Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কার্শিয়াঙে জোড়া কালো চিতাবাঘের রহস্য, বনবিভাগের প্রকাশ্যে বিরল দৃশ্য

কার্শিয়াংয়ে একসঙ্গে দুটি কালো চিতাবাঘের দেখা মিলেছে, বনবিভাগ প্রকাশিত ছবিতে ধরা পড়েছে বিরল মুহূর্ত


কার্শিয়াংয়ের পাহাড়ি অরণ্যে আবারও প্রকৃতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় সামনে এল। বন দফতরের ভাষায় এটি এক দুর্লভ মুহূর্ত। এর আগে মাঝেমধ্যে পাহাড়ি জঙ্গলে কালো চিতাবাঘের দেখা মিললেও তা ছিল একটিমাত্র। কিন্তু এবার একই সঙ্গে দু’টি কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। রবিবার সকালে কার্শিয়াং বনবিভাগ এই বিরল দৃশ্যের ছবি প্রকাশ্যে আনে। সেই মুহূর্ত প্রকাশ্যে আসতেই পাহাড়ি অঞ্চলে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, কৌতূহল এবং বিস্ময়।

বন দফতর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কার্শিয়াং সংলগ্ন গভীর জঙ্গলে বসানো ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এই জোড়া কালো চিতাবাঘের ছবি। প্রথমে বনকর্মীরা বিষয়টি দেখে অবাক হয়ে যান। পরে ছবি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন যে, এটি দুটি আলাদা কালো চিতাবাঘ। এই ঘটনা বন দফতরের কাছেও এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ সাধারণত চিতাবাঘ একাকী প্রাণী এবং পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় তারা একসঙ্গে খুব কমই দেখা যায়।

এই ঘটনার পর থেকেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দুটি কালো চিতাবাঘ কি দম্পতি, নাকি ভাইবোন। বন দফতরের বিশেষজ্ঞরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন। যদি তারা দম্পতি হয়ে থাকে, তাহলে শাবক থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে আরও কালো চিতাবাঘ থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার যদি তারা ভাইবোন হয়ে থাকে, তাহলেও এই অঞ্চলে কালো চিতাবাঘের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কার্শিয়াং বনবিভাগের ডিএফও দেবেশ পাণ্ডে জানিয়েছেন, কার্শিয়াংয়ের ঘন পাহাড়ি জঙ্গলে দুটি কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি ধরা পড়েছে ট্র্যাপ ক্যামেরায়। এর আগেও একাধিকবার কালো চিতাবাঘের দেখা মিলেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে দুটি কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি সত্যিই বিরল ঘটনা। নজরদারির জন্য বসানো ট্র্যাপ ক্যামেরায় তাদের ছবি ধরা পড়েছে, যা বন দফতরের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই ঘটনায় তারা আশাবাদী যে কার্শিয়াং অঞ্চলে কালো চিতাবাঘের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

একই মত প্রকাশ করেছেন বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংগঠনের সম্পাদক কৌস্তভ চৌধুরী। তাঁর মতে, দুটি কালো চিতাবাঘ ভাইবোন না দম্পতি তা নির্ধারণ করা সম্ভব লিঙ্গ নির্ধারণ বা শরীরের দাগের ধরন বিশ্লেষণ করে। তিনি বলেছেন, কার্শিয়াংয়ে একই সঙ্গে দু’টি কালো চিতাবাঘের দেখা পাওয়া সত্যিই অত্যন্ত দুর্লভ ঘটনা। এই ঘটনা শুধু বন্যপ্রাণ গবেষণার দিক থেকে নয়, বরং পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো চিতাবাঘ বা ম্যালানিস্টিক লেপার্ড আসলে সাধারণ চিতাবাঘেরই একটি বিরল রূপ। জিনগত কারণে তাদের শরীরে মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে তাদের শরীরের স্বাভাবিক দাগগুলি কালো রঙে ঢাকা পড়ে এবং তারা দেখতে কালো হয়ে যায়। এই কারণেই অনেক সময় কালো চিতাবাঘকে ব্ল্যাক প্যান্থারের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশে কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি আরও বেশি বিরল। এর আগে কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে কালো চিতাবাঘের দেখা মিললেও, একই সঙ্গে দু’টি কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি একেবারেই নজিরবিহীন ঘটনা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কার্শিয়াংয়ের অরণ্য অঞ্চল বহুদিন ধরেই জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলে চিতাবাঘ ছাড়াও হরিণ, বন্য শূকর, নানা প্রজাতির পাখি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ দেখা যায়। সম্প্রতি কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে একটি ম্যালানিস্টিক বার্কিং ডিয়ারের দেখা মিলেছিল, যা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এখন জোড়া কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের বিরল প্রাণীর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে কার্শিয়াংয়ের বনাঞ্চল এখনও অনেকাংশে সুস্থ এবং প্রাণবন্ত। সাধারণত যেখানে খাদ্য পর্যাপ্ত থাকে এবং পরিবেশ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, সেখানেই চিতাবাঘের মতো শীর্ষ শিকারি প্রাণী বসবাস করে। তাই কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

