রাজ্যের শিশুদের পুষ্টির কথা মাথায় রেখে মিড ডে মিলের খাবারের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সপ্তাহে দু’দিন সেদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা জানালেন শুভেন্দু অধিকারী। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে উপকৃত হবে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া।
রাজ্যের স্কুলপড়ুয়াদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাঙ্গনে উপস্থিতির বিষয়টি মাথায় রেখে মিড-ডে মিল ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের খাবার তৈরির জন্য দৈনিক মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সপ্তাহে দু’দিন সেদ্ধ ডিম দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শিক্ষা এবং পুষ্টি ব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারের দাবি, মিড-ডে মিল প্রকল্পকে শুধুমাত্র দুপুরের খাবার দেওয়ার কর্মসূচি হিসাবে না দেখে শিশুদের সামগ্রিক পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রকল্প হিসাবে গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে স্কুলে পাওয়া দুপুরের খাবার দৈনন্দিন পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে খাবারের গুণগত মান, পরিমাণ, পুষ্টিগুণ এবং নিয়মিত সরবরাহ—সবকিছুর উপরেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ঘোষণা অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের মিড-ডে মিল রান্নার জন্য আগে মাথাপিছু দৈনিক ৬ টাকা ৭৮ পয়সা বরাদ্দ করা হত। সেই বরাদ্দ বাড়িয়ে ১০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে প্রায় ৫১ লক্ষ ৬১ হাজার প্রাক্-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়া উপকৃত হবে বলে জানানো হয়েছে। মিড-ডে মিল প্রকল্পকে শক্তিশালী করতে রান্নার বরাদ্দ বৃদ্ধি, রান্নাঘরে এলপিজির ব্যবস্থা এবং রাঁধুনি ও সহায়কদের সম্মানী বৃদ্ধিসহ মোট প্রায় ৬৩৯ কোটি টাকার পদক্ষেপ অনুমোদন করা হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের বরাদ্দের মধ্যে উন্নত মানের চাল, ডাল, সবজি, তেল, মশলা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ছিল। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলিতে পরিবহণ খরচ, রান্নার জ্বালানি এবং বাজারদরের তারতম্যের কারণে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিত। মাথাপিছু বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মিড-ডে মিলের নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে পড়ুয়াদের পাতে ডিম রাখার সিদ্ধান্ত। কলকাতার সরকারি এবং সরকার-পোষিত স্কুলগুলিতে পরীক্ষামূলকভাবে ইসকনের মেগা কিচেন থেকে মিড-ডে মিল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ইসকনের খাদ্যনীতি অনুযায়ী রান্নাঘরে সম্পূর্ণ নিরামিষ এবং সাত্ত্বিক খাবার প্রস্তুত করা হবে। তবে সেই কারণে পড়ুয়াদের পুষ্টিকর খাবার থেকে ডিম বাদ যাবে না বলে স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে আলাদাভাবে সপ্তাহে দু’দিন সেদ্ধ ডিম সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ ইসকনের রান্নাঘর থেকে নিরামিষ খাবার এলেও নির্ধারিত দিনে পড়ুয়াদের সেদ্ধ ডিম দেওয়া হবে অন্য ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে স্কুলের খাবারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি ডিমের মতো সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিনও বজায় থাকবে।
ডিম দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আগে নানা জল্পনা এবং রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ইসকনকে মিড-ডে মিল রান্নার দায়িত্ব দেওয়ার পরে অনেকের আশঙ্কা ছিল, স্কুলপড়ুয়াদের খাদ্যতালিকা থেকে ডিম সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়তে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, অভিভাবক এবং পুষ্টি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহল থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
এর পরেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিম বাদ দেওয়ার পরিবর্তে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে আলাদা করে তা সরবরাহ করা হবে। প্রথমে সপ্তাহে এক বা দু’দিন ডিম দেওয়ার কথা বলা হলেও ১ আগস্ট মেগা কিচেনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সপ্তাহে দু’দিন সেদ্ধ ডিম দেওয়ার ঘোষণা করা হয়।
কলকাতার তারাতলায় ইসকনের ‘অন্নামৃত’ মেগা কিচেন থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০০টি সরকারি এবং সরকার-পোষিত স্কুলের ৪৪ হাজার পড়ুয়ার জন্য রান্না করা খাবার পাঠানো হচ্ছে। এটি আপাতত একটি পাইলট প্রকল্প। এই ব্যবস্থার সফলতা, খাবারের মান, সময়মতো সরবরাহ এবং স্কুলগুলির প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করার পরে পরিষেবার পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই ব্যবস্থার আওতায় আরও বেশি সংখ্যক পড়ুয়াকে নিয়ে আসার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে পাইলট প্রকল্পটি সফল করতে খাবার তৈরির পাশাপাশি পরিবহণ, সংরক্ষণ, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং পরিবেশনের সময় খাবারের তাপমাত্রা ও মান বজায় রাখার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বড় রান্নাঘর থেকে একসঙ্গে বহু স্কুলে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্নতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়ে। একই সঙ্গে কোনও একটি পর্যায়ে সমস্যা দেখা দিলে বহু স্কুলের খাবার সরবরাহ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। তাই নিয়মিত পরিদর্শন, খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা, পরিবহণের সময় পর্যবেক্ষণ এবং স্কুলভিত্তিক অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
