শ্বেতশুভ্র সরস্বতী প্রতিমার সামনে সোনালি শাড়ি আর সোনার সাবেকি গয়না পরা দেবী মাথায় সোনার মুকুট। বিভিন্ন বয়সের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিমার সামনে সারি দিয়ে বসে প্রার্থনা করছে, আলোকিত মন্দির পটভূমিতে সজ্জিত
প্রতিমার সাজসজ্জা ছিল এক কথায় চোখ ধাঁধানো। শ্বেতশুভ্র রঙের দেবীপ্রতিমার পরনে ছিল সোনালি রঙের শাড়ি, যা মৃদু আলোতে জ্বলজ্বল করছিল। প্রতিমার গায়ে সোনার সাবেকি গয়না আর মাথায় সোনার মুকুট যা নজর কাড়ার জন্য যথেষ্ট। মুকুটের ডিজাইন ছিল সূক্ষ্ম ও প্রতিসাম্যপূর্ণ, যা দেবীর মর্যাদা এবং আভিজাত্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। প্রতিমার সৌন্দর্য আর মহিমার সামনে সারি বেঁধে বসেছিলেন নানা বয়সের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের পোশাকও ছিল নিখুঁতভাবে নির্বাচিত। সকলেই পরেছিলেন সাদা রঙের পোশাক, যার সঙ্গে ঘিয়ে রঙের হালকা ছোঁয়া দিয়ে পোশাকের সৌন্দর্য এবং আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
পুজোর পুরো আয়োজন শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল। বাজার থেকে জিনিসপত্র সংগ্রহ, ঠাকুরের ভোগ রান্না, সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন সবই তারা একত্রে সম্পন্ন করেছে। সৌম্যজিতের কথায়, “বাজার করা থেকে শুরু করে ভোগের প্রস্তুতি এবং অতিথি আপ্যায়ন সবটাই শিক্ষার্থীরা করেছে। এটি আমাদের কাছে এক মহাযজ্ঞ। এ বছর প্রায় আড়াই হাজার নারকেল নাড়ু তৈরি করা হয়েছে, যা ১৫ জন শিক্ষার্থীর একটি দলের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। তাই শুধু সরস্বতীপুজো বা তার আগের দিনের উদ্যাপন বলা ঠিক হবে না; বহু দিন ধরেই আমরা এই পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে রেখেছি।”
শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই তিথির বিষয়টি কিছুটা দূরে রেখে পুজো এক দিন আগে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সৌম্যজিত বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠান শুরু হয়েছিল মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী দিয়ে। দিন দিন সেই সংখ্যা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৫০০ শিক্ষার্থীর। সরস্বতীপুজোর দিন প্রত্যেকেরই স্কুল এবং অন্যান্য জায়গায় দায়িত্বরত থাকতে হয়। তাই আমরা ঠিক করেছি, পুজোর আগের দিন পুষ্পাঞ্জলির আয়োজন করব, যাতে সবাই যোগ দিতে পারে।”
এই আয়োজন কেবল শিক্ষার্থীদের পুজোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে না, বরং তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী গড়ে তুলেছে। তারা শিখেছে, কিভাবে একটি বৃহৎ অনুষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা যায়। প্রতিটি কার্যক্রমে তারা নিজস্ব ভূমিকা পালন করেছে। পুজোর আগের দিন বাজার থেকে উপকরণ সংগ্রহ, ভোগ রান্না, পুজোর সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন সবকিছুতেই শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তারা শিখেছে দলবদ্ধভাবে কাজ করা, দায়িত্ব নেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার কৌশল।
সঙ্গীতের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এক মাস ধরে ছাত্রছাত্রীরা সঙ্গীতাঞ্জলির অনুশীলন করেছে। পুষ্পাঞ্জলির আগে, তারা সমবেত কণ্ঠে গান পরিবেশন করেছে। এই গানগুলো সংস্কৃত মন্ত্র থেকে অনুপ্রাণিত হলেও, সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য সহজ ভাষায় পরিবেশন করা হয়েছে। সৌরেন্দ্র মনে করেন, সরস্বতীপুজো শুধুমাত্র একটি হিন্দু উৎসব নয়; এটি চিন্তন এবং সৃজনশীলতার উদ্যাপন। তাঁর বক্তব্য, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা নয়; আমরা চাই সঙ্গীতের মাধ্যমে শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমকে তুলে ধরতে। এটি কেবল উৎসব নয়, এটি এক অনুভূতির উদ্যাপন, যা মানুষের মনে শিক্ষা, ভাবনা এবং সৃজনশীলতার বার্তা পৌঁছে দেয়।”
ছাত্রছাত্রীরা অনুষ্ঠানটির প্রতিটি অংশে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। তারা নাড়ু তৈরি, রান্না, সাজসজ্জা এবং অতিথি আপ্যায়নে বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। তাদের শ্রম, নিষ্ঠা এবং সহযোগিতা অনুষ্ঠানকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখেছে, কিভাবে পরিকল্পনা এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বৃহৎ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা যায়। এটি তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করেছে।
