বুক ধড়ফড় করছে শুকিয়ে যাচ্ছে গলা ভীতি নিয়ন্ত্রণের উপায় কী

পরীক্ষা নিয়ে ভীতি অমূলক নয়। তবে তা মাত্রা ছাড়ালেই বিপদ। উচ্চ মাধ্যমিকের আগে বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? ভীতি নিয়ন্ত্রণের উপায় বলে দিলেন মনোরোগ চিকিৎসক এবং মনোবিদ।

উচ্চ মাধ্যমিকের আগে পরীক্ষা ভীতি: আতঙ্ক, উপসর্গ ও তা কাটিয়ে ওঠার উপায়

১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। হাতে সময় একেবারেই কম। বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তে পাঠ্যক্রম ঝালিয়ে নেওয়ার সময়ই বেশির ভাগ পরীক্ষার্থীর মধ্যে তৈরি হয় প্রবল মানসিক চাপ ও আতঙ্ক। তিথির মতো বহু ছাত্রছাত্রীর মনে এখন একটাই ভয়—সব কিছু ভুলে যাচ্ছি, আর ভালো ফল করা সম্ভব হবে না।

তিথি পড়াশোনায় বরাবরই ভালো। তবুও পরীক্ষা এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করতে শুরু করে। খেতে বসলেই গা-বমি, ঘুম ভেঙে যায় বারবার, পড়তে বসলেই শরীর অস্থির লাগে, বুক ধড়ফড় শুরু হয়। এই ধরনের সমস্যাকে বলা হয় পরীক্ষা ভীতি (Exam Phobia)। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আগে এমন ভয় স্বাভাবিক হলেও, তা যদি দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তখন সতর্ক হওয়া জরুরি।


পরীক্ষা ভীতি কী এবং কেন হয়

পরীক্ষা ভীতি হল এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে পরীক্ষার চিন্তা বা ফলের আশঙ্কায় ছাত্রছাত্রীরা অতিরিক্ত উদ্বেগ, ভয় ও মানসিক চাপ অনুভব করে। এই ভয় অনেক সময় এতটাই তীব্র হয় যে, পড়াশোনায় মন বসে না, শরীরে বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়।

উচ্চ মাধ্যমিকের মতো পরীক্ষাকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়। ভবিষ্যতের পড়াশোনা, কলেজে ভর্তি, চাকরি ও সামাজিক মর্যাদা অনেকটাই এই পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর করে বলে মনে করা হয়। ফলে ছাত্রছাত্রীরা নিজের উপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করে ফেলে। পাশাপাশি অভিভাবকদের প্রত্যাশা, সমাজের তুলনা, বন্ধুদের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ভয় আরও বেড়ে যায়।


পরীক্ষা ভীতির সাধারণ উপসর্গ

মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, পরীক্ষা ভীতির ফলে নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিথির মতো অনেক পরীক্ষার্থী এই ধরনের উপসর্গে ভোগে—

মানসিক উপসর্গ

  • কিছুই মনে থাকছে না বলে মনে হওয়া

  • মনঃসংযোগে সমস্যা

  • অতিরিক্ত উদ্বেগ ও ভয়

  • আত্মবিশ্বাসের অভাব

  • পরীক্ষার কথা ভাবলেই অস্থিরতা

শারীরিক উপসর্গ

  • গা বমি ভাব, খেতে ইচ্ছা না করা

  • পেটখারাপ বা বমি

  • ঘুমের সমস্যা

  • হাত-পা কাঁপা

  • বুক ধড়ফড় করা

  • গলা শুকিয়ে যাওয়া

  • মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপসর্গগুলি যদি খুব বেশি হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তবে তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।


প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি

মনোরোগ চিকিৎসক শর্মিলা সরকার জানান, অনেক পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষা ভীতি এতটাই তীব্র হয় যে, তা থেকে প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে।

প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • আচমকা বুক ধড়ফড় করা

  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া

  • শরীরে অস্বস্তি বা কাঁপুনি

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

  • গলা বা ঘাড়ের কাছে গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি

  • মনে হওয়া যে কিছু ভয়ানক ঘটে যাবে

এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হল শান্ত হওয়া এবং গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার চেষ্টা করা। বার কয়েক ধীরে ধীরে শ্বাস নিলে প্রাথমিক ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়।