তবে এই ঘটনার সঙ্গে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের বসতি ক্রমশ বাড়ছে। পর্যটনের প্রসার, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং আবাসনের বিস্তার বনাঞ্চলের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

কার্শিয়াংয়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক মানুষ এই বিরল প্রাণীর উপস্থিতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত এবং কৌতূহলী। আবার কেউ কেউ উদ্বিগ্নও হয়েছেন। কারণ চিতাবাঘ মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বন দফতর ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

news image
আরও খবর

বন দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাতের বেলা একা বাইরে না বেরোনো, শিশুদের সাবধানে রাখা এবং গভীর জঙ্গল এলাকায় অযথা প্রবেশ না করার জন্য স্থানীয় মানুষদের অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বন দফতর আরও জানিয়েছে, কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে আরও ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। চিতাবাঘদের গতিবিধি, আচরণ এবং এলাকা নির্ধারণের উপর নজর রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করছেন, এই দুই কালো চিতাবাঘের আচরণ এবং সম্পর্ক সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে।

বন্যপ্রাণ গবেষকদের মতে, এই ঘটনা ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কালো চিতাবাঘের আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, চলাচল এবং প্রজনন সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করলে ভারতীয় বন্যপ্রাণ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বন দফতরের প্রকাশিত ছবি এবং ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। অনেক মানুষ এই বিরল দৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, এটি প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই কালো চিতাবাঘগুলো কি স্থায়ীভাবে কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে থাকবে, নাকি অন্য অঞ্চল থেকে এসেছে। বন দফতর জানিয়েছে, বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলতে সময় লাগবে। চিতাবাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।

কার্শিয়াংয়ের ইতিহাসে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। পাহাড়ি এই অঞ্চলে বহু বছর ধরে নানা বন্যপ্রাণীর দেখা মিললেও, জোড়া কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি সত্যিই বিরল এবং স্মরণীয় ঘটনা।

এই ঘটনা শুধু একটি বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত খবর নয়, বরং এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের একটি গভীর দিক তুলে ধরেছে। মানুষ যত বেশি প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তত বেশি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি এখনও জীবিত এবং শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের বিরল ঘটনা মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে। যদি মানুষ বুঝতে পারে যে বন এবং বন্যপ্রাণী রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিরল প্রাণীদের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে।

কার্শিয়াংয়ের পাহাড়ি অরণ্যে জোড়া কালো চিতাবাঘের উপস্থিতি তাই শুধু একটি খবর নয়, বরং এটি প্রকৃতির এক শক্তিশালী বার্তা। এই বার্তা আমাদের বলে দেয়, প্রকৃতি এখনও আমাদের চারপাশে রয়েছে, আর আমাদের দায়িত্ব হল তাকে রক্ষা করা।

আজ কার্শিয়াংয়ের জঙ্গলে যে দুটি কালো চিতাবাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা শুধু দুটি প্রাণী নয়। তারা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের প্রতীক, প্রকৃতির রহস্যের প্রতিফলন এবং মানুষের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

সময়ই বলবে, এই জোড়া কালো চিতাবাঘের গল্প ভবিষ্যতে কীভাবে লেখা হবে। তারা কি এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে, নাকি অন্য কোথাও চলে যাবে। কিন্তু একথা নিশ্চিত, কার্শিয়াংয়ের অরণ্যে তাদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন মানুষের মনে কৌতূহল, বিস্ময় এবং আলোচনার জন্ম দেবে।

Preview image