এই আয়োজনের মাধ্যমে সরস্বতীপুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক উদ্যাপনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিখেছে, কিভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, এবং সৃজনশীলভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়। পুজোর প্রতিটি উপাদান শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি গভীর শিক্ষার বার্তা রেখেছে।
এই বিশেষ সরস্বতীপুজোর আয়োজনকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী বিক্রম ঘোষ এবং প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী তনুশ্রীশঙ্কর। তাঁদের উপস্থিতি শুধু অনুষ্ঠানের গুরুত্বই বাড়ায়নি, বরং শিল্প ও সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে এই পুজোর যোগসূত্রকে আরও দৃঢ় করেছে। শিল্পী সমাজের এমন প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনুপ্রেরণার সঞ্চার হয়। তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পায়, কীভাবে শিল্পচর্চা, শিক্ষা এবং ধর্মীয় অনুভূতি একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করতে পারে। অতিথিদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একটি সার্বিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছে।
সৌরেন্দ্র ও সৌম্যজিৎ জানিয়েছেন, বসন্তপঞ্চমীর পূর্ণিমা তিথিতেও নিয়ম মেনে মূল সরস্বতীপুজো অনুষ্ঠিত হবে। আগের দিনের এই আয়োজনকে তাঁরা দেখছেন মূল পুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে। একদিন আগেই পুষ্পাঞ্জলি ও আরাধনার আয়োজন করার ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু মানসিকভাবেই প্রস্তুত হয়নি, বরং সাংগঠনিক দিক থেকেও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। আগের দিনের অভিজ্ঞতা তাদের শেখাচ্ছে কীভাবে সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং দলগতভাবে কাজ করলে একটি বৃহৎ অনুষ্ঠান আরও সুন্দর ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করা যায়। এর ফলে পূর্ণিমার দিন মূল পুজোতে তাদের অংশগ্রহণ হবে আরও পরিপক্ব, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং অর্থপূর্ণ।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সৌরেন্দ্র ও সৌম্যজিতের দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁদের কাছে সরস্বতীপুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের একটি মাধ্যম। এই পুজোর মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের শেখাতে চেয়েছেন দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সৃজনশীল চিন্তার গুরুত্ব। বাজার করা থেকে শুরু করে ভোগ রান্না, নাড়ু বানানো, মঞ্চ ও পুজোর স্থান সাজানো, অতিথি আপ্যায়ন প্রতিটি কাজে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাদের মধ্যে আত্মনির্ভরতা গড়ে তুলেছে। তারা শিখেছে, কেউ নির্দেশ দিলেই কাজ নয়, বরং নিজের দায়িত্ব নিজে বুঝে নেওয়াটাই প্রকৃত শিক্ষা।
উপসংহারে বলা যায়, সৌরেন্দ্র ও সৌম্যজিতের এই উদ্যোগ কেবল একটি পুজো নয়; এটি শিক্ষার্থীদের জন্য এক গভীর প্রেরণার উৎস। এখানে ধর্ম, সঙ্গীত, শিক্ষা ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি সমন্বিত অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা এই আয়োজনের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছে যে, বড় কোনও কাজ সফল করতে হলে পরিকল্পনা, নিষ্ঠা এবং সমন্বয়ের কোনও বিকল্প নেই। এই পুজো তাদের শেখাচ্ছে কীভাবে ব্যক্তিগত দক্ষতাকে দলগত প্রয়াসে রূপান্তরিত করতে হয়।
এই উদ্যাপন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছে। তারা বুঝেছে যে, নিজেদের প্রচেষ্টা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কোনও বড় দায়িত্ব সামলানো সম্ভব। একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীও বিকশিত করেছে। কে কোন কাজে পারদর্শী, কে কোন দায়িত্ব ভালোভাবে সামলাতে পারে এই উপলব্ধি থেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি সহযোগিতা ও সহানুভূতির শিক্ষাও এই পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সবাই একসঙ্গে কাজ করেছে, একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে, প্রয়োজনে সাহায্য করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছে দায়িত্ব নিতে। পুজোর প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা শুধু ধর্মীয় আচার পালন শিখেনি, বরং বাস্তব জীবনে কীভাবে দায়িত্বশীল হতে হয়, সেই শিক্ষাও পেয়েছে। সরস্বতীপুজোর এই উদ্যাপন তাই শুধুমাত্র একটি উৎসব হিসেবে নয়, বরং একটি শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার সমন্বিত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। এখানে দেবী আরাধনার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ভবিষ্যতের সচেতন, দায়িত্বশীল এবং সৃজনশীল প্রজন্ম।