আত্মহত্যার চিন্তা: সতর্কতা জরুরি

কখনও কখনও অতিরিক্ত উদ্বেগ ও চাপ থেকে কিছু পরীক্ষার্থীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। যদিও এটি খুব সাধারণ নয়, তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদি কোনও পড়ুয়া নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন এমন চিন্তা মাথায় আসতে পারে।

এই ধরনের লক্ষণ দেখা গেলে অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবিলম্বে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।


শেষ মুহূর্তে পড়াশোনার চাপ কীভাবে সামলাবেন

পরীক্ষার ঠিক আগে নতুন করে পড়ার সুযোগ খুব কম থাকে। এই সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আগে পড়া বিষয়গুলো ঝালিয়ে নেওয়া এবং নিজেকে শান্ত রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ মুহূর্তে—

  • ছোট ছোট অংশে পাঠ্যক্রম ভাগ করে রিভিশন করা উচিত

  • সময় অনুযায়ী পড়ার পরিকল্পনা করা দরকার

  • অপ্রয়োজনীয় সোশ্যাল মিডিয়া ও ফোন ব্যবহার কমাতে হবে

  • পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে


মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার উপায়

মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় বলছেন, পরীক্ষার সময় মানসিক চাপ কমানোর জন্য কিছু সহজ অভ্যাস অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

news image
আরও খবর

১. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (প্রাণায়াম)

ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার মাধ্যমে মন শান্ত রাখা সম্ভব। বিশেষ করে বক্স ব্রিদিং পদ্ধতি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
এই পদ্ধতিতে—

  • ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন

  • ৪ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন

  • ৪ সেকেন্ড শ্বাস ছাড়ুন

  • আবার ৪ সেকেন্ড শ্বাস বন্ধ রাখুন

এই প্রক্রিয়া কয়েকবার করলে উদ্বেগ অনেকটাই কমে।

২. ইতিবাচক ভাবনা

নিজেকে বারবার মনে করাতে হবে যে, প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং চেষ্টা করলেই ভালো করা সম্ভব। নেতিবাচক ভাবনা দূরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. নিয়মিত রুটিন

ঘুম, খাওয়া এবং পড়াশোনার নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখা মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৪. শরীরচর্চা ও হাঁটা

হালকা ব্যায়াম বা হাঁটা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মন সতেজ রাখে।


অভিভাবকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ

পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের উচিত—

  • সন্তানের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ না দেওয়া

  • ফলের চেয়ে চেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া

  • সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা

  • ভয় বা দুশ্চিন্তা হলে পাশে থাকা

  • প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া

অভিভাবকদের ইতিবাচক আচরণ অনেক সময় পরীক্ষার্থীর ভয় কমাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।


স্কুল ও শিক্ষকদের দায়িত্ব

শুধু অভিভাবক নয়, স্কুল ও শিক্ষকদেরও পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

  • পরীক্ষার আগে মোটিভেশনাল সেশন

  • কাউন্সেলিং কর্মশালা

  • পড়াশোনার চাপ কীভাবে সামলাতে হবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা

এই ধরনের উদ্যোগ ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।


পরীক্ষা জীবনের শেষ কথা নয়

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, একটি পরীক্ষার ফল কখনও জীবনের শেষ কথা নয়। উচ্চ মাধ্যমিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, জীবনে সফল হওয়ার জন্য অনেক পথ রয়েছে।

ভালো ফল অবশ্যই দরকার, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ নিয়ে নিজেকে অসুস্থ করে তোলার কোনও প্রয়োজন নেই।
 

উপসংহার

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে পরীক্ষা ভীতি বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ আজ আর কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতা। তিথির মতো লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই সময় এক অদ্ভুত মানসিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যায়—যেখানে ভয়, উদ্বেগ, আত্মসন্দেহ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা একসঙ্গে আছড়ে পড়ে। ভালো ফল করার ইচ্ছা, অভিভাবকদের প্রত্যাশা, সমাজের তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা আশঙ্কা—সব মিলিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মনে এমন এক চাপ তৈরি হয়, যা অনেক সময় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করে দেয়।

পরীক্ষা ভীতি একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া হলেও, তা যখন অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তখন তা পড়াশোনার ক্ষতি করার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের সমস্যা, খাওয়ার অনীহা, বুক ধড়ফড়, মনঃসংযোগের অভাব, হাত-পা কাঁপা—এই সব উপসর্গ শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলের ভয় নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির লক্ষণও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উপসর্গ যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেওয়া উচিত।