নতুন ব্যবস্থায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভাত, খিচুড়ি অথবা পোলাও দেওয়া হতে পারে। এর সঙ্গে থাকবে ডাল, বিভিন্ন ধরনের সবজি, সোয়াবিন, ছানা, পনির, বাদাম অথবা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে ফল এবং মিষ্টি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজ্য সরকারের স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি সপ্তাহে দু’দিন আলাদা করে সেদ্ধ ডিম সরবরাহ করবে। ফলে নিরামিষ খাবারের পাশাপাশি পড়ুয়ারা ডিমও পাবে। তবে কোন দিন কোন খাবার দেওয়া হবে, তার একটি নির্দিষ্ট এবং প্রকাশ্য সাপ্তাহিক তালিকা প্রতিটি স্কুলে টাঙিয়ে রাখা হলে অভিভাবক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষে পরিষেবাটি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
মেনু তৈরির ক্ষেত্রে শুধু খাবারের বৈচিত্র্য নয়, প্রতিটি বয়সের পড়ুয়ার প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালোরি এবং প্রোটিনের পরিমাণ নিশ্চিত করাও জরুরি। কেন্দ্রীয় PM POSHAN প্রকল্পের নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের খাবারে ৪৫০ ক্যালোরি এবং ১২ গ্রাম প্রোটিন থাকার কথা। উচ্চ-প্রাথমিক স্তরে নির্ধারিত মান ৭০০ ক্যালোরি এবং ২০ গ্রাম প্রোটিন।
মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে শিশুদের পুষ্টির পাশাপাশি স্কুলে ভর্তি, নিয়মিত উপস্থিতি এবং পড়াশোনায় মনোযোগের বিষয়টিও যুক্ত। অনেক নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান স্কুলের খাবারের উপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাওয়া গেলে শিশুর ক্ষুধা কমে এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি হয়।
এই কারণেই মিড-ডে মিলের খাবারকে শুধুমাত্র চাল, ডাল ও সবজি পরিবেশনের সাধারণ কর্মসূচি হিসাবে দেখা উচিত নয়। এটি শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। একদিকে খাবারের মাধ্যমে শিশুর পুষ্টির প্রয়োজন পূরণ করা হয়, অন্যদিকে নিয়মিত স্কুলে আসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
বিশেষ করে গ্রামীণ, আদিবাসী অধ্যুষিত এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলিতে মিড-ডে মিল অনেক পরিবারের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ডিম যুক্ত করার সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডিম সরবরাহের দায়িত্ব স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে গ্রামীণ এবং শহরতলি এলাকার মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে ডিম সংগ্রহ, সিদ্ধ করা, স্কুলভিত্তিক ভাগ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজে বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী যুক্ত হতে পারে।
তবে ডিম সংগ্রহ এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে। ডিমের উৎপাদনের তারিখ, সংরক্ষণের পরিবেশ, সিদ্ধ করার সময়, পরিবহণ এবং পড়ুয়াদের হাতে দেওয়ার আগে পরীক্ষা—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিচালনবিধি থাকা দরকার।
কোনও নষ্ট বা ফাটা ডিম যাতে পড়ুয়াদের দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছেও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি কতগুলি ডিম এল, কতজন পড়ুয়া খেল এবং কতগুলি অবশিষ্ট রইল—তার নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ করা হলে প্রকল্পে স্বচ্ছতা বাড়বে।
মিড-ডে মিল প্রকল্পে রাঁধুনি এবং সহায়কদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবার পরিষ্কার করা, রান্না করা, পরিবেশন, বাসন পরিষ্কার এবং রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো একাধিক দায়িত্ব তাঁদের পালন করতে হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় ২ লক্ষ ২৪ হাজার রাঁধুনি ও সহায়কের মাসিক সম্মানী ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই খাতে প্রায় ২২৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে।
সম্মানী বৃদ্ধি তাঁদের কাজের স্বীকৃতি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজের পরিমাণ এবং বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে আরও বাস্তবসম্মত পারিশ্রমিকের দাবি উঠতে পারে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
PM POSHAN প্রকল্পের আওতায় থাকা স্কুলগুলির রান্নাঘরে শতভাগ এলপিজি সংযোগ নিশ্চিত করার কথাও জানানো হয়েছে। প্রতিটি প্রয়োজনীয় ইউনিটের এলপিজি স্থাপনের জন্য ৩ হাজার টাকা করে খরচ বহন করবে রাজ্য সরকার।
কাঠ, কয়লা অথবা অন্যান্য ধোঁয়াযুক্ত জ্বালানিতে রান্না করলে রাঁধুনি এবং সহায়কদের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এলপিজিতে রান্না করলে ধোঁয়া কম হয়, রান্নার সময় বাঁচে এবং খাবারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
তবে শুধুমাত্র সংযোগ দিলেই হবে না। নিয়মিত সিলিন্ডার সরবরাহ, নিরাপত্তা পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং রাঁধুনিদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।