এই প্রসঙ্গে প্যানিক অ্যাটাকের সম্ভাবনাও উপেক্ষা করা যায় না। অনেক ছাত্রছাত্রীই বুঝতে পারে না যে আচমকা বুক ধড়ফড়, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা শরীরে অস্বস্তি আসলে মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া। এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত করা, ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যেমন বক্স ব্রিদিং, মনকে স্থির করতে এবং উদ্বেগ কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

এছাড়া, অতিরিক্ত চাপ ও হতাশা থেকে আত্মহত্যার চিন্তার মতো বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হওয়াও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও এটি সচরাচর ঘটে না, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনও ছাত্রছাত্রী নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করে এবং পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখতে না পায়, তখন এই ধরনের চিন্তা মাথায় আসতে পারে। তাই পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া শুধু পরিবার নয়, সমাজেরও দায়িত্ব।

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অভিভাবকের অজান্তেই সন্তানের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। “ভালো ফল করতেই হবে”, “অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে হবে”—এই ধরনের কথা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয় ও চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। অথচ, সন্তানের মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের উচিত তাকে বোঝানো যে চেষ্টা ও পরিশ্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ফল তার পরের বিষয়। সন্তানের ভয়, দুশ্চিন্তা ও সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা অভিভাবকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

শুধু পরিবার নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদেরও এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্কুল ও কলেজে পরীক্ষার আগে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি, কাউন্সেলিং সেশন, মোটিভেশনাল বক্তৃতা এবং সময় ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ছাত্রছাত্রীরা অনেকটাই উপকৃত হতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু ভালো নম্বর তৈরি করা নয়, বরং মানসিকভাবে সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক গড়ে তোলা—এই ধারণাটি আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক সময় সমাজ পরীক্ষার ফলকে মানুষের মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখে। কার কত নম্বর, কে কোন কলেজে ভর্তি হল—এই বিষয়গুলো নিয়ে তুলনা করা হয়। এই তুলনার সংস্কৃতি ছাত্রছাত্রীদের উপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে এবং অনেককে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। সমাজের উচিত ছাত্রছাত্রীদের প্রতিভা, আগ্রহ ও মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া, শুধু নম্বর নয়।

এছাড়া, প্রযুক্তির যুগে সোশ্যাল মিডিয়াও পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপে ভূমিকা রাখে। অন্যদের সাফল্য, প্রস্তুতি বা আত্মবিশ্বাসের পোস্ট দেখে অনেক ছাত্রছাত্রী নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করতে পারে। তাই পরীক্ষার সময় ডিজিটাল ডিটক্স বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করাও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পরীক্ষাকে জীবনের শেষ বিচারক হিসেবে না দেখা। উচ্চ মাধ্যমিক অবশ্যই জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কিন্তু এটি জীবনের একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড নয়। জীবনে সফল হওয়ার জন্য অসংখ্য পথ রয়েছে—উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, ব্যবসা, শিল্প, ক্রীড়া, সৃজনশীল পেশা—সব ক্ষেত্রেই সাফল্যের সুযোগ রয়েছে। একটি পরীক্ষার ফল কোনও ব্যক্তির প্রতিভা, মানবিক গুণ বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, পরীক্ষা ভীতি একটি বাস্তব ও গুরুতর সমস্যা, যা ছাত্রছাত্রীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ এবং সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, নিয়মিত রুটিন, ইতিবাচক চিন্তা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য ও শারীরিক ব্যায়াম—এই সাধারণ অভ্যাসগুলি মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

উচ্চ মাধ্যমিকের মতো বড় পরীক্ষার আগে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাকে অনুপ্রেরণায় রূপান্তরিত করাই একজন পরীক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্য। আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যে কোনও পরীক্ষার্থীই এই মানসিক সংকট অতিক্রম করে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারে।

অতএব, পরীক্ষা শুধু একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি—জীবনের মূল্যায়ন নয়। ভালো ফল করার চেষ্টা অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নিজের মানসিক সুস্থতা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা। পরীক্ষার ফল যাই হোক, প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জীবন সম্ভাবনায় ভরপুর—এই উপলব্ধিই পরীক্ষা ভীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

Preview image